kalerkantho

শুক্রবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৩ রজব ১৪৪২

অসহায় পপিনার হাতে দুগ্ধবতী গাভী তুলে দিল রংপুর শুভসংঘ

রংপুর অফিস   

৭ ডিসেম্বর, ২০২০ ১৮:৩৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অসহায় পপিনার হাতে দুগ্ধবতী গাভী তুলে দিল রংপুর শুভসংঘ

দিনমজুর স্বামী রুবেল মিয়া ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান প্রায় দুইমাস আগে। দুই ছেলে-মেয়ে আর আর পেটে অনাগত জমজ দুই কন্যা সন্তান নিয়ে বড় বেকায়দায় আছেন পপিনা বেগম (৩০)। রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার দক্ষিণ আরাজিনিয়ামত গ্রামে জীর্ণ ঘরে তার বাস। নয় মাসের গর্ভবতী ও পুষ্টিহীনতার শিকার এই নারীর চিকিৎসা করানোর কোনও সামর্থ্য নেই। গত দুইমাস ধরে দুই ছেলে-মেয়েসহ কোনও রকমে খেয়ে বেঁচে আছেন পাড়া-প্রতিবেশিদের দয়ায়। 

নিদারুন কষ্টে থাকা সেই পপিনার এখন হয়তো কিছুটা হলেও কষ্ট লাঘব হবে। কারণ তিনি এখন দুগ্ধবতী একটি গাভীর (বাছুরসহ) মালিক। কালের কণ্ঠ শুভসংঘ রংপুর জেলা শাখার উদ্যোগে তাকে এই গাভী হস্তান্তর করা হয়েছে। আজ সোমবার দুপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে সেটি হস্তান্তর করা হয়। আর দুর্দিনে এই গাভী পেয়ে শুভসংঘকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন ওই নারী। পাশাপাশি মানবিক এ উদ্যোগের জন্য উদ্যক্তাদেরও ধন্যবাদ জানিয়েছেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত গ্রামের বাসিন্দারা। 

গঙ্গাচড়ার বাগপুর এলাকার আব্দুল করিমের মেয়ে পপিনা বেগমের বিয়ে হয় প্রায় ১০ বছর আগে। দক্ষিণ আরাজিনিয়ামত গ্রামের দিনমজুর স্বামী রুবেল মিয়ার সংসারে অভাব থাকলেও সুখের কমতি ছিল না তাদের। নয় বছরের মেয়ে রুকাইয়া ও পাঁচ বছর বয়সের ছেলে তাহসিনকে নিয়ে ভালোভাবেই চলছিল সংসার। কিন্তু স্বামী রুবেলের ক্যান্সার ধরা পড়লে তার চিকিৎসা করাতে নিঃস্ব হয়ে পড়ে পরিবারটি। স্বামীর জমানো সামান্য টাকা আর অন্যের সাহায্য পাওয়া টাকা চিকিৎসার শুরুতেই শেষ হয়ে যায়। অর্থের অভাবে স্বামীকে চিকিৎসা দিতে না পারার আক্ষেপ তো রয়েছে। কিন্তু এরপরও স্বামীকে বাঁচাতে পারেননি পপিনা। ছয়মাস রোগে ভোগার পর প্রায় দুইমাস আগে মারা যান রুবেল। এই অবস্থায় দুই সন্তান নিয়ে বেকায়দায় পড়েন পপিনা বেগম। এছাড়া বর্তমানে পপিনা নয় মাসের অন্তঃস্বত্বা। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন তার গর্ভে জমজ দুই কন্যা সন্তান রয়েছে। সন্তানদের ভবিষ্যৎ চিন্তায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।

অসহায় ওই নারীকে ‘বেঁচে থাকার অবলম্বন’ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় কালের কণ্ঠ শুভসংঘ রংপুর জেলা শাখা। আর সেই অনুযায়ী সোমবার তাকে বাছুরসহ দুগ্ধবতী গাভী হস্তান্তর করা হয়। এসময় পপিনা জানান, স্বামী বেঁচে থাকায় তার তেমন কোন চিন্তা ছিল না। কিন্তু সে মারা যাওয়ায় মহাবিপাকে পড়েছেন তিনি। যেন মাথার উপর অন্ধকার নেমে এসেছে। দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ আছে। তার ওপর গর্ভে থাকা সন্তান আর কয়েকদিনের মধ্যে পৃথিবীতে আসবে। তাদের দেখভাল করাসহ সংসার চালার মতো কোন পথ নাই। আত্মীয়স্বজনসহ অন্যের সাহায্যে দুই মাস থেকে কোন রকম বেঁচে আছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাছুরসহ গাভী পাওয়ায় মনে কিছুটা সাহস পাইলাম।’ এজন্য উদ্যোক্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।

রংপুর শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে গঙ্গাচড়া সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ আরাজিনিয়ামত গ্রামে পপিনার জীর্ণ বাড়ির পাশেই এ উপলক্ষে আয়োজন করা হয় আলোচনা অনুষ্ঠানের। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রংপুর গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল গোফফার। বিশেষ অতিথি ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন, নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/ম) জিয়াউর ইবনে বোরাক ও উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আরিফুর রহমান। 

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন গঙ্গাচড়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আলী আরিফ সরকার রিজু, এলাকাবাসী আমিনুল ইসলাম এবং কালের কণ্ঠের রংপুর ব্যুরোপ্রধান ও কেন্দ্রীয় শুভসংঘের সিনিয়র সহসভাপতি স্বপন চৌধুরী। শুভসংঘ রংপুর জেলা শাখার সভাপতি ইরা হকের সভাপতিত্বে ও কালের কণ্ঠের রংপুরস্থ বিজ্ঞাপন নির্বাহী আরমানুল হক আরমানের সঞ্চালনায় শুরুতে শুভসংঘের পক্ষে সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে স্বাগত বক্তব্য রাখেন রংপুর জেলা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফারজানা সিদ্দিকা রাসু। এসময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শুভসংঘ রংপুর জেলা শাখার মোহাম্মদ আরিফ, সাদেকুল ইসলাম, গঙ্গাচড়া শাখার তুহিন ইসলাম, আল্পনা রিতু, সাফিন মিয়া, নাজমুল হুদাসহ অন্যরা।

প্রধান অতিথি রংপুর গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল গোফফার তাঁর বক্তব্যের শুরুতে শুভসংঘকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘একটি অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে একটি মানবিক উদ্যোগ নিয়েছে শুভসংঘ। আর এতে আমাদের যুক্ত করায় আমরা কৃতজ্ঞ। খোঁজ-খবর রাখাসহ পরবর্তীতে পপিনা বেগমকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে’। 

কেন্দ্রীয় শুভসংঘের সিনিয়র সহসভাপতি স্বপন চৌধুরী বলেন, অসহায় পপিনা বেগমকে দুগ্ধবতী গাভী হস্তান্তরের ঘটনাটি খুব বড় না হলেও এটি একটি মহৎ উদ্যোগ। যা সম্ভব হয়েছে আজকের অতিথিদের ভালো মানসিকতার কারণে। কালের কণ্ঠের পাঠক সংগঠন হিসেবে শুভসংঘ যাত্রা শুরু করলেও এটি এখন দেশের বৃহৎ একটি সামাজিক সংগঠনে পরিনত হয়েছে। দুই বাংলার জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও কালের কন্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন এর নেতৃত্বে দেশব্যাপী প্রতিনিয়ত ভালো কাজ করে যাচ্ছে শুভসংঘের বন্ধুরা।

আলোচনা শেষে অতিথিরা পপিনা বেগমের হাতে বছুরসহ গাভী তুলে দেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা