kalerkantho

মঙ্গলবার । ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৪ নভেম্বর ২০২০। ৮ রবিউস সানি ১৪৪২

এবার ৩৫০ বছরের ঐতিহ্য রণদা প্রসাদ সাহার বাড়ির পূজা হচ্ছে নিয়মরক্ষার

মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি   

২৩ অক্টোবর, ২০২০ ২১:৪৪ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



এবার ৩৫০ বছরের ঐতিহ্য রণদা প্রসাদ সাহার বাড়ির পূজা হচ্ছে নিয়মরক্ষার

দুর্গাপূজায় টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার বাড়ির আঙিনায় হাজারো মানুষের ঢল নামে। জাতি-ধর্ম-ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে দেশি-বিদেশি অতিথির আগমন ঘটে। এ বাড়ির পূজা মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয়। পূজাকে উপলক্ষ করে মানুষ পাঁচ দিন ডুবে থাকে অপার আনন্দে। কিন্তু এবার করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সর্বত্র উদযাপন হচ্ছে নিয়মরক্ষার পূজা। প্রতিবছরের ন্যায় পূজা মন্ডপগুলোতে প্যান্ডেল তৈরি, আলোকসজ্জা, আতশবাজি, ঢাকের বাজনা, মাইক ও সাউন্ডবক্স বাজানোতে মানা হয়েছে সরকারি নির্দেশনা।

নিয়মরক্ষার পূজা হলেও এবারও দেশি-বিদেশি অতিথিদের জন্য প্রস্তুত মির্জাপুর উপজেলার সবচেয়ে বড় এবং ঐতিহ্যের ধারক দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার বাড়ির পূজামন্ডপটি। এবারও দেশি-বিদেশি অতিথিরা পূজা দেখতে এখানে আসবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছেন। 

গত বুধবার রাত আটটায় দেবীর বোধনের মধ্য দিয়ে পূজা-অর্চনা শুরু করেন ভক্তরা। লৌহজং নদীর দীরঘেঁষা রণদা প্রসাদ সাহার পৈতৃক নিবাস মির্জাপুর গ্রামের সাহাপাড়ায় গিয়ে দেখা যায় পূজার জন্য প্রস্তুত মন্ডপের প্রতিমা। পাশেই নদীতে থাকা দুইটি বজরা রং দিয়ে সাজানো হয়েছে। অতিথিরা কুমুদিনী কমপ্লেক্সের পৌঁছানোর পর এই নৌকায় পার হয়ে যাবেন রণদা প্রসাদ সাহার পুজামন্ডপে।

দুর্গাপূজায় ভারতেশ্বরী হোমসের শিক্ষার্থীদের নিয়ে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের উপস্থিতিতে দুর্গা প্রতিমার সামনে যে আরতি হতো, তা এবার হচ্ছে না। করোনার কারণে ভারতেশ্বরী হোমস বন্ধ রয়েছে। তাছাড়া জনসমাগম এড়াতে কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মন্ডপটিতে আসা দর্শনার্থী নারী পুরুষের চলাচলে থাকছে পৃথক রাস্তা। আরতি ছাড়া পূজার অন্য সব আয়োজন থাকছে।

এলাকাবাসী জানান, তোরণ নেই, নেই আলোজসজ্জা। প্রতিমা ও মন্ডপটিও সাদামাটা। তবু সাদামাটা এই মন্ডপটি দুর্গোৎসবের সময় এখনও মির্জাপুর তথা টাঙ্গাইলের মূল আকর্ষণ। রণদা প্রসাদ সাহার এই মন্ডপে ঠিক কবে থেকে পূজা শুরু হয়েছে, তার সঠিক তথ্য নেই। তবে এখানে পূজা-অর্চনা করাতে প্রায় ৩৫০ বছরের ঐতিহ্য রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

গ্রামের লোকজন জানান, আগে এখানে সবাই ক্ষুদ্র পরিসরে পূজা করতেন। এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে ১৯৪২ সাল থেকে রণদা প্রসাদ সাহা এখানে ধুমধাম পূজা শুরু করেন। দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা না থাকলেও এখনও মন্ডপটিতে ধুমধামেই চলছে পূজা। 
তবে ১৯৪৪ সালের ১ জানুয়ারি রণদার ছেলে ভবানী প্রসাদ সাহা জন্মের পর পূজার উৎসব আরো বেড়ে যায়। শুধু পূজা নয়, পূজাকে কেন্দ্র করে যাত্রাপালা, নাটক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন হতো। দরিদ্র মানুষের মাঝে বিতরণ করতেন বস্ত্র। প্রতিবছর পূজার সময় রাতে পাঁচ থেকে সাত দিনব্যাপী যাত্রাপালা হতো। এতে স্থানীয় ব্যক্তিরা ছাড়াও কলকাতার নাট্য কোম্পানির শিল্পীরা অভিনয় করতেন। দূরদূরান্ত থেকে নৌকা নিয়ে মানুষ আসতেন পূজা দেখতে। তাঁরা লৌহজং নদীতে নৌকায় থেকে চার-পাঁচ দিন উৎসবে অংশ নিতেন। যাত্রাপালা চলার সময় রণদার বাড়ির পশ্চিম পাশে মাঠে লঙ্গরখানা খুলে প্রতিমা দর্শন ও যাত্রাপালা শুনতে আসা হাজারো মানুষকে পাঁচদিন খাওয়ানো হতো। পূজামন্ডপ ঘিরে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবার মিলনমেলা হতো।

রণদা প্রসাদ সাহার পূর্বপুরুষেরাও বাড়িতে দুর্গাপূজা করতেন। কিন্তু তাঁর বাবা দেবেন্দ্রনাথ পোদ্দারের সময় এসে আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। ফলে বন্ধ হয়ে যায় দুর্গাপূজা। শৈশবে মাতৃহারা রণদা প্রসাদ সাহার মাতৃভক্তি ছিল সাধারণের চেয়ে একটু বেশি। মা না থাকায় অনাদরে বড় হওয়ায় রণদা মাত্র ১৬ বছর বয়সে চলে যান কলকাতায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯১৫ সালে চাকরি পান ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর বেঙ্গল অ্যাম্বুলেন্স কোরে। কর্মস্থল ছিল ইরাকে। পরে যোগ দেন বেঙ্গলি রেজিমেন্টে। যুদ্ধ শেষে কয়লার ব্যবসা শুরু করেন। দেবী লক্ষ্মী তাঁর ভান্ডার পূর্ণ করে দেন। ব্যবসা-বাণিজ্য করে যতই বড় হোক, তাঁর মন পড়ে ছিল মায়ের স্মৃতিবিজড়িত মির্জাপুর গ্রামে। 

চল্লিশের দশকের শুরুতে রণদা প্রসাদ সাহা নিজের মায়ের নামে কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেন। ট্রাস্টেই তিনি ন্যস্ত করেন তাঁর সব ব্যবসা, সম্পদ। মির্জাপুরে নিজ গ্রামে লৌহজং নদীর তীরে মায়ের নামে কুমুদিনী হাসপাতাল এবং নারী শিক্ষার জন্য প্রপিতামহীর নামে ভারতেশ্বরী হোমস প্রতিষ্ঠা করেন। ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজে কলকাতা, নারায়ণগঞ্জ যেখানে যে অবস্থায়ই ব্যস্ত থাকতেন রণদা প্রসাদ সাহা, পূজার সময় ঠিক চলে আসতেন মির্জাপুরের বাড়িতে। নিজের তত্ত্বাবধানে পূজার সব আয়োজন করতেন। চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি এ পূজার নাম ছড়িয়ে পড়ে চারপাশের এলাকায়। 

পঞ্চাশের দশকের ভারতেশ্বরী হোমসের ছাত্রী শান্তি সাহা বলেন, পূজার পাঁচ দিন নানা অনুষ্ঠানে জমজমাট থাকত রণদা প্রসাদ সাহার পূজামন্ডপ। এ বাড়ির পূজার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর সব আয়োজন করে থাকেন নারীরা।

১৯৭১ সালের ৭ মে রণদা প্রসাদ সাহা ও তাঁর ছেলে ভবানী প্রসাদ সাহাকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ধরে নিয়ে যায়। তারপর তাঁরা আর ফিরে আসেননি। অনেকেই সে সময় ভেবেছিলেন বাবা-ছেলের অন্তর্ধানের মধ্যদিয়ে জাঁকজমক পূজার আয়োজনও হারিয়ে যাবে। কিন্তু তা হয়নি। ’৭২ সালে তাঁর বড় মেয়ে জয়া পতি কুমুদিনী কল্যাণ ট্রাস্টের দায়িত্ব নেন। তিনি তাঁর বাবার মতোই আয়োজন অব্যাহত রাখেন। আর রণদা প্রসাদ সাহার নাতি রাজিব প্রসাদ সাহা এখন কুমুদিনী কল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান। তিনি বর্তমানে পূজার আয়োজনে এনেছেন আরও বর্ণাঢ্যতা। তাই আজও এখানে পূজা দেখতে আসেন রাজনীতিক, সরকারি পর্যায়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কূটনীতিক, দেশবরেণ্য ব্যক্তি, শিল্পী, সাহিত্যিকসহ সব শ্রেণির মানুষ।

পূজার সময় ১২ জোড়া ঢাকি ঢাক বাজাতেন, আন্ধরা গ্রামের রশিক ভবনের পেছনে প্রায় ৬০ ফুট উঁচুতে তৈরি করা নহবতখানা থেকে সানাই বাজানো হতো। স্বাধীনতার পর নহবতখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। ছয় বছর আগে নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে নহবতখানা। সেখানে পূজার সময় সানাই বাজে। দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার দুর্গাপূজা উপলক্ষে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মির্জাপুর গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই নায়ড়ী-ঝিয়াড়ীসহ আত্মীয়-স্বজনে পরিপূর্ণ হয়ে উঠে।

মির্জাপুর গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি অতুল পোদ্দার সে সময়কার স্মৃতিচারণা করে বলেন, পূজার পাঁচ দিন শত শত মানুষের খাবারের আয়োজন হতো। দূরদূরান্তের মানুষ এখানে থেকে পূজার উৎসব দেখত। রণদা প্রসাদ সাহা নিজেও অভিনয় করতেন যাত্রাপালায়। পূজার আগে এলাকার সব মানুষের মাঝে বস্ত্র বিতরণ করতেন। ভারতেশ্বরী হোমস চালু হওয়ার পর এ পূজার আয়োজনের সবকিছুই করে থাকেন এখানকার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা। 

মির্জাপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র মুক্তিযোদ্ধা শহীদুর রহমান জানান, সেই ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে রণদা প্রসাদ সাহার বাড়িতে পূজা দেখতে গেছি। আজ তিনি নেই, কিন্তু সেই আয়োজন আছে। আমি এখনো আমার সন্তান ও আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে সেখানে পূজা দেখতে যাই। এ বাড়ির পূজার আয়োজনটাও অন্য আর দশটি পূজামন্ডপের মতো নয়। এখানে পঞ্চমীর দিনে সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে পূজা শুরু হয়। প্রতিবছর পূজায় নাচ, গান, আরতিসহ নানা আয়োজন থাকে। বিজয়া দশমীতে নৌকায় করে লৌহজং নদী ঘুরে দেবী দুর্গাকে বিসর্জন করা হয়। 

মির্জাপুর উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সরকার হিতেশ চন্দ্র পুলক জানান, দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা মহাষ্টমীর দিনে হাজার হাজার মানুষের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ করতেন। ষাট দশকের মাঝামাঝি সময়ে এই বস্ত্র বিতরণের সময় দুর্ঘটনা ঘটায় তিনি পরবর্তীতে এলাকার জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে বস্ত্র বিতরণ করেন। 

কুমুদিনী ওয়েল ফেয়ার ট্রাস্ট্রের পরিচালক (শিক্ষা) একুশে পদক প্রাপ্ত প্রতিভা মুৎসুদ্দি বলেন, ৩শ বছরের ঐতিহ্য বহন করছে পূজামন্ডপটি। সাদামাটা পূজামন্ডপটি এখনো সারা দেশের আকর্ষণ। অন্যবারের মতো এবারও প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শনার্থী ছাড়াও দেশি-বিদেশি অতিথিরা মন্ডটিতে আসবেন পূজা দেখতে। এ বছর করোনার কারণে আরতি হবে না। অন্য সব আয়োজন ঠিক থাকবে। ২৬ অক্টোবর প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে আনুষ্ঠানিকতা।

রণদা প্রসাদ সাহার পুত্রবধূ শ্রীমতী সাহা রণদা প্রসাদ সাহা স্মারকগ্রন্থে স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘পূজার সময় দেখেছি সব শ্রেণির হাজার হাজার মানুষের সম্মিলন। পাঁচ দিন ধরে চলত খাওয়াদাওয়া, সেই সঙ্গে যাত্রাপালা বিনোদন। অপার আনন্দ, পূজা উপলক্ষমাত্র। বাবা (রণদা প্রসাদ) বলতেন, মানুষ ও মানুষে এই যে মহামিলন এই তো পূজার আনন্দ।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা