kalerkantho

সোমবার । ২৯ চৈত্র ১৪২৭। ১২ এপ্রিল ২০২১। ২৮ শাবান ১৪৪২

১৭ জেলা থেকে কুড়িগ্রামে ৫১ হাজার মানুষ

তামজিদ হাসান তুরাগ, কুড়িগ্রাম থেকে ফিরে    

১২ জানুয়ারি, ২০২১ ০৩:০৯ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



১৭ জেলা থেকে কুড়িগ্রামে ৫১ হাজার মানুষ

কুড়িগ্রাম সদরের ঘোগাদহ ইউনিয়নের বাসিন্দা কামাল হোসেন। করোনার আগে তিনি রাজধানীর লালবাগের একটি কারখানায় রাতে নিরাপত্তাকর্মীর কাজ করতেন। মাঝেমধ্যে দিনে চালাতেন রিকশা। কারখানায় এক রাতে কাজ করে তিনি আয় করতেন ৫০০ টাকা।  আর রিকশা চালিয়ে দিনে আসত ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা। সব মিলিয়ে তাঁর মাসে আয় হতো ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকা। করোনা মহামারিতে এখন তিনি কর্মহীন। তাই গ্রামে ফিরে তিনি কৃষিকাজে নেমে পড়েন। এখন সব কিছু মিলিয়ে তাঁর মাসে আয় আট থেকে ১০ হাজার টাকা। তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘করোনা আরো মারছে হামাক আগত তাও ঢাকাত ভালো ইনকাম হইছিল, এহন বাড়ি আমি খায়া না খায়া থাকি, ছোয়াপোয়াগুলা পড়াপড়ে তাও বন্ধ। এহন এই ব্যবসা আর জমির কাম ছাড়া কোনো গতি নাই।’

হৃদয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। গত ফেব্রুয়ারিতে তাঁর ছিল তিনটি টিউশনি। ভালোই চলছিল দিন। কিন্তু করোনায় তাঁর সব কিছু এলোমেলো করে দিয়েছে। বন্ধ রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সঙ্গে টিউশনিও। ফিরতে হয়েছে নিজ জেলা কুড়িগ্রামে। তিনি বলেন, ‘বছরের শুরুটা ভালোই ছিল, সব কিছু মিলিয়ে বেশ চলছিল। কিন্তু করোনার কারণে সব কেমন যেন হয়ে গেল।’

শুধু এই দিনমজুর কিংবা ছাত্রটি নয়। তাঁদের মতো অনেক বেকারের হাহাকার চলছে দেশজুড়ে। বেকারদের মিছিল যেন হামলে পড়েছে গ্রামীণ জনপদে। এর মধ্যে বেশির ভাগই গার্মেন্ট শ্রমিক। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) সাম্প্রতিক এক হিসাব বলছে, করোনাকালে এক হাজার ৯১৫টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে চাকরি হারিয়েছেন তিন লাখ ২৪ হাজারের বেশি শ্রমিক। এ ছাড়া গত কয়েক মাসে ৮৭টি কারখানায় ২৬ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর দেওয়া এক হিসাবে দেখা গেছে, সংগঠনটির আওতাভুক্ত ৯৪টি কারখানা করোনাকালে বন্ধ হয়েছে। সব মিলিয়ে বিজিএমইএর অন্তর্ভুক্ত ১০৫টি কারখানায় চাকরি হারানো শ্রমিকের সংখ্যা ৪৮ হাজার ৪৮৯।

বেসরকারি সংস্থা রি-ম্যাপ প্রকল্পের চলমান জরিপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ থেকে মে পর্যন্ত করোনার প্রকোপসহ নানা কারণে দেশের ১৭ জেলায় কাজ হারিয়ে প্রায় ৫১ হাজার মানুষ কুড়িগ্রামে নিজের জেলায় ফিরেছে। তাদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা প্রায় ৪১ হাজার আর নারীর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। তাদের বেশির ভাগই দিনমজুর। বেশির ভাগ মানুষের কর্মস্থল ছিল ঢাকায়। ঢাকায় যাঁরা কর্মরত ছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগ গার্মেন্টকর্মী।

ঢাকার বাইপাইলে সোয়েটার কম্পানিতে চাকরি করতেন রতন কুমার। নভেম্বর থেকে বেকার তিনি। আগে প্রতি মাসে তাঁর মাসিক আয় ছিল ১০ হাজার টাকা। এখন বেকার হয়ে অলস সময় পার করছেন। তিনি বলেন, ‘করোনার কারণে নভেম্বর থেকে আমি বেকার। আর গ্রামে কাজকামের অবস্থা ভালো না। অভাবের সংসার নিয়ে কোনো রকমে বেঁচে আছি।’ একই সুরে কথা বললেন সত্য রায়ও। তিনি বলেন, ‘আমি সোয়েটার কম্পানির সুপারভাইজার ছিলাম, এখন বেকার। এখন গ্রামেও কোনো কাজ নেই।’

করোনাকালে কর্মহীনদের জন্য করণীয় বিষয়ে জানতে চাইলে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রকল্পের প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, ‘করোনা শুরুর পর থেকে অনেকে কাজ হারিয়েছেন আবার অনেকে নিজ জেলায় ফিরে গেছেন। এ ক্ষেত্রে উল্টো অভিবাসন হয়েছে। অনেকে আবার ফের কাজে ফিরেছেন। তবে এখনো গ্রামে অনেকে কর্মহীন হয়ে আছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা কর্মহীনদের তালিকা করে কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করতে পারেন, পাশাপাশি ব্যক্তিগত জায়গা থেকে নানা ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কারণ সরকারের একার পক্ষে এই কাজটি করা সম্ভব নয়।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা