kalerkantho

শনিবার । ২১ ফাল্গুন ১৪২৭। ৬ মার্চ ২০২১। ২১ রজব ১৪৪২

বীর মুক্তিযোদ্ধার হাতে ভিক্ষার ঝুলি, থাকেন পলিথিনের ঝুপড়িতে!

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি   

১৭ ডিসেম্বর, ২০২০ ১৯:২৩ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বীর মুক্তিযোদ্ধার হাতে ভিক্ষার ঝুলি, থাকেন পলিথিনের ঝুপড়িতে!

ঝুপড়ির সামনে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হামিদ ও তার স্ত্রী

একাত্তরে অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করে যে বাঙ্গালি সন্তানেরা মাতৃভূমির স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলেন তাদেরই একজন সাতক্ষীরার আবদুল হামিদ। ভাগ্য বিড়ম্বনায় মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণ জয়ন্তীর এই সময়েও তার হাতে ভিক্ষার ঝুলি। বাড়িঘর জমি সব হারিয়ে তার আশ্রয় এখন সাতক্ষীরা স্টেডিয়ামের পরিত্যক্ত গ্যালারির নিচে পলিথিন ঘেরা ঝুপড়িতে।

সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার আনুলিয়া ইউনিয়নের নাংলা গ্রামের হারেজ মোল্লার ছেলে আব্দুল হামিদ। মুক্তিযুদ্ধের সময় খুলনার কয়রা উপজেলার মঠবাড়ি গ্রামে নানাবাড়ি থাকতেন তিনি। সেখানে হায়াতখালি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে পড়াশুনা করাকালীন পার্শ্ববর্তী গোবিন্দপুর গ্রামের আব্দুল কাদেরের আহ্বানে মহান মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন আব্দুল হামিদ। ভারতের বহেরায় মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে অস্ত্র হাতে নিয়ে যুদ্ধে নেমে পড়েন বীর মুক্তিযোদ্ধা হামিদ। ৮নম্বর সেক্টরে মেজর জলিলের বাহিনীর সদস্য হিসাবে আবদুল হামিদ খুলনার চুকনগর, খুলনা ও বাগেরহাটের কয়েকটি স্থানে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন। তার সহযোগী ছিলেন কয়রার কেরামত আলী ও আব্দুল জব্বার।

১৯৭৮ সালে আশাশুনির প্রতাপনগরের রুইয়ার বিলের মান্দার সানার মেয়ে মোমেনাকে বিয়ে করেন আব্দুল হামিদ। তাদের কোনো সন্তান নেই। স্থানীয় মেম্বরের কথামত নাংলা গ্রাম ছেড়ে ৩৫ বছর আগে থেকে সাতক্ষীরা স্টেডিয়ামের পরিত্যক্ত গ্যালরির নিচে পলিথিনের ঝুপড়িতে বাস করেন। জমি নিয়ে মামলা করে মাঝে মাঝে গ্রামে যেতেন। চার বছর ধরে শারীরিকভাবে খুব অসুস্থ হয়ে পড়ায় এখন আর স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না তিনি। স্ত্রী মোমেনা তাকে নিয়ে ভিক্ষা করে সংসার চালান। স্টেডিয়ামের নিচ থেকে অনেকেই তাদেরকে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করলেও প্রয়াত আইনজীবী অ্যাডভোকেট তপন কুমার চক্রবর্তী তাদেরকে থাকতে সহায়তা করেন। 

বয়সের ভারে ও অসুস্থতার কারণে লাঠিতে ভর করে ভিক্ষা করে সংসার চালানো ও ওষুধ কিনে খাওয়া সম্ভব
হচ্ছে না। তাছাড়া যেখানে বসবাস করেন সেখানে কোনো গরম কাপড় ও একটি মাদুরও না থাকায় মানবেতর জীবন কাটছে হামিদ দম্পতির। অথচ মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় হামিদের নাম নেই। কোনো ভাতাও পান না তিনি। 
যুদ্ধকালীন যে সার্টিফিকেট ও অন্যান্য দালিলিক কাগজপত্র পেয়েছিলেন তাও হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। এখন সেই মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হামিদ খানিকটা অপ্রকৃতিস্ত। কিছুক্ষণ কথা বলার পর সারা শরীর কাঁপতে থাকে তার।

আবদুল হামিদ দুপুরে ভিক্ষা করে বাসায় ফেরার পর এ প্রতিবেদকে জানান, শেষ বয়সে মুক্তিযোদ্ধার সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই। প্রয়োজনে তার সম্পর্কে যাঁচাই করে দেখা হোক। অন্যের দয়ায় বেঁছে থাকতে চান না তিনি।
ফিরে পেতে চান পৈতৃক ভিটা। সরকারি কোনো ভাতা না পেলেও করোনাকালীন পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী তাকে দুবার চাল দিয়েছে।

মোমেনা খাতুন বলেন, স্যাঁতসেঁতে জায়গায় থেকে তার স্বামী আব্দুল হামিদের দিনের পর দিন শরীর ভেঙে পড়ছে। এখন ভিক্ষা করতে নিয়ে যাওয়া ও কঠিন হয়ে পড়েছে। স্বামী মুক্তিযোদ্ধার সম্মাননা পেলে তিনি খুশি হবেন। পেতে চান থাকার মত একটু জায়গা।

সাতক্ষীরা শহরের পলাশপোলের স্টেডিয়ামের পাশের কয়েকজন দোকানি বলেন, আশাশুনির বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হামিদের কষ্টের জীবন দেখা যায় না। তারা সরকারের কাছে আব্দুল হামিদের আশ্রয় দাবি করেন।

আশাশুনির আনুলিয়া ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোক্তার হোসেন বলেন, আব্দুল হামিদ নামের কোনো মুক্তিযোদ্ধার নাম তাদের জানা নেই। তাছাড়া দীর্ঘদিন কয়রা ও সাতক্ষীরায় আব্দুল হামিদকে তাদের চেনার কথা নয়। তবে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন তিনি।

আশাশুনি উপজেলা সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুল হান্নান বলেন, বিষয়টি জানার পর তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছেন। সহযোগী হিসেবে কয়রার মুক্তিযোদ্ধা কেরামত আলী ও আব্দুল জব্বারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে। তিনি মুক্তিযোদ্ধা হলে অবশ্যই যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে যোগ্য মর্যাদা দেওয়ার জন্য তিনি সব ধরণের চেষ্টা করা হবে। 

আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মীর আলিফ রেজা বলেন, সাংবাদিকদের মাধ্যমে জানতে পেরে আব্দুল হামিদ সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে তিনি উপজেলা সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারসহ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছেন। তার সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়ে যদি তিনি মুক্তিযোদ্ধা নাও হন তাহলেও তাকে বর্তমান সরকারের
প্রধানমন্ত্রীর গৃহ প্রকল্পের আওতায় বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা