kalerkantho

মঙ্গলবার । ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৪ নভেম্বর ২০২০। ৮ রবিউস সানি ১৪৪২

চাঁদপুরে বেপরোয়া জেলেদের লাগাম টানা যাচ্ছে না

ফারুক আহম্মদ, চাঁদপুর   

১ নভেম্বর, ২০২০ ০০:৫৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চাঁদপুরে বেপরোয়া জেলেদের লাগাম টানা যাচ্ছে না

প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ নিধনে চাঁদপুরের পদ্মা ও মেঘনা নদীতে সরকারি নিষেধাজ্ঞার মধ্যে এখনো বেপরোয়া জেলেরা। সুযোগ বুঝে নদীতে জাল ফেলছে এসব জেলে। আর তাতে ধরা দিচ্ছে ডিমওয়ালা মা ইলিশ। অথচ ইলিশ সংরক্ষণে নদীতে দফায় দফায় চলছে অভিযান। তার পরও  লাগামহীন জেলের দল। কোনো অবস্থায়ই তাদের লাগাম টেনে ধরতে পারছে সংশ্লিষ্ট কেউ। 

গত শুক্রবার একটানা আট ঘণ্টা চাঁদপুরের পদ্মা ও মেঘনা নদীতে নৌ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে ঢাকা, চাঁদপুর ও শরীয়তপুরের পাঁচ শতাধিক পুলিশ সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে। এতে আকাশপথে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার, নৌপথে ৯টি স্পিডবোট এবং দুটি লঞ্চ অংশ নেয়।

এদিন ভোররাতে প্রথমে পদ্মা ও মেঘনা নদী বেষ্টিত চাঁদপুর সদর উপজেলার দুর্গম চর রাজরাজেশ্বর এলাকায় অভিযান শুরু হয়। সেখানে নদী ও জেলেপাড়ায় তল্লাশি চালিয়ে কাউকে আটক করতে না পারলেও বিপুল পরিমাণ মাছ ধরার নৌকা ও জাল জব্দ করা হয়। পরে মতলব উত্তরে মেঘনা নদীর পশ্চিমপার ষষ্ঠ খণ্ড বোরোর এলাকায় আরেক দফা অভিযান চালানো হয়। সেখানেও একইভাবে মাছ ধরার নৌকা ও জাল জব্দ করা হয়। তবে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পুলিশের এমন অভিযান আঁচ করতে পেরে এসব এলাকার কয়েক হাজার জেলে গা ঢাকা দেয়। 

নৌ পুলিশ প্রধান কার্যালয়ের পুলিশ সুপার (অপারেশন) সফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে জানান, এ অভিযানে ২৬৫টি মাছ ধরার নৌকা এবং পাঁচ কোটি মিটার অবৈধ কারেন্ট জাল জব্দ করা হয়। পরে জব্দ এসব নৌকা ও জাল আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। তিনি আরো জানান, মা ইলিশ সংরক্ষণের সময়সীমা শেষ হওয়ার পরও অবৈধ কারেন্ট জালের বিরুদ্ধে এমন অভিযান আগামীদিনেও অব্যাহত রাখা হবে।

এর আগে এই অভিযানের চার দিন আগে অর্থাৎ গত রবিবার চাঁদপুর সদরের রাজরাজেশ্বর এলাকায় সংঘবদ্ধ জেলেরা নৌ পুলিশের ওপর হামলা চালায়। এতে শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ২০ পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন। এ ঘটনায় নৌ পুলিশ বাদী হয়ে প্রায় সাড়ে ছয় শ জেলের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেছে। ইতিমধ্যে এ মামলায় সাত জেলেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে গ্রেপ্তার এড়িয়ে অন্য জেলেরা সুযোগ বুঝে নদীতে ইলিশ শিকারে নামছে।

এদিকে শুক্রবার বিকেলে চাঁদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জামানের নেতৃত্বে পদ্মা ও মেঘনা নদীর মোহনা ও তার আশপাশে অভিযান চালানো হয়। এ সময় নদীতে জাল ফেলে কয়েক শ জেলে দ্রুত তীরে উঠে নিজেদের রক্ষা করে। 

এর আগে গত বুধবার র‌্যাব-১১-এর কম্পানি কমান্ডার মেজর তালুকদার নাজমুস সাকিব কোস্টগার্ড, নৌ পুলিশ, জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে সাঁড়াশি অভিযান চালান। কিন্তু শুরুতে শান্তিপূর্ণভাবে হলেও শেষদিকে জেলেদের বেপরোয়া আচরণের কারণে তা ভেস্তে যায়।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, জেলেরা নদীতে জাল ফেললেই বড় আকারের ইলিশ সেই জালে ধরা দিচ্ছে। আর সমুদ্র থেকে নদীর মিঠা পানিতে ডিম ছাড়তে আসা সেই ইলিশের ঝাঁক শিকার করতে সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে জেলেরা নদীতে নামছে। এ জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব জেলে দল বেঁধে ইলিশ নিধনে তৎপর রয়েছে। চাঁদপুর সদর উপজেলার আনন্দবাজার এলাকার একজন জেলে নিজের নাম গোপন রাখার শর্তে জানান, এ সময় নদীতে বড় আকারের ইলিশের পরিমাণ বেশি। তাই নানা ধরনের ঝুঁকি জেনেও নদীতে নেমে পড়ছি। 

এই জেলে আরো জানান, মূলত মধ্যরাতে জাল ফেলে তা ভোররাতে তোলা হয়। এক হাজার মিটার কারেন্ট জালে অন্তত ১৫ হালি ইলিশ ধরা পড়ে। যা প্রতি হালি বিক্রি করতে গেলে ২২০০ থেকে ২৫০০ টাকা পর্যন্ত দাম পাওয়া যায়। এমন পরিস্থিতিতে বাড়তি লাভের আশায় এমন অনৈতিক কাজ করছে এসব জেলে।

অন্যদিকে স্থানীয় ছাড়া রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা এক শ্রেণির লোক এসব মাছ ক্রয় করতে নদীপারের বিশেষ এলাকাগুলোতে অবস্থান করে। ফলে বিনা বাধায় নিজস্ব যানবাহনে ইলিশের চালান নিয়ে নিরাপদে চলে যাচ্ছে তারা। প্রতিদিন ভোরে, রাতের বিশেষ সময় জেলার হাইমচর, চাঁদপুর সদর, মতলব উত্তর ও দক্ষিণের বেশ কিছু এলাকায় ইলিশের এমন জমজমাট হাট বসছে।

মা ইলিশ সংরক্ষণে চাঁদপুর জেলা টাস্কফোর্সের সদস্যসচিব, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আসাদুল বাকী জানান, গত ১৪ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ২২০টি অভিযান এবং ৫৫টি ভ্রাম্যমাণ আদালত চালিয়ে ১৯৩ জন জেলেকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড এবং অন্যদের আর্থিকভাবে জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া প্রায় পাঁচ মেট্রিক টন ইলিশ এবং ১০ কোটি মিটার অবৈধ কারেন্ট জাল জব্দ করা হয়েছে।        
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবারের এই ২২ দিনের অভিযানে চাঁদপুরের ৫০ হাজার জেলেকে খাদ্য প্রণোদনা হিসেবে মাথাপিছু ২০ কেজি হারে চাল দেওয়া হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা