kalerkantho

রবিবার । ১০ মাঘ ১৪২৭। ২৪ জানুয়ারি ২০২১। ১০ জমাদিউস সানি ১৪৪২

উল্টো ভূমিদস্যুদের মামলায় আসামি প্রশাসক-নির্বাহী-ওসি থেকে কৃষক

►প্রতিবছর চরের ধান কাটা নিয়ে খুন, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, মামলা লেগেই আছে ►এবারও জোদদার লাঠিয়াল বাহিনী ধান কেটে নেয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু করেছে ►চরের খাস জমির মালিকানা প্রশ্নে দাবিদারের কেউ দাখিলার সূত্রে, কেউ ভূয়া কাগজপত্রের সূত্রে, আবার কেউ দখল সূত্রে

সাইমুন রহমান এলিট, গলাচিপা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি    

৪ ডিসেম্বর, ২০২০ ১৪:০১ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



উল্টো ভূমিদস্যুদের মামলায় আসামি প্রশাসক-নির্বাহী-ওসি থেকে কৃষক

গলাচিপার চরাঞ্চলে খাস জমি দখলকে কেন্দ্র করে ১২টি মামলা-পাল্টামামলায় সরকারি ও সাধারণ কৃষকসহ চারশতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনা শুধুমাত্র একটি চরেই। প্রকৃতপক্ষে গলাচিপার বিভিন্ন চলাঞ্চলে এ মামলা ও আসামির সংখ্যা অন্তত পাঁচগুণ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন। প্রতিবছর চরের ধান কাটা নিয়ে খুন, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, মামলা লেগেই আছে। আর এ মামলা হামলাকে প্রধান হাতিয়ার করে হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে ভূমিদস্যুরা। তারা ভূমিহীনদের ফলানো ধান লুটে নেয়। ধান কাটাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে গত ২১ অক্টোবর গলাচিপা চরওহাবের কৃষক কাসেম মৃধা নিহত হন। এসময় অন্তত ১৮ জন আহত হয়েছে। ফলে এসব এলাকার চাষীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। খাসজমির প্রশ্নে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। উদ্বুদ্ধ পরিস্থিতি সামাল দিতে বিরোধীয় এলাকায় পুলিশের টহল বৃদ্ধি করেছে। বিভিন্ন এলাকার ভুক্তভোগী ও পুলিশ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

গলাচিপার চরবিশ্বাসের চরওহাবের ভূমিহীন কৃষক আবুল কাসেম ফকির (৬৫) জানান, ধান কাটা মৌসুম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপজেলার চরাঞ্চল অশান্ত হয়ে উঠেছে। চাষীদের ধান কাটার আগেই প্রতিবছরের মতো এবারও জোদদার লাঠিয়াল বাহিনী ধান কেটে নেয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু করেছে। এতে ভূমিহীন চাষীদের মাঝে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ধানের রঙ যতোই সোনালী হচ্ছে তাদের মধ্যে ততোই উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিবছর ধান কাটা মৌসুম গলাচিপা উপজেলার চরবাংলা, চরকাজল, চর বিশ্বাস, গোলখালী, আমখোলা, দড়ি বাহেরচরসহ বিভিন্ন এলাকায় জোদদারদের লাঠিয়াল বাহিনীর মহড়ায় শান্ত চরাঞ্চল অশান্ত হয়ে উঠছে।

ধান কাটা নিয়ে চরাঞ্চলে সহিংসতা নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রতিবছরই ধান কাটা মৌসুমে চরাঞ্চলে সহিংস ঘটনা ঘটছে। 

এ বছর চরকাজলের চরশিবা গ্রামে লাঠিয়াল জোদদারদের প্রভাবে ভিটে ছাড়ার উপক্রম হয়েছে ফারুক খানসহ দুই পরিবারের। জমির কাগজপত্র সঠিক থাকলেও প্রতিনিয়ত হামলা-হুমকিতে আতঙ্কে রয়েছেন তারা। গত আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে কালাম মাঝি ও নাজিমের নেতৃত্বে একদল হামলা চালায় ফারুক খানের বাড়িতে। এ ঘটনায় ফারুক খান বাদি হয়ে গত ১৯ আগস্ট আবদুল হক কালাম মাঝি, মো. নাজিম ও আব্দুল লতিফ খানকে প্রধান আসামি করে ১৮ জনের নাম উল্লেখ করে কয়েকটি মামলা দায়ের করা হয়। এ মামলায় পুলিশ ইতিমধ্যে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোর্টে চার্জশিটও জমা দিয়েছে। কিন্তু এর পরেও আতঙ্ক কাটেনি ফারুক খানের। ফারুক খান বলেন, পুলিশ চার্জশিট জমা দেওয়ার আগেই কালাম মাঝিরা আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা সাজানো মামলা দায়ের করেছে। আইনিভাবে না পেরে আমাদেরকে বিভিন্ন মিথ্যা হয়রানিমূলক মামলায় জাড়তে চাচ্ছে। 

খাস জমি নিয়ে বিরোধ সম্পর্কে গলাচিপা-চরফ্যাশন উপজেলার সীমানা বিরোধীয় চরওহাবের জমি উদ্ধার বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য মো. মিজানুর রহমান জানান, গলাচিপার চরবিশ্বাসের চরওহাবের জমি নিয়ে দীর্ঘ চারদশক ধরে বিরোধ চলে আসছে। গলাচিপার কৃষকদের এসএ ও সিএস ম্যাপ ও যথাযথ কাগজপত্র থাকলেও তা মানতে চায়না ভূমিদস্যুরা। চরওহাবে গলাচিপার অংশের ভূমি একটি জোদদার চক্র নিজেরা একটি পর্চা ম্যাপ করে ভূমি দখলের পাঁয়তারা করে আসছে। আর এ নিয়েই বিরোধ শুরু হয়। এ বিরোধকে কেন্দ্র করে এ বছর গত ২১ অক্টোবর কৃষকদের কাঁচা ধান জোর করে কেটে নিয়ে যাচ্ছিলেন চরফ্যাশনের জোদদার চক্র। এতে বাধা দিলে সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়। এতে ওই সময় কমপক্ষে ১৮ জন ভূমিহীন কৃষককে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে তারা। এর মধ্যে কৃষক কাসেম মৃধার মৃত্যু হয়। এর পরেও থেমে নেই জোদদাররা। 

এ ছাড়াও চরের ধান কাটা নিয়ে ১৯৯৬ সালে গলাচিপা উপজেলার (বর্তমান রাঙ্গাবালী উপজেলা) চরলতায় সংঘটিত হয়েছিল পটুয়াখালী জেলার সর্বকালের নৃশংসতম ঘটনা। জোদদারদের লাঠিয়াল বাহিনীর তাণ্ডবলীলায় চরলতা বিরাণ ভূমিতে পরিণত হয়েছিল। ব্যাপক রক্তপাত, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, অগ্নিসংযোগ, খুন, গুম, ধর্ষণ, অপহরণ ও লুটপাটসহ লাঠিয়ালরা নারকীয় তাণ্ডব চালায়। ভূমিহীনদের ৫শ ৩১টি ঘরে অগ্নিসংযোগ কর সম্পূর্ণ ভষ্মিভূত করে দেয়া হয়। অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান কৃষক নারায়ন চন্দ্র। আহত হন কয়েশ’ ভূমিহীন নারী-পুরুষ ও শিশু-কিশোর। তিনি আরো জানান, চরের খাস জমির মালিকানা প্রশ্নে দাবিদারের সংখ্যা অনেক। কেউ দাখিলার সূত্রে, কেউ ভূয়া কাগজপত্রের সূত্রে, আবার কেউ দখল সূত্রে। তবে চরাঞ্চলে জমির মালিকানা হিসবে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ সংখ্যাই বেশি। ধান কাটার মৌসুমে জোদদাররা লাঠিয়াল বাহিনী ভাড়া করে ভূমিহীন কৃষকের ধান লুট, বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ, খুন, ধর্ষণ ও অপহরণসহ ভূমিহীনদের ওপর অত্যাচার ও নির্যাতন চালায়। ভূমিহীনরা অসহায় হয়ে যায় এবং পরিবার পরিজন নিয়ে অনাহারে অর্ধাহারে মানবেতর জীবনযাপন করেন। তিনি আরো জানান, গত ২০১৯ সালে চরফ্যাশন এলাকার জনৈক আলী আহম্মদ পটুয়াখালী ও ভোলা জেলা প্রশাসক, পটুয়াখালী ও ভোলা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), পটুয়াখালী জেলা পুলিশ সুপার, গলাচিপা ও চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী অফিসার, গলাচিপা ও চরফ্যাশন সহকারী কমিশনার (ভূমি), গলাচিপা অফিসার ইনচার্জ, ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার, চরবিশ্বাস ইউপি চেয়ারম্যানসহ মোট ১২ জনকে আসামি মামলা দায়ের করেন। এ মামলা ভোলার চরফ্যাশনের যুগ্ম জেলা জজ আদালতে চলমান। এ ছাড়াও শুধুমাত্র চরওহাবে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি ১২ মামলা চলমান। এতে কমপক্ষে ২০০ শতাধিক আসামি রয়েছে।

এ বিষয় গলাচিপা উপজেলা ভূমি অফিসের ভারপ্রাপ্ত কানুনগো ও সার্ভেয়ার মো. কামরুল হাসান বলেন, গলাচিপা উপজেলায় মোট খাস জমির পরিমাণ ৪০ হাজার একরেরও বেশি। এর মধ্যে বন্দোবস্ত ছাড়া এখনো প্রায় সাড়ে ৫ হাজার একর ভূমি রয়েছে। সাড়ে ৫ হাজার একরের মধ্যে প্রায় ৩০০ একর জমি বেদখল রয়েছে।

ধানকাটা নিয়ে বিরোধ সম্পর্কে গলাচিপা থানার অফিসার ইনচার্জ মো. মনিরুল বলেন, আপাতত বড় কোনো সমস্যা নেই। তবে যেসকল এলাকায় ধানকাটা নিয়ে বিরোধ রয়েছে ওই সকল এলাকায় পুলিশের বিশেষ টিম টহল দিচ্ছে। আমরা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছি। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা