kalerkantho

সোমবার । ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৩০ নভেম্বর ২০২০। ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২

লালমনিরহাটে গুজব ছড়িয়ে হত্যা: দেশজুড়ে বিক্ষোভ মানববন্ধন

রংপুর অফিস ও লালমনিরহাট প্রতিনিধি    

১ নভেম্বর, ২০২০ ০৩:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



লালমনিরহাটে গুজব ছড়িয়ে হত্যা: দেশজুড়ে বিক্ষোভ মানববন্ধন

লালমনিরহাটের বুড়িমারীতে সাহিদুন্নবী জুয়েলকে নির্মমভাবে হত্যার প্রতিবাদে এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গতকাল তাঁর সহপাঠী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা রংপুর জিলা স্কুলের সামনে মানববন্ধন করেন। ছবি : কালের কণ্ঠ

লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারীতে গত বৃহস্পতিবার এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার পর মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়ার ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটেছে স্রেফ গুজবে ভর করে। একজনকে দিয়ে শুরু হওয়া গুজব হাজারো মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। আর সেই গুজবের বলি হন রংপুর নগরীর শিক্ষিত, ভদ্র ও নামাজি আবু ইউনুছ মো. সাহিদুন্নবী জুয়েল। তাঁকে পিটিয়ে হত্যার পর লাশটিও পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

এ ঘটনা ঘিরে পাটগ্রাম থানায় তিনটি মামলা হয়েছে। গতকাল শনিবার পর্যন্ত পাঁচজনকে আটকের কথা জানিয়েছে পুলিশ। এদিকে গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে আলেম, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার ও পুলিশের রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি।

লালমনিরহাটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রবিউল ইসলামও গত শুক্রবার পাটগ্রাম থানায় সাংবাদিকদের বলেন, খাদেমের সঙ্গে তাঁর কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে জুয়েলকে বাইরে বের করে এনে ধর্মগ্রন্থ অবমাননার অভিযোগ তোলা হয়। বুড়িমারী বাজারের কয়েকজনও বলেছেন, সেখানে ধর্ম অবমাননার কোনো ঘটনা ঘটেনি। গুজব ছড়ানো হয়েছিল।

নাটের গুরু আবুল হোসেন : ভয়াবহ এই ঘটনার হোতা আবুল হোসেন নামে এক ব্যবসায়ী। ৪২ বছর বয়সী এই ব্যক্তি ঘটনার দিন বুড়িমারী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে আসরের নামাজ পড়েন। মসজিদের খাদেম জোবেদ আলী বলেন, ঘটনার শিকার জুয়েলকে মসজিদ থেকে একাই টেনে চড় মারতে মারতে বাইরে নিয়ে যান আবুল হোসেন। সেখানেই তিনি প্রথম ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলেন।

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তিও একই ধরনের কথা বলেন। ইউপি সদস্য হাফিজুল ইসলাম জানান, মসজিদ চত্বর থেকে আবুল হোসেনসহ কয়েকজনের কাছ থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা হয় জুয়েল ও তাঁর বন্ধুকে। গত শুক্রবার বুড়িমারীতে একজন সাংবাদিকের কাছে আবুল হোসেন নিজেই স্বীকার করেছেন জুয়েলকে মসজিদ থেকে বের করা ও চড় মারার কথা।

তিন মামলা : আবু ইউনুছ মো. সাহিদুন্নবী জুয়েলকে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা, ইউনিয়ন পরিষদে হামলা ও  লুটপাট এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনায় পৃথক তিনটি মামলা হয়েছে। নিহত জুয়েলের চাচাতো ভাই সাইফুল আলম, বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সাঈদ নেওয়াজ নিশাদ এবং এসআই শাহজাহান বাদী হয়ে মামলাগুলো করেছেন। গতকাল পর্যন্ত পাঁচজনকে আটকের কথা জানিয়েছে পুলিশ। পাটগ্রাম থানার ওসি সুমন কুমার মহন্ত গত রাতে এই তথ্য জানান।

ঘটনাস্থলে বিভাগীয় কমিশনার ও ডিআইজি : গতকাল দুপুরে বুড়িমারীর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার আবদুল ওয়াহাব ভূঞা ও পুলিশের রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য। এ সময় তাঁরা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে তাঁরা পাটগ্রাম উপজেলা পরিষদের হলরুমে স্থানীয় আলেম, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এ সময় তাঁরা দোষীদের গ্রেপ্তারে সহায়তা কামনা করেন। মতবিনিময়ে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মো. আবু জাফর, পুলিশ সুপার আবিদা সুলতানা, পাটগ্রাম উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রুহুল আমীন বাবুল, ইউএনও কামরুন নাহার প্রমুখ।

উত্তাল রংপুর : নগরীর শালবন এলাকার বাসিন্দা জুয়েলকে পিটিয়ে হত্যার পর পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় উত্তাল হয়ে উঠেছে রংপুর। ওই ঘটনার প্রতিবাদে নগরীতে গত দুই দিন ধরে বিক্ষোভ-মানববন্ধন চলছে। গতকাল রংপুরবাসী ও জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করে জুয়েল হত্যার বিচার দাবি করা হয়েছে। দুপুরে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে জুয়েলের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি স্বজনদের : রংপুর শহরের শালবন রোকেয়া সরণি এলাকার আব্দুল ওয়াজেদ মিয়ার ছেলে সহীদুন্নবী জুয়েল। ৯ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ষষ্ঠ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লাইব্রেরি সায়েন্সে স্নাতকোত্তর শেষ করে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে গ্রন্থাগারিক পদে চাকরি করতেন তিনি। মানসিক ভারসাম্যহীনতার অভিযোগে চাকরি চলে যাওয়ায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। জুয়েলের দুই সন্তানের মধ্যে মেয়ে দেবা তাসনিয়া অনন্যা কারমাইকেল কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষ এবং ছেলে আবু তাহের মো. আশিকুন্নবী অরণ্য রংপুুুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।

জুয়েলের বড় বোন হাসনা আখতার লিপি বলেন, ‘ভাইয়ের লাশটা পেলেও একটা সান্ত্বনা ছিল। আমরা মনে করি পরিকল্পিতভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এ ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করছি।’ গত বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে মোবাইল ফোনে শেষবারের মতো জুয়েলের সঙ্গে কথা হয় জানিয়ে লিপি বলেন, জুয়েল বলেছিল—চিন্তা করো না বুবু, আমি ভালো আছি। তাড়াতাড়ি ফিরে আসব। এরপর থেকেই সারা দিন ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। রাতে ফেসবুকে তাঁর মৃত্যুর খবর জানতে পারি।’

নিহতের স্ত্রী জেসমিন আক্তার মুক্তা আহাজারি করতে করতে বলেন, ‘আমার স্বামী অনেক সহজ-সরল ছিল। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত, কোরআন-হাদিস পড়ত। আগামী বছর আমাকে নিয়ে হজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। যারা গুজব ছড়িয়ে আমার স্বামীকে হত্যা করেছে তাদের বিচার চাই।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা