kalerkantho

সোমবার । ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৩ নভেম্বর ২০২০। ৭ রবিউস সানি ১৪৪২

শ্রেষ্ঠ পাঁচ জয়িতার জীবন সংগ্রাম

কপিল ঘোষ, চিতলমারী-কচুয়া (বাগেরহাট)   

৩০ অক্টোবর, ২০২০ ১৯:৩০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



শ্রেষ্ঠ পাঁচ জয়িতার জীবন সংগ্রাম

বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলায় জীবন সংগ্রামে জয়ী হয়েছেন পাঁচ নারী। সমাজের নানা প্রতিকুলতা, নির্যাতন পেরিয়ে তারা সফলতা অর্জন করেছেন। এজন্য সম্প্রতি মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর তাদের শ্রেষ্ঠ জয়িতার সম্মানে ভূষিত করেছে। 

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমান জানান, সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীদের অগ্রগামী করতে সরকারি সম্মানজনক স্মারক বা পদক দেওয়া হয়। শ্রেষ্ঠ জয়িতা-২০১৯ এর পুরস্কারপ্রাপ্ত পাঁচ নারী হলেন- কল্পনা রায় সফল জননী, লেখক দেবকী মল্লিক শিক্ষায় সফল, নাজমা বেগম নির্যাতন ভুলে নতুন উদ্যোমে সফল, কনা পোদ্দার সমাজ উন্নয়নে অবদানকারী এবং অচল সংসার সচল করেছেন কৃষ্ণা রানী বিশ্বাস। সংগ্রামী এই নারীদের জীবনের গল্প হৃদয়স্পর্শী ও শিক্ষণীয়। 

সফল জননী

করুনা রায়ের বিয়ে হয় ১৪ বছর বয়সে। স্বামী পল্লী চিকিৎসক। তাদের চার মেয়ে ও দুই ছেলে। স্বামী ও সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে তিনি মাসে অন্তত ১৫ দিন না খেয়ে থাকতেন। তিনি নিজে লেখাপড়া জানেন না। তাই ইচ্ছে ছিল ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করাবেন। এজন্য শেষ সম্বল দুই বিঘা জমি বিক্রি করতে হয়েছে তাকে। অবশেষে তার স্বপ্ন সফল হয়। এখন তার বড় মেয়ে সুচন্দা রায় ডিপ্লোমা ম্যাটস শেষে হাসপাতালে চাকরি করেন। দ্বিতীয় মেয়ে লিলি রায় এমএ পাসের পর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তৃতীয় মেয়ে শিলা রায় এমএ পাসের পর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। চতুর্থ মেয়ে সীমা রায় ডিপ্লোমা পাস করে-হাসপাতালে চাকরি করেন। প্রথম ছেলে মানস রায় এমএ পাসের পর কলেজের শিক্ষক। সবার ছোট ছেলে বিধান রায় প্রকৌশলী। অভাবের সংসারেও সন্তানদের সঠিক পথে পরিচালনা করেছেন তিনি। চিতলমারীর সন্তোষপুর ইউনিয়নের পিঁপড়ারডাঙ্গা গ্রামের মনিন্দ্রনাথ রায়ের মেয়ে করুনা রায়। তার মা ধনী রানী ও বাবা নকুল বিশ্বাস। সফল জননী হিসেবে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর তাকে শ্রেষ্ঠ জয়িতা পুরস্কার-২০১৯ দিয়েছে।

তিন মাইল হাঁটা শিক্ষায় সফলতা 

দেবকী মল্লিক এখন লেখক বা সাহিত্যিক হিসেবে সমাজে পরিচিত। তাঁর বেশ কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বাংলায় উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। শৈশবে অনেক কষ্টে করেন লেখাপড়া করেন। ঘরে অন্ধ মায়ের পরিচর্যাসহ পরিবারের চার সদস্যের খাবার রান্না করে স্কুলে যেতে হয়েছে। বর্ষাকালে প্রতিদিন প্রায় তিন মাইল জলকাদার রাস্তা হেঁটে স্কুলে যাতায়াত করেছেন। বছরের অন্যান্য মাসে তিন মাইল হাঁটা পথের দূরত্ব কমেনি। তাঁর বাবার আর্থিক অবস্থা ছিল দুর্বল। টিউশনি করে নিজের পড়ার খরচ চালিয়েছেন। তিনি ফকিরহাটের ফলতিতা প্রাইমারী স্কুল, কলকলিয়া জিসি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, খুলনার গিলাতলা কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে লেখাপড়া করেন। বাংলায় অনার্সসহ এমএ পাসের পর বিএড, সংস্কৃত ও পলি বোর্ড থেকে কাব্যতীর্থ ডিগ্রি লাভ করেন। শিক্ষকতায় অবসর নিয়ে বর্তমানে তিনি সাহিত্য চর্চা করছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রাহুর গ্রাস, ভাবনা কুসুম, স্মৃতি অঞ্জলি, রবার্ট এর জন্য (কবিতা), জনারণ্যে উল্লেখযোগ্য। শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে সফলতার জন্য মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর তাকে সম্প্রতি শ্রেষ্ঠ জয়িতা পুরস্কার-২০১৯ দিয়েছে। বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার চরবানিয়ারী ইউনিয়নের চরডাকাতিয়া গ্রামের সনৎ চন্দ্র মল্লিকের সহধর্মিনী দেবকী মল্লিক। পার্শ্ববতী ফকিরহাট উপজেলায় তার মা-বাবার বাড়ি। 

নির্যাতন ভুলে নতুন উদ্যমে সফলতা

চিতলমারী উপজেলা সদরের মো. কামরুল ইসলামের মেয়ে নাজমা বেগম। মা বাবার অভাবী সংসার। এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন। এমন সময় ১৫ বছর বয়সে তাকে বিয়ে দেয়। প্রথম সন্তান জন্মের পর থেকে শুরু হয় ঝামেলা। স্বামী বাপের বাড়ি থেকে টাকা এনে দিতে বলে। রাজি হননি। কিছুদিন পর দ্বিতীয় সন্তান হয়। এ সময় জানাজানি হলো স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের কথা। সংসারে অশান্তি লেগে থাকে। স্বামী মারধর করে। একদিকে স্বামীর নজর বাইরে, অপরদিকে সংসারের যাবতীয় কাজ। এই পরিস্থিতি তার জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। স্বামীর সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। দুই ছেলেকে নিয়ে কী করবে ভেবে পায় না। তার বাবার অল্প একটু জমি ছিল। সেখানে মাছের ঘের করে। তার আয়ে ডেকরেশনের দোকান দেয়। চিতলমারী মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষণ ও ঋণ নিয়ে বাড়িতে ব্লক-বাটিক ও সেলাই কাজ করছেন। প্রতি মাসে আট থেকে ১০ হাজার টাকা আয় করছেন। নির্যাতনের বিভীষিকা ভুলে নতুন উদ্যোমে সফল নারী হিসেবে তিনি শ্রেষ্ঠ জয়িতা পুরস্কার-২০১৯ অর্জন করেন।

সমাজ উন্নয়নে অবদানকারী নারী

দিনমজুর বাবার চার মেয়ের প্রথমজন কনা পোদ্দার। সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালে ১৯৯৪ সালে তার বিয়ে হয়। ২০০০ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। স্বামীর চাহিদার সম্পদ দিতে না পারায় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সইতে হয়। ২০১২ সালে এসএস সংস্থায় কাজ শুরু করেন। ২০১৩ সালে সূর্যের হাসি ক্লিনিকের সিএসপি পদে চাকরি করেন। ২০১৪ সালে সফল প্রকল্পে কাজ করেন। ২০১৬ সালে এমডিএফ সংস্থার ১৫৬ সদস্যের মধ্যে নির্বাচিত সভানেত্রী হন। তিনি মহিলা, শিশু এবং কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য পরামর্শক ও পরিবার পরিকল্পনার পণ্য সেবার সহায়ক। এ ছাড়া বাল্য বিয়ে ও যৌতুক প্রতিরোধ করেন। সমাজ উন্নয়নে অবদানের জন্য তাকে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর শ্রেষ্ঠ জয়িতা পুরস্কার-২০১৯ দিয়েছে। চিতলমারী উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের গোড়ানালুয়া গ্রামের শ্রীবাস পোদ্দারের স্ত্রী কনা পোদ্দার।

অর্থনৈতিক সফলতা

অচল সংসার সচল করলেন কৃষ্ণা রানী বিশ্বাস। তার তিন সন্তান লেখাপড়া শুরু করেছে। কেটে গেছে সংসারের আর্থিক দৈন্যতা। প্রায় ১৫ বছর আগে তার বিয়ে হয়। কয়েক বছরের ব্যবধানে দুই মেয়ে ও এক ছেলের জননী হন। ছেলে-মেয়েরা যখন স্কুলে পড়ালেখা শুরু করে, তখন সংসারে আর্থিক দৈন্যতা মারাত্মক রূপ নেয়। স্বামীর ছোট একটা মুদি দোকানের আয়। সন্তানদের ও সংসারের চাহিদা অপূরণ থাকে। সব যেন অচল হয়ে পড়ে! এমন সময় মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর থেকে ব্লক-বাটিক  প্রশিক্ষণ এবং ১০ হাজার টাকা ঋণ নেন। সিট কাপড় কিনে ছোটদের পোশক তৈরি করেন। তা গ্রামে, বাজারে  বিক্রি করে কিছু টাকা লাভ হয়। এর কয়েক মাস পর যশোর ও কুষ্টিয়া থেকে থ্রিপিছ, ওড়না, বেডশিট, প্রিন্ট শাড়ি আনতে শুরু করেন। তা গ্রামে বিক্রি করে লাভবান হন। তার ব্যবসায় বর্তমান মাসিক আয় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। এই টাকা দিয়ে তার ছেলে মেয়ের পড়াশুনার খরচ দিয়ে আরো পরিবারকে সহযোগিতা করছে। তিনি বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার সদর ইউনিয়নের পুরাতন কালশিরা গ্রামের স্বপন কুমার বিশ্বাসের স্ত্রী কৃষ্ণা রানী বিশ্বাস। তার মায়ের নাম প্রভালতা পোদ্দার। ‘অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী’ হিসেবে কৃষ্ণা রানী বিশ্বাসকে উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর শ্রেষ্ঠ জয়িতা পুরস্কার-২০১৯ দিয়েছে। কৃষ্ণা রানী বিশ্বাস চিতলমারী উপজেলার সদর ইউনিয়নের পুরাতন কালশিরা গ্রামের স্বপন কুমার বিশ্বাসের সহধর্মিনী।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা