kalerkantho

বুধবার । ১৩ মাঘ ১৪২৭। ২৭ জানুয়ারি ২০২১। ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

শহীদ মিনারে প্রতীকী অনশন

দেবোত্তর সম্পত্তি দখলচেষ্টার অভিযোগ- মেয়র আইভী ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি   

২ ডিসেম্বর, ২০২০ ২০:১১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



দেবোত্তর সম্পত্তি দখলচেষ্টার অভিযোগ- মেয়র আইভী ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার দেবোত্তর সম্পত্তি দখলের অপচেষ্টা ও হুমকি প্রদানের প্রতিবাদে প্রতীকী অনশন করেছেন হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েক হাজার নারী-পুরুষ।

জেলা ও মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদ, হিন্দু বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ এবং সর্বস্তরের সনাতন ধর্মাবলম্বীর ব্যানারে বুধবার দুপুর ২টা থেকে নগরীর শহীদ মিনারের বেদিতে শুরু হয় এই প্রতীকী অনশন। এদিকে অনশন কর্মসূচিতে সংহতি ও সহমর্মিতা প্রকাশ করে সেখানে হাজির হয়ে অসাম্প্রদায়িকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নারায়ণগঞ্জের সকল শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা।

তাদের এই দাবির প্রতি সহমর্তিতা ও একাত্মতা প্রকাশ করে সেখানে যোগ দিয়েছেন সিটি করপোরেশনের প্রায় দেড় ডজন কাউন্সিলর, জাতীয় ভিত্তিক ৪টি ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের মুক্তিযোদ্ধারা, জেলা আইনজীবী সমিতি, নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ), বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি, নারায়ণগঞ্জ সাংবাদিক ইউনিয়নসহ ৬টি সাংবাদিক সংগঠন, জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ, জেলা ও মহানগর জাতীয় পার্টি, জেলা ও মহানগর জাসদ, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিসহ নানা শ্রেণি-পেশার সংগঠন।

এর আগে বুধবার দুপুরের আগেই নগরীর চাষাঢ়া এলাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে হিন্দু ধর্মালম্বীরা সমবেত হতে থাকেন। এ সময় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল বলেন, আওয়ামী লীগের লেবাস লাগিয়ে হিন্দু সম্পত্তি দখলের অপচেষ্টা করে মেয়র আইভী দলকে কলঙ্কিত করেছেন। তিনি ভুলে গেছেন আওয়ামী লীগ জনতার আর জনতার শেষ আশ্রয়স্থল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মেয়র আইভীকে অবশ্যই জনতার বিচারের কাঠগোড়ায় দাঁড়াতে হবে। মন্দিরের সম্পত্তি দখলের বিরুদ্ধে আজ মাঠে নামতে হয়েছে- এটা এই সরকারের জন্যম আমাদের জন্য পীড়াদায়ক।

কর্মসুচিতে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা বলেন, আমি ২৫ বছর ধরে ৩ দফায় মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছি। আমি কোনো হিন্দু হিসেবে না, এই শহরের এই জেলার একজন সন্তান হিসেবে এখানে এসেছি। রাজনৈতিক ও পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে আমাকে কখনোই সাম্প্রদায়িকতার মুখোমুখি হতে হয়নি। আমার মৃত্যুর পর আমার মৃতদেহটি হয়তো কোনো মুসলিম ভাই বহন করবেন আর পেছনে থাকবেন হিন্দু ভাই। এটাই তো অসাম্প্রদায়িক নারায়ণগঞ্জ। কিন্তু বড় কষ্ট হয় যখন আমাদেরই দলের মেয়র আইভী ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে হিন্দু সম্পত্তি দখলের অভিযোগ ওঠে। হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয় যখন দেখি জনবিচ্ছিন্ন বামপন্থীরা এই সরকার আর জননেত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কটূক্তি করার দুঃসাহস দেখায় আর এই মেয়র আইভী তাদের সাথে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসেন। কর্মী-সমর্থকদের কাছে তখন লজ্জায় মাথা হেট হয়। কিন্তু এই অবস্থা চলতে দেওয়া যায় না, চলতে দেওয়া যাবে না। খোকন সাহা বলেন, আমি আজ এই মঞ্চে ওয়াদা করছি শুধু মন্দিরের সম্পত্তিই নয়, সে মসজিদ হোক, গির্জা হোক কিংবা প্যাগোডা হোক, যেকোনো উপসনালয়ের সম্পত্তি দখলের বিরুদ্ধে আমি পেশাগত ও রাজনৈতিকভাবে পাশে দাঁড়াব। 

এদিকে অনশন কর্মসূচিতে সংহতি প্রকাশ করে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মহসিন মিয়া বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং গর্হিত কাজ। ব্রিটিশ পর্চাতেই এই সম্পত্তিটি দেবোত্তর হিসেবে উল্লেখ আছে। প্রচলিত আইনে বা হিন্দু আইনেও দেবোত্তর সম্পত্তি বিক্রি বা হস্তান্তরযোগ্য নয়। আমরা জেলা আইনজীবী সমিতি সভা করে একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, এখন থেকে কোনো মসজিদ, মাদরাসা, গির্জা, প্যাগোডা, মন্দিরসহ কোনো ধর্মীয় উপাসনালয়ের সম্পত্তি হরণের অপচেষ্টা হলে আমাদের সাহায্য চাইলে আমরা আইনজীবী সমিতি নিজস্ব উদ্যোগে ও বিনাপয়সায় তাদের পাশে দাঁড়িয়ে আইনি সহায়তা প্রদান করবো।

মহানগর জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক ও বন্দর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান সানাউল্লাহ সানু বলেন, একটি ক্ষুধামুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ সৃষ্টি করতেই বঙ্গবন্ধুর ডাকে বাঙালিরা স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আমার এখনো মনে আছে আজ থেকে প্রায় ৬ বছর আগে এই শহীদ মিনার থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের বের করে দেওয়া হয়েছিল। সেদিন শহীদ মিনারে অনুমতি নেওয়ার অজুহাতে জাতির বীর সন্তানদের অনুষ্ঠান করতে দেয়নি মেয়র আইভী। মুক্তিযোদ্ধারা চাষাঢ়া গোল চত্বরে মুখে কালো কাপড় বেঁধে সে প্রতিবাদ করেছিল। আজ তার বিরুদ্ধে মন্দিরের সম্পত্তি আত্মসাত করার অভিযোগ উঠেছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই এবং সনাতনী ধর্মাবলম্বীদের পাশে থেকে আমরা তা প্রতিহত করব।

কর্মসুচীতে '৭১ এর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির জেলা সভাপতি ও ১৬ জুনের বোমা হামলায় চিরপঙ্গু চন্দন শীল বলেন, যে শহরের জন্ম থেকে কবরস্থান, শ্মশান আর খ্রিস্টানদের সমাধিস্থল একসাথে সেই শহর অসাম্প্রদায়িকতার স্বাক্ষর বহন করবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যারা দলের আর অসাম্প্রদায়িকতার লেবাস লাগিয়ে মন্দিরের সম্পত্তি দখল করে, মসজিদ-মাদরাসার সম্পত্তি দখল করে তারা এই নারায়ণগঞ্জে বসবাসরেই যোগ্য না। তারা চিহ্নিত হয়ে গেছে এবং অচিরেই আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে।

কর্মসূচিতে জেলা পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সভাপতি দীপক কুমার সাহা ও সাধারণ সম্পাদক শিখন সরকার জানান, লক্ষীনারায়ণ জিউর বিগ্রহ মন্দিরের নিজস্ব সম্পত্তি জিউস পুকুরটি গিলে খেতে চাচ্ছেন মেয়র সেলিনা হায়াত আইভীর পরিবার। যে সকল নকল দলিল করে এই সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে সেসব দলিলেই মেয়র আইভীর মা, দুই ভাই, মামা, খালাসহ তারই আত্মীয়-স্বজনের নাম রয়েছে। এর বিরুদ্ধে মামলা করায় বাদী গোবিন্দ ঘোষ ও অন্যান্য হিন্দু নেতৃবৃন্দকে অনবরত হুমকি দিচ্ছেন। ভোটের সময় মেয়র আইভী হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছের মানুষ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে মন্দিরে মন্দিরে গিয়ে 'করজোড়ে নমস্কার' করেন, অথচ তার পরিবারই এই মন্দিরের তথা দেবোত্তর সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করে আসছে। ইতিপূর্বে মেয়র আইভীর বাবা প্রয়াত আলী আহাম্মদ চুনকাও আওয়ামী লীগের নেতা হয়ে জিয়াউর রহমানের আমলে দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে এনে সভা করতেন। যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মুজাহিদযে স্কুলের প্রিন্সিপাল ছিলেন সেই আদর্শ স্কুলের জায়গাও তিনি দখল করে বিক্রি করেছিলেন জামায়াত নেতাদের কাছে। মেয়র আইভী ও পরিবারের এই লেবাসি ভূমিকা আমাদের কাছে অনেক আগেই উন্মোচিত।

প্রতীকী অনশনে সংহতি জানান নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল, বাংলাদেশ ক্লথ মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রবীর কুমার সাহা, ইয়ার্ণ মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি লিটন কুমার সাহা, হোসিয়ারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল আলম সজল, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দেবাশীস সাহা, লাঙ্গলবন্দ স্নান উদ্‌যাপন পরিষদের সরোজ সাহা, মাসদাইর শ্মশান কমিটির সভাপতি নিরঞ্জন কুমার সাহা।

অনশনে উপস্থিত ছিলেন জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খৃস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ কুমার দাস, মহানগরের সভাপতি লিটন চন্দ্র পাল, সাধারণ সম্পাদক নিমাই দে, মহানগর পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের সভাপতি অরুণ দাস, সাধারণ সম্পাদক উত্তম সাহা, জিউস পুকুরের মামলার বাদী গোবিন্দ ঘোষসহ জেলা উপজেলা পর্যায়ের হিন্দু নেতৃবৃন্দ।

এদিকে বুধবার বিকেল ৫টায় অনশনকারীদের সাথে সংহতি প্রকাশ জলপান করিয়ে তাদের অনশন ভাঙান জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মহসীন মিয়া।

উল্লেখ্য, গত ১১ নভেম্বর বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করে এ ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা