kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ মাঘ ১৪২৭। ২৬ জানুয়ারি ২০২১। ১২ জমাদিউস সানি ১৪৪২

ঈশ্বরদীতে ৩০০ বিঘা জমিতে রাসায়নিক সার মুক্ত সবজি চাষ শুরু

শেখ মেহেদী হাসান, ঈশ্বরদী (পাবনা)   

২৬ নভেম্বর, ২০২০ ২২:২৪ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ঈশ্বরদীতে ৩০০ বিঘা জমিতে রাসায়নিক সার মুক্ত সবজি চাষ শুরু

দেশের মানুষের মৌসুমি সবজির চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানির লক্ষ্য নিয়ে ঈশ্বরদীতে রাসায়নিক সার ও বিষমুক্ত স্বাস্থ্য সম্মত মৌসুমি সবজির পরীক্ষামূলক চাষ শুরু হয়েছে। ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ও সহযোগিতায় ইতোমধ্যেই উপজেলার লক্ষ্মিকুন্ডা ইউনিয়নের ৫০০ জন কৃষকের মাধ্যমে ৩০০ বিঘা জমিতে চাষ শুরু করা হয়েছে। পরিবেশ বান্ধব কৌশলের মাধ্যমে নিরাপদ সবজি উৎপাদন প্রকল্পের (আইপিএম) আওতায় এসব জমিতে রবিশস্য হিসেবে বর্তমানে ফুলকপি, বেগুন, শিম চাষ হয়েছে।

আসন্ন খরিপ-১ মৌসুমে (১৬ মার্চ-৩০ জুন) এসব জমিতে মিষ্টি কুমড়া, লাউ, করোলা, চিচিঙ্গা, জিঙ্গা, শসা, টমেটো, মুলা, চাল কুমড়া, খিরা জাতীয় সবজি চাষ করা হবে। ইতোমধ্যেই বিদেশে সবজি রপ্তানিকারক বিভিন্ন কম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। কম্পানিগুলো থেকে আশানুপাতিক সাঁড়া পাওয়া গেছে। দ্রুত এসব কম্পানির প্রতিনিধিদল ঈশ্বরদীতে আসবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এম এ লতিফ কালের কণ্ঠকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

ঈশ্বরদী উপজলো কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য মতে, সরকার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে দেশব্যাপী  পরিবেশ বান্ধব কৌশলের মাধ্যমে নিরাপদ সবজি উৎপাদন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় ঈশ্বরদী উপজলোর লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়নকে নিরাপদ সফসল উৎপাদনের জন্য মডেল ইউনিয়ন হিসেবে ধরা হয়েছে। কারণ উত্তর বঙ্গের প্রধার সবজি চাষ অঞ্চল ঈশ্বরদী। আর সবজি চাষে লক্ষ্মীকুন্ডার মাটি খুবই উপযোগী ও শক্তিশালী। তাই উৎপাদিত সবজির এক তৃতীয়াংশই আসে লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়ন থেকে।

তথ্য মতে, ইতোমধ্যেই এই প্রকল্পের অধীনে চাষাবাদের জন্য আধুনকি প্রযুক্তি গ্রহণে আগ্রহী ৫০০ জন প্রগতিশীল সবজি চাষিকে হাতে কলমে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। তাদেরকে ২০টি দলে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি দলে রয়েছেন ২৫ জন চাষি। এই ২০টি দলের চাষিরা একই ধরণের ফসল চাষ না করে গ্রুপ ভিত্তিক আলাদা আলাদা ধরণের চাষ করবে। কোনো কৃষক কোনো ফসল চাষ করবে তা প্রশক্ষিণ চলাকালেই নির্ধারণ করে উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ধরে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

এই প্রকল্পের আওতায় চাষাবাদে প্রশিক্ষণ নেওয়া লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়নের কামালপুর গ্রামের কৃষক জালাল উদ্দিন, রজিত আলী, রইদুল্লাহ, বিপুল, শরিফ, জিপা ও সুজন কালের কণ্ঠকে জানান, বাব-দাদাদের সময় থেকে তাঁরা কৃষি পরিবার। বাব-দাদাদের দেখানো উপায়ে দীর্ঘকাল থেকে তাঁরা অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি কৃষিকাজ করে আসছিলেন। অজানার কারণে সবজি/ফসলের রোগ বালাই দমনের লক্ষ্যে বাজারে থাকা নানা রকমের রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করে আসছিলেন। কিন্তু এতে তারা ফসলের নানা রকম রোগ বালাই প্রতিরোধ ও রকম পোকা দমন করতে ব্যর্থ হতেন। ফলে সবজি উৎপাদনে তেমন একটা সফলতা অর্জন করতে পারেননি।

তারা আরো জানান, পরিবেশবান্ধব উপায়ে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক মুক্ত সবজি উৎপাদন প্রকল্পের অধীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে তারা অনেক কিছু শিখেছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের শেখানো উপায়ে সবজি চাষ করে বালাই নাশ করতে পেরেছেন। ফসলের উৎপাদন বাড়াতে পেরেছেন। স্বাস্থ্যের ক্ষতিকারক কিটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার না করে উৎপাদিত সবজি তাঁরা ভালো দামে বিক্রয় করতে পারছেন। ফলে আর্থিকভাবে তারা লাভবান হচ্ছেন। তবে তাঁরা প্রশিক্ষণটি বছরব্যাপী চালু রেখে সকল কৃষিককে এই প্রশিক্ষণের আওতায় আনারও দাবি জানান।

ঈশ্বরদী উপজলো কৃষি র্কমর্কতা এম এ লতিফ কালের কণ্ঠকে বলেন, কীটনাশক ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ ছাড়াই ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যে লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনয়িনের ৫০০ জন কৃষককে প্রশক্ষিণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণের বিষয়টি চলমান রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

এই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, দেশের কোনো জমি থেকেই পাঁচ বছরের আগে প্রাকৃতিক (অর্গানিক) সবজি/ফসল উৎপাদন সম্ভব হয়। কারণ প্রতিটি জমিতে নাইট্রোজেন সংযুক্ত রাসায়নিক সার ও কিটনাশক ব্যবহার করে জমিকে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। তারপরও রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার যতটা সম্ভব না করে অধিক পরিমাণে সবজি উৎপাদনের প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এই জন্য রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ছোঁয়া ছাড়ায় সংগৃহিত বীজ বপণ ও রোপণ করা হচ্ছে। এসব সবজির উৎপাদন বাড়াতে জৈব সার ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নানা রকম রোগ বালাই ও পোকা দমনের লক্ষ্যে রাসায়নিক কীটনাশকের পরিবর্তে ফেরোমান ট্যাপ (ফাঁদ), ইয়োলোস্টিকি ট্যাপ, ব্লুস্টিকি ট্যাপ পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষকের প্রতিটি দলে একটি করে নেটহাউজ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।

পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরচিালক কৃষিবিদ আব্দুল কাদের বলেন, দেশের ১০টি উপজেলায় সবজি উৎপাদনের এই প্রকল্পটি চালু হয়েছে। এর মধ্যে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলা রয়েছে। তাই পরিবেশ বান্ধব পরিবেশে রাসায়নিক সার ও কিটনাশক ব্যবহার না করে ফসল উৎপাদন প্রকল্পের সফলতা অর্জন করতে ঈশ্বরদী উপজলো কৃষি র্কমর্কতা কৃষবিদ এম এ লতিফ, কৃষি সম্প্রসারণ র্কমর্কতা মাহমুদা মোতমাইন্না, উপ-সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ র্কমর্কতা এখলাছুর রহমান, উপ-সহকারী কৃষি র্কমর্কতা মনিরুল আহসান, মোজাম্মেল হক ও আব্দুল আলিম মাঠ র্পযায়ে কৃষকদের প্রশক্ষিণসহ কারিগরি দিক নির্দেশনা প্রদান করছেন। আর সকল জেলা থেকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পিএম ইমরুল কায়েস প্রকল্পটির সফলতা কামনা করে কালের কণ্ঠকে বলেন, রাসায়নিক সার কীটনাশক ব্যবহার ছাড়াই উৎপাদিত সবজি স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাবে। বিষ মুক্ত সবজি মানুষ বেশি দামে কিনবে। ফলে কৃষকরাও লাভবান হবে।

ইউএনও আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, প্রকল্পটি সফল হলে দেশের মানুষের সবজির চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব হবে। এতে কৃষকদের আর্থিক উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতির উন্নয়নে কৃষকদের অবদান ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করতে সক্ষম হবে।

এদিকে ঈশ্বরদী উপজেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম খান, পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আব্দুল কাদের, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান আতিয়া ফেরদৌস কাকলী ও উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডাক্তার রফিকুল ইসলাম, লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান শরিফসহ একটি প্রতিনিধিদল সম্প্রতি প্রকল্পটি পরিদর্শন করে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা