kalerkantho

শনিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৮ নভেম্বর ২০২০। ১২ রবিউস সানি ১৪৪২

কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কে ৭৩ বছর ধরে চলছে সংস্কার কাজ!

শেষই হয়নি ২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার কাজ, ফের ভেঙে গেছে সড়ক

এবিএম আতিকুর রহমান বাশার, দেবীদ্বার (কুমিল্লা)   

২৩ অক্টোবর, ২০২০ ০৩:৩১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



শেষই হয়নি ২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার কাজ, ফের ভেঙে গেছে সড়ক

দুর্ভোগের অপর নাম মরণফাঁদ খ্যাত ‘কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক’। ১৯৪৭ সালে সড়কটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে ৭৩ বছর ধরেই চলছে খোঁড়াখুঁড়ি-সংস্কারের কাজ। বছরের পর বছর এ সড়কটির দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন সওজ’র একদল কর্মকর্তা-কর্মচারী। কিন্তু এক দিনের জন্যও নিরাপদে-স্বস্তিতে গন্তব্যে পৌঁছতে পারেনি যাত্রী ও মালামাল পরিবহনগুলো। গত অর্থবছরে ২৩ কোটি টাকা প্রাক্কলনব্যয়ে সড়ক সংস্কার চলতি বছরের ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দিলেও এখনো চলছে সংস্কার কাজ। তবে সওজ’র কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুরাতন সড়কের জন্য আর কোনো বরাদ্ধ থাকছে না। আগামী একনেকের বৈঠকে সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ফোর-লেইনে সড়কটি উন্নীতকরণে ৬ মাসের মধ্যে কার্যাদেশ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। 

জানা যায়, গতবছরের জুন মাসে ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে ‘কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক’র কুমিল্লা ময়নামতি ক্যান্টনম্যানট থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া’র সরাইল উপজেলার কালামুড়া ব্রিজ পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়। উক্ত দরপত্রে ‘হাসান টেকনো বিল্ডার্স’ ও ‘মেসার্স সোহাগ এন্টারপ্রাইজ’ ২৩ কোটি টাকার প্রাক্কলনব্যায় হিসেবে কাজটি পায়। দরপত্রে ২০১৯ সালের ৯ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাস সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয় কাজটি সম্পন্ন করার। গত মাসের ৮ সেপ্টেম্বর কার্যাদেশের সময়সীমা শেষ হলেও এখনো সড়কের বুড়িচং উপজেলার কংশনগর বাজার ও দেবীদ্বার উপজেলার জাফরগঞ্জ বাজার এলাকায় ঢালাইকৃত অংশের একপাশ চালু হয়নি। তবে দেবীদ্বার থানাগেইট থেকে মহিলা কলেজ পর্যন্ত ঢালাই করা অংশের ৬টি প্যানাল ভেঙে গেছে ও ছোট বড় গর্তের সৃষ্টি হয়ে রডগুলো ভেসে ইঠেছে। চলমান ভারি যানবাহন যাতায়তকালে গর্তে পড়ার ঝাঁকুনিতে পাশের বহুতল ভবনগুলোও কেঁপে উঠছে। প্রায়ই রাতের অন্ধকারে রডের গুতোয় ভারি যানবাহনের টায়ার ফুটা এবং এক্সেল ভাঙার শব্দে ঘুমন্ত মানুষ জেগে উঠছেন। কিছু কিছু যানবাহন ভাঙা সড়কের গর্তের মুখমুখী এসে থমকে যাচ্ছে। এতে যানজটও চরম আকার ধারণ করছে। 

সড়ক ও জনপদ বিভাগ কুমিল্লা’র নির্বাহী প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ আহাদ উল্লাহ বলেন, অনেক আগেই সড়ক সংস্কার কাজ শেষ হয়ে গেছে। এখনো জাফরগঞ্জ বাজার এলাকার ঢালাইকরা অংশের একাংশ চালু না হওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই। এখন যে কাজ করা হচ্ছে তা ডিপার্টম্যান্টাল মেইন্টেনেন্টস করা হচ্ছে। দেবীদ্বার থানা গেইট এলাকায় সদ্যনির্মীত ঢালাই ভেঙে যাওয়ার বিষয়টি প্রথমে অজানা থাকলেও পরবর্তীতে জানার পর ওই অংশের ৬টি প্যানাল পুনরায় সংস্কারের আশ্বাসও দেন তিনি।
 
বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ক্ষোভ দেখা দিলে ‘সড়ক ও জনপদ বিভাগ’ গত বুধবার দুপর থেকে সদ্য নির্মিত সড়কের উপর ঢালাইকৃত ভাঙা অংশের ৬টি প্যানাল উঠিয়ে নতুন করে কাজ শুরু করেছে। ওই অংশের সংস্কারের কারণে আবারো যানজটের কবলে ‘কুমিল্লা- সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক’। ভোগান্তিতে পড়ছে সাধারণ জনগণ, যাত্রী ও মালামাল পরিবহন। 

স্থানীয়রা জানান, ১৯৪৭ সালে কুমিল্লা- সিলেট আঞ্চলিক সড়কটি চালু হয়েছে। দেশ স্বাধীনের পর সড়কটি আঞ্চলিক মহাসড়ক নামে পরিচিতি পায়। সড়কটি চালু হওয়ার পর বিগত ৭৩ বছর ধরে সড়কের খানাখন্দ, দেবে যাওয়া অংশ, ভেঙে যাওয়া ব্রিজ, কালভার্ট সংস্কার কাজ চলে আসছে। কখনো ৪ কোটি, কখনো ১০ কোটি, আবার কখনো ২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার ও মেরামতের কাজ চললেও একদিনের জন্যও যাত্রী ও মালামাল বহনের পরিবহগুলো স্বস্তিতে গন্তব্যে পৌঁছতে পারেনি। বছরের অধিকাংশ সময়ই সড়ক ও জনপদ বিভাগ’র কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারগণ সড়ক সংস্কারে ব্যস্ততম সময় কাটিয়ে আসছেন। এখনো তা অব্যাহত আছে। কবে তা থেকে মুক্তি পাবে তা কেউ জানেন না।
 
স্থানীয়রা যানজট ও দুর্ঘটনা এড়াতে এবং সড়কটি দ্রুত ফোর-লেইনে উন্নীতকরণে, সড়কের দু’পাশের বৈদ্যুতিক খুঁটি, অবৈধ স্থাপনা, দৈনিক বাজার, সিএনজি ও অটোরিকশা স্ট্যান্ড উচ্ছেদ, সড়কের দু’পাশের জমি অধিগ্রহণ, পয়নিষ্কাশনে সড়কের পাশে আরসিসি ড্রেন নির্মাণ ও ড্রেনের উপর স্লাভ দিয়ে ফুটপাত তৈরি, গুরুত্বপূর্ণ স্পটগুলোতে ফুট ওভার ব্রিজ নির্মাণেরও দাবি জানান। তবে বিগত দুই যুগ ধরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও একনেকের সভায় উক্ত সড়কটি টু-লেইন, ফোর-লেইন, সিক্স-লেইনে উন্নীত করার আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবায়নে আলোর মুখ দেখেনি। গত কয়েক বছরে একাধিক সার্ভেয়ার টিম, এলও অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী সড়ক ও জনপদ বিভাগ জরিপ, লেভেলিং মেসিন, দূরবিন দিয়ে সার্ভে করা, জমি অধিগ্রহণের সাইড নির্ধারণ ও পরিকল্পনা, মাপজোক সমপন্ন করতে দেখা গেলেও সবই এখন ফাইলবন্দি। বর্তমানে আপদকালিন সময়ে কুমিল্লার ময়নামতি থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলার কালামুড়া ব্রিজ পর্যন্ত ৪০কিলোমিটার এলাকায় ২৪ ফুট প্রশস্থে সড়ক সংস্কারের কাজ চলছে। 

স্থানীয়রা আরো জানান, এ সড়কটি দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বিশেষ করে দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের মানুদের একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম। চট্টগ্রাম বন্দরসহ বাখরাবাদ, গোপালনগর, শ্রীকাইল, বাঙ্গরা, তিতাস, হবিগঞ্জ প্রভৃতি গ্যাস ফিল্ডের সঙ্গে এবং ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তহাট, আখাউড়া স্থল বন্দরের সাথে যোগাযোগে সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ক্রমবর্ধমান ভারি যানবাহনের চাপে সড়কটির বিভিন্ন অংশে খানাখন্দের সৃষ্টি, দেবে যাওয়ার যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী ও বিপদসঙ্কুল হয়ে ওঠেছে। তবে সড়ক ও জনপদ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সড়কটি আগামী ৪ থেকে ৬ মাসের মধ্যে ফোর-লেইনে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। খুব শিগগিরই সড়কটি বর্ধিতকরণের কাজ শুরু হবে। আগামী একনেকের বৈঠকে বাজেট-পরিকল্পনা চূড়ান্ত অনুমোদন পেতে যাচ্ছে, এরই মধ্যে পুরনো সড়কটি সংস্কারে আর কোনো কাজ করা হবে না। 

সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ একাধিক প্রকৌশলীর সাথে যোগাযোগ করলে তারা জানান, ১৯৪৭ সালে সড়কটি চালু হওয়ার পর, দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের সাথে সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি জনগুরুত্বপূর্ণ সড়কে পরিচিতিই নয়, ন্যাশনাল হাইওয়ে’র দ্বিতীয় ক্যাটাগরিতে উন্নীত হয়েছে। ঢালাইকৃত সড়কের অংশটি কমপক্ষে ২১ দিন ব্যবহার থেকে বিরত থাকলে সড়কটি দীর্ঘদিনের স্থায়িত্ব পেত। এ সড়কের কাছাকাছি বিকল্প সড়ক না থাকায়, সংস্কারে পরপরই যানবাহন চলাচল শুরু করে। তাই সড়কের স্ট্রেনথ গেইন করতে না পারায়, ভেঙে যাওয়া ৬টি প্যানাল পুনসংস্কার করতে হচ্ছে, তাছাড়া সড়কের আস্তরের নিচে কিছু নেই, লেয়ার করা হয়নি, তার উপর ভারি যানবাহন চলাচলে সংস্কারের কিছুদিনের মধ্যেই সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙে পূর্বের অবস্থানে চলে আসছে। বিগত বছরগুলোতে কয়েক দফা একনেকের বৈঠকে এ সড়কটি প্রথম সারির মহাসড়কে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিলেও রাজনৈতিক টানপোড়েনে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। 

নাম না প্রকাশের শর্তে একজন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী জানান, গত একনেকের বৈঠকে ৭ হাজার পাঁচশত কোটি টাকা ব্যয়ে ফোর লেইন সড়ক নির্মাণের প্রস্তাবনা উত্থাপিত হয়। ওই প্রস্তাব ঋণচুক্তির শর্তারোপে রাজনৈতিক সমোঝোতার টানপোড়েনে আটকে গেছে। সড়ক উন্নয়নে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ঋণ চুক্তির ৭৫% বাংলাশের এবং বিভিন্ন ইনুস্টেলম্যান্ট আমদানিসহ নানামুখী শর্ত ছিল। আগামী একনেকের সভায় ঋণচুক্তির শর্ত শিথিল হলে ৬ মাসের মধ্যেই ফোর-লেইনে সড়ক উন্নয়নের কার্যক্রম শুরু হবে। 

এ ব্যাপারে চলমান সংস্কার কাজে নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী সাথে ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা