kalerkantho

রবিবার। ৩ মাঘ ১৪২৭। ১৭ জানুয়ারি ২০২১। ৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

জীবিকা নির্বাহে থেমে নেই প্রতিবন্ধী আসলাম!

স্বপন কুমার ঢালী, বেতাগী (বরগুনা)   

১ ডিসেম্বর, ২০২০ ১৩:০৬ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



জীবিকা নির্বাহে থেমে নেই প্রতিবন্ধী আসলাম!

ইজি বাইক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে শারীরিক প্রতিবন্ধী আসলাম। ছবি: কালের কণ্ঠ

‘কষ্ট হচ্ছে। এখন আর গাড়ি চালাতে পারমু না। খুব খিদে পাইছে। বাড়ি যাইয়া দুপুরের ভাত খামু। খাওয়ার পর বিকালে বের অইয়া রাইত ১০ টা পর্যন্ত কাজ করতে পারমু। মোরোও আপনাগো মতন পড়ালেখ্যা করার ইচ্ছা আছিলো কিন্তু পরিবারে ট্যাহা পয়সা না থাকোনে করতে পারলাম না।’

কথাগুলো অতি কষ্টে বলছিলেন বরগুনার বেতাগী পৌরসভার ৩ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা ব্যাটারি চালিত ইজি বাইক চালক আসলাম হাওলাদার। বয়স ২৮ বছর। সকাল ৬ থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ব্যাটারি চালিত গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। বিনয়ী স্বভাবের মিষ্টিভাষী ও সদালাপী। উপার্জিত অর্থ দিয়ে মা, স্ত্রী ও ২ মেয়েসহ পরিবারের ৫ সদস্যের জীবিকা নির্বাহ করছে তিনি।

জানা গেছে, আসলামের বাবার নাম হানিফ হাওলাদার এবং মা ফুলবানু বেগম। হানিফ হাওলাদার দিনমজুরের কাজ করতেন। ২০০৮ সালের ১৩ নভেম্বর হানিফ হাওলাদার মারা যান। বাবা-মায়ের ৬ ছেলে ও ১ মেয়ের মধ্যে আসলাম ৫ম। জন্মের ২ বছরের সময় পোলিও হয়ে ডান পা ও হাত বেঁকে যায়। অর্থাভাবে উন্নতি চিকিৎসা করতে পারেনি। এরপর থেকে তিনি হয়ে যান শারীরিক প্রতিবন্ধী। হাঁটতে পারেন না এবং ডান হাত দিয়ে ভালোভাবে ধরতেও পারেন না। তবে বসতে পারেন এবং সবার সাথে ভালোভাবে কথা বলতে পারেন।

তবে প্রতিবন্ধী হলেও জীবিকার টানে থেমে নেই আসলাম। তার বয়স যখন ১২ বছর তখন থেকে চা, পান, বিস্কুট ও সিগারেট বিক্রি করতেন বেতাগী বাসস্ট্যান্ডে একটি ছোট দোকান ঘর নিয়ে। এভাবে ১৪ বছর যাবত দোকান চালিয়েছেন। গাড়িতে করে পরিবারের সদস্যরা বা বাড়ির কেউ দোকানে এনে বসিয়ে দিয়ে যেতেন।

গত দুই বছর আগে প্রতি মাসে ৬ হাজার টাকার কিস্তিতে স্থানীয় ব্রাক এনজিও থেকে ৬০ হাজার টাকা ঋণ নেন এবং বড় ভাই মনির কিছু টাকা দিয়ে সহযোগিতা করেন। এরপর ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা দিয়ে ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক কিনে নেন আসলাম। এরপর থেকে ইজি বাইক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি।

বেতাগী পৌরসভার বিভিন্ন রুটে গাড়ি চালান আসলাম। শারীরিক সমস্যার কারণে গাড়িতে তাঁর কোন ভাই বা বাড়ির কেউ উঠিয়ে দিয়ে থাকে। এরপর গাড়িতে উঠলে তিনি ভালোভাবে গাড়ি চালাতে পারেন।

আসলাম জানান, 'গাড়ি চালিয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এখন ভালোভাবে আছে। ৬ বছর পূর্বে সুমা বেগম (২৪)কে বিবাহ করেন। পরিবারের মা, এলামা (৫) ও সেতু (৩) নামে ২ টি মেয়ে রয়েছে।’

আসলাম সর্ম্পকে স্থানীয় শিক্ষক ও সাংবাদিক আকন্দ শফিকুল ইসলাম বলেন,‘আসলাম সদালাপী, কখনো রাগ হয় না এবং সবার সাথে মিষ্ট ভাষায় কথা বলে। আমরা সকলে ওর ব্যবহারে মুগ্ধ।’ পৌরসভার ৩ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. মিজানুর রহমান মন্টু বলেন,‘আসলামকে প্রতিবন্ধী ভাতা কার্ডে নাম অন্তভূক্ত করা হয়েছে। পরবর্তীতে পৌরসভার সাহায্য ও ফান্ড থেকে সহযোগিতা করা হবে।’

বেতাগী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্ত রবীন্দ্রনাথ সরকার বলেন, 'ওর যখন ৩ বছর বছর বয়স ওই সময়টা ভালোভাবে চিকিৎসা করাতে পারলে তাহলে প্রতিবন্ধী হতো না। এখন আর সুযোগ নেই।’

আসলাম জানান,‘সমাজসেবা অফিস থেকে মাসে ৭৫০ ট্যাহা পাই। কিনতো মোরো একটা গাড়ি দিলে ঋণের কোন ঝামেলা অইতো না।’

এ বিষয় উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা শাহীনুর রহমান বলেন,‘আমরা তাকে ভাতার ব্যাবস্থা করেছি। এ বিষয় কোন বরাদ্দ হলে পূর্নসহযোগিতা করা হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা