kalerkantho

বুধবার । ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৫ নভেম্বর ২০২০। ৯ রবিউস সানি ১৪৪২

পুলিশ হেফাজতে রায়হানের মৃত্যু

এসআই আকবর এখনো ফেরারি

সিলেট অফিস   

২৫ অক্টোবর, ২০২০ ০২:৫৯ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



এসআই আকবর এখনো ফেরারি

সিলেটের বন্দরবাজার ফাঁড়িতে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনে রায়হান আহমদের মৃত্যুর ঘটনার মূল হোতা এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া এখনো ফেরারি। ঘটনার ১৩ দিন পরও আকবর গ্রেপ্তার না হওয়ায় সুষ্ঠু বিচার নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন রায়হানের মা সালমা বেগম। আকবরসহ দোষীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবিতে গতকাল শনিবার নগরের মদিনা মার্কেট ও খাসদবীর এলাকায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচিতে রায়হানের মা সালমা বেগম এই শঙ্কার কথা জানান। এ সময় তিনি আকবর গ্রেপ্তার না হওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, ‘আকবরকে কেন ধরা হচ্ছে না? পুলিশের জন্য এটা কি খুব কঠিন কাজ? তাকে ধরলে হয়তো বড় বড় মানুষের নাম বেরিয়ে আসবে, সে জন্য তাকে ধরা হচ্ছে না।’

এদিকে পুলিশ হেফাজতে রায়হানের মৃত্যুর ঘটনায় হারুনুর রশিদ নামের আরেক পুলিশ সদস্যকে গত শুক্রবার রাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর হারুনুর রশিদকে আদালতের মাধ্যমে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে এই হত্যা মামলার তদন্তের দায়িত্বে থাকা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ নিয়ে দুই পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নিল পিবিআই। এর আগে গত মঙ্গলবার পুলিশ কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাসকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নেওয়া হয়।

এদিকে এ ঘটনায় আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে তিন পুলিশ সদস্য জানিয়েছেন, সত্য বললে বুকে গুলি করবেন বলে আকবর সেদিন তাঁদের হুমকি দিয়েছিলেন। এ পর্যন্ত তিন পুলিশ সদস্য আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁরা হলেন- কনস্টেবল শামীম মিয়া, সাইদুর রহমান ও দেলোয়ার হোসেন। তাঁরা তিনজনই বলেছেন, রায়হানকে বেধড়ক পেটানো হয়েছে। রায়হান মারা গেলে বিষয়টি চেপে যাওয়ার জন্য এসআই আকবর তাঁদের হুমকি দিয়েছিলেন বলে তাঁরা জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন।

মামলার তদন্তকারী পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, তিন কনস্টেবলের জবানবন্দির পরদিনই বরখাস্ত কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাসকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়। তিন প্রত্যক্ষদর্শী কনস্টেবলের জবানবন্দিতে পাওয়া তথ্যের সূত্র ধরে তদন্ত চলছে।

জবানবন্দিতে যা বলেছেন তিন কনস্টেবল : রায়হানকে যেদিন বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে ধরে এনে নির্যাতন করা হয়, সেদিন অর্থাৎ শনিবার রাত ১২টা থেকে রবিবার ভোর ৪টা পর্যন্ত ফাঁড়ির সেন্ট্রি ডিউটিতে ছিলেন সাইদুর রহমান। সেদিন রায়হানকে ধরে আনা এবং নির্যাতনের ঘটনার তিনি প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়ে সাইদুর বলেছেন, ‘ফাঁড়ির পোস্টে থাকা অবস্থায় আর্তচিৎকার শুনে কক্ষের দরজায় গিয়ে দেখি কনস্টেবল হারুন রায়হানের দুই পা উঁচু করে ধরে রেখেছেন আর আকবর ও টিটু লাঠি দিয়ে লোকটির পায়ের পাতায় আঘাত করছেন।’ এ সময় পুলিশ ছাড়াও বাইরের আরো দুজন লোক উপস্থিত ছিলেন বলে তিনি জবানবন্দিতে বলেছেন। কেন তাঁকে (রায়হান) মারধর করা হচ্ছে জানতে চাইলে এসআই আকবর তাঁকে বলেন, ‘সে একজন ছিনতাইকারী।’ সঙ্গে থাকা দুই লোকের নাম জানতে চাইলে আকবর তাঁকে ধমক দিয়ে সেন্ট্রি পোস্টে ডিউটিতে পাঠিয়ে দেন। এর পরও তিনি বেশ কয়েকবার রায়হানের আর্তচিৎকার শুনতে পান। সাইদুর আরো বলেন, "পরদিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ফাঁড়িতে ডিসি (উপকমিশনার) স্যার আসবেন জানিয়ে আমাকে ডেকে পাঠান আকবর স্যার। তিনি আমাকে বলেন, ‘ডিসি স্যার জানতে চাইলে বলবা, রাতে ফাঁড়িতে কোনো লোক এনে নির্যাতন করা হয় নাই। সে (রায়হান) গণপিটুনি খেয়ে ধরা পড়েছে। তাকে সরাসরি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।’ এ কথা বলে আকবর স্যার হুমকি দেন। বলেন, ‘আমি যা বলব তা-ই বলবে। সত্য কথা বললে বুকে গুলি করব, পিঠ দিয়ে বের হবে।’ এই হুমকি দিয়ে আকবর স্যার আমার বুকে হাত বোলান।”

আকবর একই হুমকি দিয়েছিলেন কনস্টেবল শামীম মিয়াকেও। ঘটনার সময় ডিউটি না থাকায় ঘুমিয়ে ছিলেন তিনি। কান্নার শব্দ শুনে আনুমানিক রাত ৩টার দিকে তাঁর ঘুম ভাঙে। তিনি বলেন, “ঘুম ভেঙে দেখি, একজন লোক দুই হাত পেছন দিক করে হাতকড়া লাগানো, মেঝেতে বসে চিৎকার করছে। তখন বন্দরবাজার ফাঁড়ির কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাস মোটা লাঠি দিয়ে লোকটির হাতে, পায়ে ও কোমরে এলোপাতাড়ি মারছিলেন এবং বলছিলেন, ‘গ্রেপ্তারের সময় কেন এত শক্তি দেখালি? কেন এত ধস্তাধস্তি করলি'?” রায়হানের পায়ের তলায়ও টিটু আঘাত করেন বলে জানান শামীম। তিনি আরো বলেন, “এরপর কনস্টেবল হারুনুর রশিদ কক্ষে ঢুকে লোকটিকে মারধর করতে থাকেন। তখন কনস্টেবল টিটু, এএসআই আশেক এলাহি ও এএসআই কুতুব আলী উপস্থিত ছিলেন। কিছুক্ষণ পর আকবর কক্ষে ঢোকেন। তিনি টিটুর হাতে থাকা লাঠি নিয়ে লোকটির নাম ও ঠিকানা জিজ্ঞেস করেই বেধড়ক মারধর করতে থাকেন। আকবরের মারমুখী আচরণ দেখে এএসআই কুতুব আকবরের হাত ধরে বলেন, ‘স্যার, এভাবে আর মাইরেন না।’ আকবর তখন লাঠি হাতে কক্ষের বিছানায় বসে পড়েন। এ সময় এক লোক কক্ষে প্রবেশ করে আকবরকে বলেন, রায়হান তাঁর মুঠোফোন ও টাকা চুরি করেছেন। তখন রায়হান বলতে থাকেন, ‘স্যার, আমি টাকা নেই নাই। শুধু মোবাইল নিয়েছিলাম, ফেরত দিয়েছি। টাকা অন্য দুজন ছিনতাইকারী নিয়েছে।’ তখন অচেনা লোকটি বলেন, ‘না, এই লোকটিই (রায়হান) আমার টাকা ও মোবাইল ফোন নিয়েছে।’ আকবর তখন অচেনা লোকটিকে ফাঁড়ির বাইরে পাঠিয়ে রায়হানকে আবার মারতে থাকেন।” মারধর চলতে থাকলে শামীম আবার গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

ফাঁড়িতে রায়হানকে নির্যাতন শুরুর পর ভোর ৪টার দিকে কনস্টেবল সাইদুরের কাছ থেকে সেন্ট্রি পোস্টের ডিউটি বুঝে নেন দেলোয়ার হোসেন। তখন সাইদুর তাঁকে জানান, একজন ছিনতাইকারীকে ধরে এনে মারধর করা হয়েছে। এ সময় এসআই আকবর ও অন্যদের সঙ্গে ছিনতাইয়ের শিকার হওয়া লোকটিও ছিলেন। ঘটনাটি ফাঁড়ির মুন্সির কার্যালয়ের কক্ষে হয়। দেলোয়ার কক্ষের দরজার কাছে গিয়ে দেখেন, এসআই আকবরের হাতে মোটা লাঠি। তিনি চেয়ারে বসা। তাঁর পায়ের কাছে হাতকড়া পরা এক লোক। সেখানে পুলিশের সঙ্গে অচেনা এক লোক ও তাঁর সঙ্গে আরো একজন লোককে দেখতে পান। দেলোয়ারকে দেখে আকবর বলেন, ‘তুমি সামনে চলে যাও।’ তখন তিনি সেন্ট্রি পোস্টে ডিউটিতে যান। সে সময়ের বর্ণনা দিয়ে দেলোয়ার বলেন, ‘আকবর তৌহিদের মুঠোফোন থেকে গ্রেপ্তার হওয়া লোকটির (রায়হান) বাড়িতে ফোন দিয়ে ১০ হাজার টাকা নিয়ে আসতে বলেন।’ তৌহিদ ফোন দেওয়ার পর দেলোয়ার তাঁর কাছে জানতে চান, টাকা কেন নিয়ে আসতে বলেছেন? তখন তৌহিদ বলেন, ‘আকবর স্যার বলেছেন, ছিনতাইয়ের টাকা উদ্ধার দেখাতে ফোন দেওয়া হয়।’ এরপর আকবর এএসআই আশেক এলাহিকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আমি ঘুমিয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পর তাকে (রায়হান) হাসপাতালে নিয়ে যেয়ো।’ ভোর ৫টার দিকে আশেক এলাহি ও কনস্টেবল হারুন রায়হানকে অটোরিকশায় করে হাসপাতালে রওনা দেওয়ার পর আকবরও তাড়াতাড়ি ফাঁড়ি থেকে বের হয়ে যান। এরপর দেলোয়ারের ডিউটি শেষ হলে কনস্টেবল ইলিয়াছকে ডিউটি বুঝিয়ে দিয়ে ঘুমাতে চলে যান।

প্রসংগত, গত ১০ অক্টোবর মধ্যরাতে রায়হান আহমদকে তুলে নিয়ে বন্দরবাজার ফাঁড়িতে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। পরদিন সকালে তিনি মারা যান।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা