kalerkantho

শনিবার। ২ মাঘ ১৪২৭। ১৬ জানুয়ারি ২০২১। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪২

টাঙ্গাইলে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ছয়জনের সবাই রংপুরের

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

৪ ডিসেম্বর, ২০২০ ২১:২৯ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



টাঙ্গাইলে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ছয়জনের সবাই রংপুরের

মায়ের সঙ্গে দেখা করার জন্য বেশ কিছুদিন ধরে বায়না ধরেছিল ৭ম শ্রেণির ছাত্রী পিতৃহারা লুহানা খাতুন (১৩)। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মায়ের সাথে তার আর দেখা হলো না। আর কোনোদিন স্কুলেও যাবে না সে। গার্মেন্টসকর্মী মা সাজেদা বেগমের সাথে ঢাকায় দেখা করতে যাওয়ার সময় টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় সে মারা গেছে। সেই সঙ্গে তার চাচাতো ভাইসহ আরো যে পাঁচজন বাসযাত্রী মারা গেছেন তারা সবাই রংপুরের পীরগঞ্জের বাসিন্দা।

এ খবর ছড়িয়ে পড়লে পীরগঞ্জের দুই গ্রামে শুরু হয় শোকের মাতম। শুক্রবার সকালে ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কের মির্জাপুর উপজেলার কুরণী এলাকায় যাত্রীবাহী বাসটি সড়কে বিকল হয়ে যায়। সড়কের পাশে চলছিল তা মেরামতের কাজ। অনেকে বাস থেকে নেমে পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন। এসময় ঢাকাগামী সবজিভর্তি একটি ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের ওপর দিয়ে উঠিয়ে দিলে মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনা ঘটে।

শুক্রবার দুপুরে পীরগঞ্জের শানেরহাট ইউনিয়নের হরিপুর শাহাপুর (রাজাকপুর) গ্রামে গিয়ে দেখা যায় চলছে শোকের মাতম। দুর্ঘটনার খবর শোনার পর নিহতদের স্বজনরা অনেকেইে নির্বাক হয়ে আছেন। কোনো কথা বলতে পারছিলেন না।

গ্রামবাসী জানায়, ওই গ্রামের লুলু মিয়ার সংসারে অভাব ছিল প্রকট। বছর দুয়েক আগে স্ট্রোক করে মারা যান তিনি। তার স্ত্রী সাজেদা বেগম পরিবারের অভাব মেটাতে মেয়ে লুহানা ও ছেলে লিটনকে বাড়িতে রেখে ঢাকায় পাড়ি জমান। সেখানে গার্মেন্টসে একটি চাকরি নেন। স্থানীয় শানেরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণির ছাত্রী লুহানা। আর ছোট ভাই লিটন পড়ে পঞ্চম শ্রেণিতে।
লুহানা ঢাকায় মায়ের সাথে দেখা করার জন্য আপন চাচাতো ভাই ৫ম শ্রেণির ছাত্র শওকাত মিয়াকে সাথে নিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে পীরগঞ্জের বড়দরগা বাসস্ট্যান্ডে ‘সেবা ক্লাসিক পরিবহন’ নামের একটি বাসে ওঠে। ওই বাসে পীরগঞ্জের আরো কয়েকজন ওঠেন। শুক্রবার সকালে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে দুর্ঘটনায় ছয়জন নিহত হন। নিহতরা সবাই রংপুরের পীরগঞ্জের।

নিহত ধল্লাকান্দি গ্রামের আশরাফুলের স্ত্রী আঙ্গুরা বেগম, বুকফাটা আহাজারি করছিলেন। তিনি বলেন, সারাটা জীবনই হামার কষ্টে গেল। মোর স্বামী এস্কা (রিকশা) চলে সংসার চালানোর জন্যে ঢাকাত যাওছিলো। কিন্তু বাস এক্সিডেন হয়া মরি গেইল। এ্যালা একটা বেটা ছোল (ছেলে) নিয়া মুই কি করিম। আল্লাহ মোর কপালোত ক্যা এতো দুক্কো লেকছেন!

নিহতরা হলেন শানেরহাট ইউনিয়নের হরিপুর শাহাপুরের (রাজাকপুর) লুহানা, শওকাত, ধল্লাকান্দি গ্রামের সিরাজুল ইসলাম, আশরাফুল ইসলাম, খোলাহাটি গ্রামের সৈয়দ আলী এবং একজন অজ্ঞাতনামা। নিহত সিরাজুল, আশরাফুল এবং সৈয়দ আলী এই তিনজন ঢাকায় রিক্সা চালানোর জন্য যাচ্ছিলেন। নিহতদের মরদেহ বাড়িতে নিয়ে আসার জন্য তাদের পরিবারের সদস্যরা টাঙ্গাইলে চলে গেছেন। অপরদিকে লাশগুলো দাফনে পরিবারের পক্ষ থেকে কবর খনন করে রাখা হয়েছে।

এ ব্যাপারে শানেরহাট ইউপি চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান মন্টু বলেন, নিহত সবাই আমার ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং তারা দরিদ্র পরিবারের। আমি ব্যক্তিগত তহবিল থেকে নিহত পরিবারগুলোকে সহায়তা দেব। পাশাপাশি সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সুবিধা দেওয়া হবে।

এ খবর লেখা পর্যন্ত নিহতদের পরিবারের সাথে স্থানীয় প্রশাসন কোনো খোঁজ খবর নেয়নি। পীরগঞ্জ থানার ওসি সরেস চন্দ্র বলেন, শুনেছি পাঁচজনের মৃত্যুর কথা। আর কিছু বলতে পারেননি তিনি। এ ব্যাপারে জানতে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ইউএনও বিরোদা রানী রায়কে তার সরকারি মোবাইল নম্বরে ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা