kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ মাঘ ১৪২৭। ২৮ জানুয়ারি ২০২১। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

লোকচক্ষুর আড়ালে রাতারগুলের চেয়েও বড় ও প্রাচীন জলাবন লক্ষ্মীবাওর

►শীতের পাখি আর বর্ষার পানিতে অপরূপ ►পর্যটন কেন্দ্র করার উদ্যোগ

শাহ ফখরুজ্জামান, হবিগঞ্জ প্রতিনিধি   

৩ ডিসেম্বর, ২০২০ ১২:৩০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



লোকচক্ষুর আড়ালে রাতারগুলের চেয়েও বড় ও প্রাচীন জলাবন লক্ষ্মীবাওর

বর্ষায় চারিদিকে অথৈ জলরাশি। নীল জলের বুকে ভেসে থাকা হিজল আর করচের বাগানে সৃষ্টি হয়েছে অপরূপ সৌন্দর্য। বর্ষার জল নেমে গেলেও কমতি নেই সেই সুন্দরের। ঝাঁকে ঝাঁকে আসা অতিথি পাখির কিচির মিচির শব্দে আকর্ষণ আরও বেড়ে যায় বহুগুণ। স্থানটির নাম লক্ষ্মীবাওর। এমন একটি নৈসর্গিক সৌন্দর্যের জায়গা অযত্ন আর অবহেলায় লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যায় দিনের পর দিন। আয়তনে দেশের সবচেয়ে বড় এই জলাবনকে ঘিরে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি দীর্ঘদিনের হলেও এতদিন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি কেউ। এরই মাঝে নতুন আশার সৃষ্টি করেছে হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসন। জেলার ব্র্যান্ডিং পর্যটন হওয়ায় লক্ষ্মীবাওরকে ঘিরে নতুন পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। 

হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান জানান, লক্ষ্মীবাওরকে একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার জন্য প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পে থাকবে ওয়াচ টাওয়ার, ওয়াশ ব্লক, যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়নসহ একটি পর্যটন কেন্দ্রের মৌলিক বিষয়গুলোর উন্নয়ন ও অবকাঠামো গড়ে তোলা। স্থানীয় জনগণকে সাথে নিয়ে অংশীদারি ভিত্তিতে এই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে স্থানীয় লোকজনের সাথে আলোচনা হয়েছে। তারাও এ ব্যাপারে ইতিবাচক। এখানে এসে পর্যটকরা সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। পাশাপাশি জীবজন্তু ও পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে এটি গড়ে উঠবে। এই শীতে কেউ যেন অতিথি পাখি শিকার করতে না পারে সেজন্য প্রশাসন তৎপর রয়েছে। এটি হবিগঞ্জের সম্পদ। সকলে মিলেই এ সম্পদ রক্ষা করতে হবে। ইজারাদাররা যেন সম্পূর্ণ সেচ না করেন সেজন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কয়েকদিন পূর্বে লক্ষ্মীবাওর জলাবন পরিদর্শন করেছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. নূর-উর-রহমান।

হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার প্রান্তসীমানায় খড়তি নদীর দক্ষিণে বিশাল হাওরের মধ্যে লক্ষ্মীবাওর জলাবনের অবস্থান। এর দক্ষিণ দিকে লোহাচুড়া, উত্তরে খড়তি আর পশ্চিমে নলাই নদী। তার পূর্ব পাশে আবার রয়েছে গঙ্গাজলের হাওর। কয়েকশ’ বছর আগে প্রকৃতিগতভাবেই এর সৃষ্টি বলে স্থানীয় লোকজন জানান। স্থানীয়দের কাছে লক্ষ্মীবাওর কিংবা খড়তির জঙ্গল নামে পরিচিত। হবিগঞ্জ শহর থেকে ১২ মাইল পর বানিয়াচঙ্গ আদর্শবাজার থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটারের পথ লক্ষ্মীবাওর জলাবনের। জলের মধ্যে বনের অনাবিল সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে বর্ষায় নৌকা, হেমন্তে মোটরসাইকেল, ট্রলি কিংবা পায়ে হেঁটে যেতে হয়। হেমন্তে ভোগান্তি একটু বেশি। বর্ষায় স্বচ্ছ জলেই বনটি বেশি উপভোগ্য।
 
এই বনের মোট আয়তন ২০৬ একর। এর মাঝে বানিয়াচং উপজেলায় ১৫৬ একর এবং আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় ৫০ একর। আয়তনে ও বয়সে এটি সিলেটের রাতারগুলের ছেয়েও বড় এবং প্রাচীন। হিজল, করচ, বরুণ, কাকুরা, বউল্লা, খাগড়া, চাউল্লা, নলসহ অসংখ্য গাছ ও গুল্মে পরিপূর্ণ এই জলাবন এতদিন অনাবিষ্কৃতই ছিল। এখানে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী জীবজন্তু। এগুলোর মধ্যে রয়েছে মেছোবাঘ, শিয়াল, গুইসাপ, কেউটে, লাড্ডুকা, দারাইশসহ অনেক বিষধর সাপ। 

বর্ষায় বিভিন্ন জাতের বক, পানকৌড়ি ও বালিহাঁস দেখা গেলেও শীতকালে ঝাঁকে ঝাঁকে অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে নির্জন এই জলাবন। এছাড়া বনটিকে দেশি ও অতিথি পাখির অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
 
পরিবেশবিদদের মতে, পৃথিবীতে ২২টি জলাবন রয়েছে। বাংলাদেশের একটি সুপরিচিত জলাবন হচ্ছে সিলেটের রাতারগুল। রাতারগুলের মতোই বানিয়াচঙ্গের লক্ষ্মীবাওর জলাবন। তবে লক্ষ্মীবাওর জলাবনের আকার ও আয়তনের ব্যাপ্তি অনেক বড়। এ জলাবন নিয়ে গবেষণা করলে এনে দিতে পারে দেশের সবচেয়ে বড় জলাবনের স্বীকৃতি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, এলোমেলো আবার কোথাও সারি সারি হিজল, করচ, বরুণ গাছ। ঢোলকমলি ও নলখাগড়াসহ নানা প্রজাতের জলজ উদ্ভিদে ভরপুর এই বন। হিজল-করচ গাছের সংখ্যা হবে কয়েক হাজার। গাছের ঢালে বসে আছে মাছরাঙা, পানকৌঁড়ি, বালিহাঁস, ডাহুকসহ দেশীয় জাতের নানা রকম পাখি। শরতের বিকেলে অসংখ্য সাদা বক উড়োউড়ি করতে দেখা গেছে। স্থানীয়রা জানান, এ বনে মেছোবাঘ, শিয়াল, লাড্ডুকা, কেউটে, গুইসাপ, গুখড়া, দারাইশসহ বিষধর সাপ রয়েছে।

বানিয়াচংয়ের সংবাদিক আব্দুল কুদ্দুছ বিশ্বাস জানান, বনের বার্ষিক আয় সৈদরটুলা সাত মহল্লার ধর্মীয়-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও অতি দরিদ্রদের কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় হয়। পাখির অভয়াশ্রম রক্ষায় সেখানে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। পাখি শিকার করলে ৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এর বাহিরে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সেখানে অভিযান পরিচালনা করায় পাখি শিকার কমেছে।

তিনি আরও জানান, এই বনের পানি এত স্বচ্ছ যে সেই পানিতে বনের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। শীতে সেখানের জল কচুরীপানার চাদরে আবৃত থাকে। সেই সময় যখন কচুরীপানার ফুল ফুটে তখন সেখানে মনোরম দৃশ্য দেখা যায়।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)'র আজীবন সদস্য ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জহিরুল হক শাকিল জানান, বাংলাদেশের পরিচিত জালাবনটি হচ্ছে সিলেটের রাতারগুল। রাতারগুলের চেয়ে লক্ষ্মীবাওর জলাবনের আকার ও আয়তনের ব্যপ্তি বেশি। বয়সের দিক থেকেও এটি প্রাচীন। এটা দেশবাসীর কাছে পরিচিতি করে তুলতে হবে। জীববৈচিত্র্যে রক্ষার উদ্যোগ নেয়ার পাশাপাশি লক্ষ্মীবাওর জলাবন নিয়ে গবেষণা করলে এনে দিতে পারে দেশের সবচেয়ে বড় জলাবনের স্বীকৃতি।

বানিয়াচং রাজবাড়ীর ওয়াকফ এস্টেটের মোতাওয়াল্লী আহমদ জুলকারনাইন বলেন, বানিয়াচং উপজেলায় লক্ষীবাওরসহ বেশ কিছু ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থান রয়েছে। প্রতিদিন পর্যটকরা এগুলো দেখতে আসেন। বিশেষ করে বানিয়াচং রাজবাড়ী, সাগরদিঘী এবং মোগল আমলের বেশ কয়েকটি মসজিদ দেখতে এখানে লোকজন আসে। বানিয়াচং এশিয়ার বৃহত্তম তথা মহাগ্রাম হওয়ায় সবার মাঝে এই গ্রাম নিয়ে অনেক আগ্রহ। ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বানয়াচংকে পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু এখনও এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। সরকার যদি উদ্যোগ নেয় তাহলে লক্ষ্মীবাওরসহ বানিয়াচংয়ে পর্যটকদের ঢল নামবে। 

স্থাীয় বাসিন্দা ও হবিগঞ্জের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শেখ ফরহাদ এলাহী সেতু জানান, তিনি প্রায়ই সেখানে যান। লক্ষ্মীবাওর একটি অনন্য সুন্দর জায়গা। বিশেষ করে এর ভেতরে যে কয়েকটি খাল রয়েছে সেগুলোর পানি খুবই সুন্দর। খালগুলো খনন করলে এটি আরও আকর্ষণীয় হবে। তনি আরও জানান, বর্ষকালের চেয়ে হেমন্তকালে এটি আরও সুন্দর হয়। এসময় অনেক ধরনের পাখির সমাগম ঘটে এই জলাবনে। বিশেষ করে এটিকে বালি হাঁসের অভয়াশ্রম বলা যায়।

লক্ষ্মীবাওর জলাবনের মালিকানা নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন আছে সেখানে। সৈদরটুলা সাত মহল্লার ধর্মীয়-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও অতি দরিদ্রদের কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় হয় এর আয় থেকে। প্রতি বছর মাছ ও ধানসহ কোট টাকার ওপরে আয় আসে এই বন থেকে। 

সাবেক ইউনিয়ন পরষদ চেয়ারম্যান  ও জেলা আয়ামী লীগ সদস্য হায়দারুজ্জামান ধন মিয়া জানান, লক্ষ্মীবাওরের জমি মুরুব্বিরা কিনে রেখেছেন। এটি এলাকার সম্পদ। এর আয় সাত মহল্লা বণ্টন করে নেয়। বছরে কোটি টাকার ওপর আয় হয় সেখান থেকে। বনের গাছের ডালপালা বিক্রি এবং জলাশয় ইজারা দিয়ে যে আয় হয় তা এলাকার ধর্মীয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠনের এবং জনহিতকর কাজে ব্যয়  করা হয় । এজন্য রয়েছে  ৯ সদস্য বিশিষ্ট পরিচালনা কমিটি।

আমেরিকা প্রবাসী সাংবাদিক তোফায়েল রাজা সোহেল জানান, তথ্য গোপন করে মহল্লার নামে রেকর্ড করানো হয়েছে লক্ষ্মীবাওরের ভূমি। বন কোনদিন ব্যক্তি মালিকানাধিন হতে পারে না। আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামের একজন ব্যক্তিকে ভুয়া মালিক বানিয়ে সৈদারটুলা পঞ্চায়েতের একটি ওয়াক্ফ এস্টেটের নামে এর জমি রেকর্ড করানো হয়েছে। যেহেতু এই বন থেকে অনেক আয় আসে তাই স্থানীয় লোকজনের সাথে সমন্বয় করেই এখানে পর্যটন কেন্দ্র করলে ভালো হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা