kalerkantho

মঙ্গলবার । ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৪ নভেম্বর ২০২০। ৮ রবিউস সানি ১৪৪২

অধিগ্রহণে জমি ‘ঘুষ’ দিলেন যুবলীগ নেতা!

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া   

২৩ অক্টোবর, ২০২০ ২১:০৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অধিগ্রহণে জমি ‘ঘুষ’ দিলেন যুবলীগ নেতা!

তিনি এসেছিলেন কর্মকর্তা হিসেবে ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত কাজে। যুবলীগ নেতার ভূমি অধিগ্রহণের আওতায় পড়ছেনা জানিয়ে তিনি চুক্তিতে গেলেন। চুক্তি অনুযায়ী চার শতাংশ জায়গা লিখে দিলে ওই ভূমি অধিগ্রহণের আওতায় আনা হয়। তবে ওই যুবলীগ নেতা এখন বেঁকে বসেছেন। ওই কর্মকর্তাকে ভূমি অধিগ্রহণের টাকা দিতে রাজি নন। উল্টো তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দেয়ার পাশাপাশি মামলা ঠুকেছেন। অভিযোগে যেন তিনি টাকা না তুলতে পারেন সেই অনুরোধ জানানো হয়েছে।

মামলায় বলা হয়েছে, ওই কর্মকর্তা জমি লিখে নেওয়ার পাশাপাশি ধার হিসেবে আরো ১৫ লাখ টাকা নিয়ে এখন দিতে গড়িমসি করে অপরাধ করেছেন। 

অভিযুক্ত ওই কর্মকর্তা হলেন, লালমনিরহাটে রেলওয়েতে কর্মরত এ বি এম গোলাম মোস্তফা। বিভাগীয় অ্যাস্টেট অফিস ঢাকায় সার্কেল অফিসার (রাজস্ব) হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় ২০১৫ সালে ওই জমি দলিল করে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। টাকাও একই সময়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। 

অভিযোগকারী হলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহবায়ক মো. আব্দুল মমিন বাবুল। এ সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি গত ১৪ অক্টোবর আদালতে মামলা ও ১২ অক্টোবর জেলা প্রশাসকের বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এর আগে তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনেও অভিযোগ দেন।

অবশ্য যুবলীগের ওই নেতা মামলা ও অভিযোগে পৃথক বক্তব্য লিখেছেন। জেলা প্রশাসকের কাছে দেয়া অভিযোগে নিজেই দলিল করে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। অন্যদিকে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দেওয়া মামলায় দলিলটি জাল বলে উল্লেখ করেন। মামলায় ১৫ লাখ টাকা ধার নিয়ে ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ করা হয়।

কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে, মূলত রেলওয়ের ওই কর্মকর্তাকে ঘুষ হিসেবেই জমিটি লিখে দেন যুবলীগ নেতা। এখন ওই কর্মকর্তার নামে টাকা চলে আসায় বাধ সেধেছেন যুবলীগ নেতা। ১৫ লাখ টাকা ধার নেয়ার বিষয়টিও ওই জমির টাকা আটকানোর একটি ‘কৌশল’। 

অভিযোগ থেকে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আখাউড়া-লাকসাম ডাবল লাইন নির্মাণের জন্য আখাউড়ায় ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়। আখাউড়া পৌর এলাকার দেবগ্রাম চন্দনসারের ১৪ শতাংশ জমির আইনি মালিক (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) হন যুবলীগ নেতা আব্দুল মমিন বাবুল। ওই জায়গাটি রেলওয়ের অধিগ্রহণের আওতায় পড়বে না বলে জানান ওই সময়ে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে আসা এ বি এম গোলাম মোস্তফা। ২০১৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি গোলাম মোস্তফা প্রস্তাব দেন যে তাকে ১৫ লাখ টাকা দিলে অধিগ্রহণের আওতায় আনা হবে। অন্যথায় রেলওয়ের জমি হিসেবে সরকারের দখলে নিয়ে নেওয়া হবে। এ অবস্থায় আব্দুল মমিন টাকার বদলে চারশতক জমি লিখে দিতে রাজি হন। আরেক অভিযোগে ১৫ লাখ টাকা ধার নেওয়ার কথা বলা হয়।

এ প্রসঙ্গে আব্দুল মমিন বাবুল বলেন, ১৪ শতক জায়গা রেলওয়ের উন্নয়ন কাজে নেওয়া হবে না বলে আমাকে জানিয়ে দেন ওই সময়ে অধিগ্রহণের তদারকিতে আসা কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা। কিন্তু অধিগ্রহণ করানো গেলে লাভবান হওয়া যাবে সেই চিন্তা থেকে আমি ওনার সঙ্গে যোগাযোগ করি। তখন তিনি আমাকে চার শতক জায়গা লিখে দেওয়ার কথা বললে রাজি হয়ে যাই। আরেকজনের কাছ থেকে একইভাবে ওনার বাবার নামে জমি লিখে নেওয়া হয়।’

তবে টাকা হাওলাত দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। এখন কেন জায়গার টাকা ওনাকে তিনি দিচ্ছেন না এমন প্রশ্নের জবাবে যুবলীগ নেতার সহজ স্বীকারোক্তি, ‘আমি তো কাজটা হাসিলের জন্য ওনাকে জায়গা লিখে দেই। ওনি তো কোনোভাবেই এ জায়গা প্রাপ্য না। মূলত ঘুষ হিসেবেই তিনি এ জায়গা আমার কাছ থেকে নিয়েছেন। এটা আমি সহজে ছেড়ে দিতে পারি না।

রেলওয়ে কর্মকর্তার সঙ্গে ভালো যোগাযোগ থাকা আবুল খায়ের নামে এক ব্যক্তি এ বিষয়ে মীমাংসারও উদ্যোগ নিয়েছিলেন।’ তিনি জানান, কৌশলগত কারণে মামলায় দলিলের বিষয়টি জাল বলে উল্লেখ করা হয়।  

রেলওয়ের বিভিন্ন জায়গা লিজ পাওয়া মো. আবুল খায়ের বলেন, ‘জায়গার প্রকৃত মালিক থেকে নেওয়া আইনি ক্ষমতাবলে আব্দুল মমিন জায়গা বিক্রি করেছেন। রেলওয়ের ওই কর্মকর্তার তার বাবার পেনশনের টাকা দিয়ে জায়গাটি কিনেছেন। এখন যদি আব্দুল মমিন সেটা অস্বীকার করেন তাহলে কিছুর করার নেই।’

এ বিষয়ে রেলওয়ের কর্মকর্তা এ বি এম গোলাম মোস্তফা গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে মোবাইল ফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি নগদ টাকা দিয়ে আব্দুল মমিনের কাছ থেকে জায়গা কিনেছি। এখন আমার নামে টাকা বরাদ্দ হওয়ার পর তুলতে বাধা দেয়া হচ্ছে। টাকা পেতে আমি আদালতে লিখিত আবেদন দিয়েছি।’ 

অধিগ্রহণের কাজে এসে এ সংক্রান্ত এলাকার জায়গা ক্রয় করা নৈতিকতার মধ্যে পড়ে কি-না এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি যদি অন্যভাবে জায়গা নিয়ে থাকতাম তাহলে তো কতজনের কাছ থেকেই নিতে পারতাম। এখন যদি ওনি এ বিষয়ে মামলা করে থাকেন তাহলে প্রমাণ করুক আমি কিভাবে জায়গা নিয়েছি। আদালতই এটার বিচার করবে।’ তবে আরেকটি জায়গা বাবার নামেও লিখিয়ে নিয়েছেন বলে যে অভিযোগ আছে সে বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দেননি।  

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা