kalerkantho

শনিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৮ নভেম্বর ২০২০। ১২ রবিউস সানি ১৪৪২

পদ বাঁচাতে রাবি ভিসির তদবির

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

২৪ অক্টোবর, ২০২০ ০২:৫৬ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পদ বাঁচাতে রাবি ভিসির তদবির

নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য, কোটেশন বাণিজ্য, অবৈধভাবে নিয়োগ দেওয়াসহ নানা দুর্নীতিতে নিমজ্জিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) প্রশাসন। যার নেতৃত্বে রয়েছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম আবদুস সোবহান। অভিযোগ রয়েছে, এসব কাজে তাঁকে সহায়তা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী মো. জাকারিয়া, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এম এ বারী, উপ-রেজিস্ট্রার এবং ভিসির স্ত্রীর ভাগ্নে সাখাওয়াত হোসেন টুটুল। এই তালিকায় রয়েছেন আরো শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী।

রাবির এসব অনিয়ম-দুর্নীতি ধামাচাপা দিয়ে স্বপদে বহাল থাকতে নানা কৌশল অবলম্বন করছেন ভিসি এম আবদুস সোবহান। অনিয়ম-দুর্নীতি ঢাকতে দুদক এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) বোকা বানানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারেননি। দুটি প্রতিষ্ঠানই রাবির বর্তমান প্রশাসনের অনিয়ম-দুর্নীতির ব্যাপারে আপসহীন। ফলে বেকায়দায় পড়া রাবি ভিসি পদ বাঁচাতে বর্তমানে নানা তদবির করে যাচ্ছেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

দুদক সূত্র মতে, উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুস সোবহানসহ অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে গত বছর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে চিঠি দেয় দুদক। চিঠিতে ২৫ নভেম্বরের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সরবরাহ করতে বলা হয়। কিন্তু শুরুতে তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করে রাবি প্রশাসন। এরপর দুদক থেকে সরকারি কাজে অসহযোগিতার অভিযোগে ভিসি ও রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে মামলা করার কথা বলা হলে শেষ পর্যন্ত কিছু নথিপত্র দেওয়া হয়। তবে চাহিদা মতো তথ্য এখনো দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে দুদকের একাধিক সূত্র।

দুদকের ওই সূত্র জানায়, রাবির বর্তমান ভিসি ২০১৭ সালের মে মাসে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। রাবিতে তাঁর মেয়ে সানজানা সোবহান এবং মেয়েজামাই এ টি এম সাহেদ পারভেজকে চাকরি দেওয়াসহ রাবির বিভিন্ন কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রকল্পের টাকা তছরুপ করার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। এই বিষয়গুলো নিয়ে তদন্তে নামে দুদক।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৭ সালের মে থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত যেসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা চায় দুদক। এর মধ্যে কজন শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণীও চায় দুদক। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৭৩তম এবং ৪৭৫তম সিন্ডিকেট সভার কার্যবিবরণীও চাওয়া হয়েছে। এসব সিন্ডিকেট সভায় যেসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় তাতে গরমিল রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে, রাবি প্রশাসনের দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন গঠিত তদন্ত কমিটিও। ওই কমিটিকেও তথ্য দিয়ে সহযোগিতা না করার অভিযোগ উঠেছে ভিসির বিরুদ্ধে। এ অবস্থায় ভিসির সহযোগিতা ছাড়াই তদন্ত কমিটি তাদের তদন্তকাজ শেষ করে বিভিন্ন সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। ওই প্রতিবেদনে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, রেজিস্ট্রারসহ আরো কয়েকজন শিক্ষকের সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের সুপারিশ করা হয়।

চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি রাবি প্রশাসনের দুর্নীতির তথ্য-উপাত্তসংবলিত ৩০০ পৃষ্ঠার একটি অভিযোগপত্র প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) দাখিল করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষকসমাজের একাংশ। অভিযোগের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে ইউজিসি। তদন্ত শেষে ওই কমিটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনে তাদের ৭৩৬ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দেয়।

সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের সুপারিশ : উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সোবহান, উপ-উপাচার্য চৌধুরী মো. জাকারিয়াসহ বেশ কজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে নিয়োগসহ বিভিন্ন প্রকল্পে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের মতো গুরুতর অভিযোগও ওঠে। বিষয়টি তদন্ত করে কমিটি উপাচার্য, উপ-উপাচার্যসহ অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, অধ্যাপক আব্দুল হান্নান, সহযোগী অধ্যাপক শিবলী ইসলাম এবং উপাচার্যের আত্মীয় সাখাওয়াত হোসেন টুটুলের সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের সুপারিশ করে।

এদিকে রাবির একাধিক সূত্র জানায়, অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া রাবির ভিসি এখন তাঁর পদ বাঁচাতে বিভিন্নভাবে তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। এরই মধ্যে তিনি তদন্ত প্রতিবেদন ধামাচাপা দিতে বিভিন্ন দপ্তরের প্রধানদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আর তিনিসহ তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে যেন কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তার জন্য রাজনৈতিকভাবেও তদবির চালাচ্ছেন। তবে একাধিক সূত্র জানায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাঁকে সরিয়ে দিয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে। আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে তাঁর সহযোগীদের ক্ষেত্রেও।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসির তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. দিল আফরোজা বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তদন্ত কমিটি সুপারিশসহ তদন্ত প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে জমা দিয়েছে। তদন্তে রাবি প্রশাসনের বিভিন্নজনের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা