kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৩ ডিসেম্বর ২০২০। ১৭ রবিউস সানি ১৪৪২

৯ মামলায় ১০ বছর ভোটহীন পৌরসভা

বেনাপোল প্রতিনিধি   

২৭ অক্টোবর, ২০২০ ১৭:৪৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



৯ মামলায় ১০ বছর ভোটহীন পৌরসভা

প্রায় ৫ বছর ধরে আদালতে ঝুলে আছে সীমানা সংক্রান্ত জটিলতার ৯টি মামলা। কবে মামলা নিষ্পত্তি হবে সেটি কেউ নিশ্চিত নয়। সীমানা জটিলতার মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় বেনাপোল পৌরসভার নির্বাচন এবারো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ভোট না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে পৌরবাসী। পৌরবাসীরা বলছে, যে সব সংসদীয় এলাকায় মামলা আছে সেসব এলাকায় তো জাতীয় নির্বাচন হচ্ছে। তাহলে বেনাপোল পৌরসভায় কেনো নির্বাচন হবে না। পাঁচ বছর পরপর নির্বাচন হলে ভালো হয়।

২০০৬ সালে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বেনাপোল ইউনিয়নের ১১টা গ্রামের অংশ নিয়ে (৮.৬০ বর্গ মিটার আয়তনে) বেনাপোল তৃতীয় শ্রেণির পৌরসভা হিসাবে ঘোষণা করেন। ২০০৬ সালের ১৬ এপ্রিল থেকে বেনাপোল পৌরসভার প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বিএনপি নেতা শামছুর রহমান। সেনা সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তাকে সরিয়ে শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বশীর আহমদকে প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব পালন করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ড. আব্দুল হাকিম, কামরুল আরিফ। ২০১০ সালের ১ ডিসেম্বর তৃতীয় শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করা হয় বেনাপোল পৌরসভাকে।

এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১১ সালের ১৩ জানুয়ারি বেনাপোল পৌরসভার প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম ভোটে মেয়র নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ নেতা আশরাফুল আলম লিটন। ২০১১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বেনাপোল পৌরসভা প্রথম শ্রেণির মর্যাদা পায় স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে। বেনাপোল পৌরসভার নাগরিকরা ২০১১ সালে একবার ভোট দিতে পেরেছে। পাঁচ বছর পর ২০১৫ সালের ১৩ জানুয়ারি পৌরসভার মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়। তারপর থেকে আর নির্বাচন হয়নি।

পৌর মেয়র আশরাফুল আলম লিটন বলেন, এই পৌরসভা ৮ দশমিক ৬০ বর্গকিলোমিটার আয়তন নিয়ে যাত্রা শুরু করে। ২০১২ সালের ১১ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে 'পরিকল্পিত নগর উন্নয়ন' সভায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব বেনাপোল পৌরসভার আয়তন ২৪ বর্গকিলোমিটারে সম্প্রসারণের জন্য একটি প্রস্তাবনা দেন।

২০১৩ সালে বেনাপোল পৌরসভার সীমানা বর্ধিত করার কাজ শুরু হলে বেনাপোলের নারায়নপুর গ্রামের হাফিজুর রহমান নামে এক ব্যক্তি তার এলাকার কিছু অংশ পৌরসভার সীমানায় অন্তর্ভূক্তি না করার জন্য উচ্চ আদালতে একটি রিট করেন। এরপর বেনাপোলের মিয়াদ আলী, আজিবর রহমানসহ আরো ১০জন উচ্চ আদালতে আরো ৮ রিট মামলা করেন। অবশ্য ৯ জন বাদীর মামলার বিষয়বস্তু ছিল একই রকম। তারা উল্লেখ করেন, তাদের এলাকায় দরিদ্র মানুষের বসবাস, তারা কম আয়ের মানুষ, তাদেরকে পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত করা হলে বেশি বেশি ট্যাক্স দিতে হবে। ফলে তারা পৌর এলাকার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে চান না।

প্রায় ৭ বছর ধরে আদালতে ঝুলে আছে সীমানা সংক্রান্ত জটিলতার ৯টি মামলা। কবে মামলা নিষ্পত্তি হবে সেটি কেউ নিশ্চিত নয়। এতে পৌরসভার ভোট গ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ভোট না হওয়ায় বর্তমান মেয়র আশরাফুল আলম লিটনকে দুষছেন অনেকেই। তার কলকাঠিতেই মামলার জালে ভোট বন্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন পৌরবাসীরা।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মেয়র আশরাফুল আলম লিটন বলেন, সীমানা সংক্রান্ত জটিলতার ৯টি মামলা রয়েছে আদালতে। মামলা নিয়ে অনেকে না বুঝে 'রাজনৈতিক কারণে' আমাকে দোষারোপ করছেন। আমিও চাই মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হয়ে ভোট হোক। নাগরিক অধিকার নির্বাচন। তাই তিন বছর আগেও মামলাটি নিষ্পত্তির জন্য আমি ও আমার পরিষদ চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু মামলার কোনো অগ্রগতি নেই।

বেনাপোল পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বড়আঁচড়া গ্রামের নাসির উদ্দিন বলেন, আদালতে মামলা থাকায় দীর্ঘদিন ভোট হচ্ছে না। ভোট না হওয়ায় মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থী হতে আশা পোষণ করেন এমন নেতাকর্মীরা হতাশ। দীর্ঘদিন পৌরসভার নির্বাচন না হওয়ায় অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কাঙ্খিত উন্নয়ন বঞ্চিত নাগরিক সমাজ। বর্তমান পরিষদের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতাও নেই। মেয়র আশরাফুল আলম লিটন কৌশলে নিজের লোক দিয়ে মামলা করিয়ে পৌরসভার নির্বাচন আটকে রেখেছেন দীর্ঘদিন ধরে। দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হোক।

বেনাপোল পৌরসভার বাসিন্দা শার্শা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ নুরুজ্জামান বলেন, বেনাপোল পৌরসভায় মামলা জটিলতায় ভোট আটকে আছে। ভোট নাগরিক অধিকার। বেনাপোলবাসী চাই জটিলতা কাটিয়ে পৌর নির্বাচন হোক। জনগন ভালো নাগরিক সুবিধা পাক। এ জন্য যত দ্রুত সম্ভব ভোট হওয়া উচিৎ বলে মনে করেন তিনি। 

বেনাপোল পৌরসভার নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন সংগ্রাম করছেন আমরা বেনাপোলবাসীর ব্যানারে। ওই সংগঠনের আহবায়ক মুস্তাক আহমেদ স্বপন বলেন, একবার নির্বাচন করে দুই টার্ম ক্ষমতায় রয়েছে মেয়র কাউন্সিলররা। এতে একঘেয়েমি হয়ে যায়। ভোট না হলে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত হয় না। আমরা ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচন করে নাগরিক অধিকার ফিরে পেতে চাই। মেয়র কৌশলে নিজের লোক দিয়ে মামলা করিয়ে পৌরসভার নির্বাচন আটকে রেখেছেন বলে দাবি করেন তিনি।

শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পুলক কুমার মন্ডল বলেন, সম্প্রতি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে পৌরসভার মামলা সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে চিঠি দিয়েছে। সেই চিঠির প্রেক্ষিতে বেনাপোল পৌরসভার মামলা সংক্রান্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। নির্বাচনের ব্যাপারে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় পরবর্তী ব্যবস্থা নেবেন।

যশোর-১ (শার্শা) আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য আলহাজ শেখ আফিল উদ্দিন বলেন, আমি শুনেছি বেনাপোল পৌর সভায় বিভিন্নভাবে সাজানো মিথ্যা মামলা দিয়ে নির্বাচন করতে দেওয়া হচ্ছে না। বেনাপোল পৌরবাসীর সঙ্গে আমিও চাই একটি সুন্দর নির্বাচন হোক।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা