kalerkantho

শুক্রবার। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৪ ডিসেম্বর ২০২০। ১৮ রবিউস সানি ১৪৪২

লোকলজ্জা, হুমকি ও অর্থাভাব

স্বামী-সন্তান নিয়ে আত্মাহুতিতে শান্তি খুঁজছেন শান্তনা

কৌশিক দে, খুলনা   

২১ অক্টোবর, ২০২০ ১৩:৩৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



স্বামী-সন্তান নিয়ে আত্মাহুতিতে শান্তি খুঁজছেন শান্তনা

অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ২০১৫ সালের দিকে অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িছাড়া হয়েছিলেন শান্তনা রাণী সরকার {ছদ্মনাম} (২৫)। বঞ্চিত হন শ্বশুরের সম্পত্তি থেকে। ধার-দেনায় চলছিল ছোট ওষুধের দোকানটি। তার পরও নগরীর খানজাহান আলী সড়কসংলগ্ন একটি বাসায় কোনোমতে জীবন কেটে যাচ্ছিল শান্তনার পরিবারের। কিন্তু মাত্র পাঁচ বছরের শিশুপুত্রের সামনে দিনদুপুরে পৈচাশিকতা সব কিছু শেষ করে দিয়েছে। দিন দিন বেঁচে থাকার সব অবলম্বন হারিয়ে ফেলছেন তিনি। লজ্জা, অর্থসংকট, কলঙ্কের বোঝায় স্বামী-সন্তান নিয়ে আত্মাহুতিতেই শান্তির পথ খুঁজছেন শান্তনা। 

চলতি বছরের ২ মে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ধর্ষণের শিকার হন তিনি। শুধু তা-ই নয়, ধর্ষকের এক সহযোগী এ ঘটনার ছবি-ভিডিও তুলে প্রতারণা শুরু করে। দরিদ্র ও অসহায় এ নারীর কাছ থেকে আদায় করে এক হাজার টাকা। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী গৃহবধূ খুলনা সদর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা (নম্বর ১, তারিখ ০২-০৫-২০২০) দায়ের করেন। ধারা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ৯(১)/৩০, তৎসহ ৩৮৪। চিকিৎসা নেন খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। 

অবশ্য মামলার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ নগরীর টুটপাড়া মেইন রোডের ১৪/১ মো. আইয়ুব আলী মিয়ার ছেলে মো. নাহিদুজ্জামান (৪৪), ৩ নম্বর টুটপাড়া দিলখোলা রোডের মৃত শেখ মুজিবুর রহমানের ছেলে আলী ইমরাজ জুয়েল (৪৪) ও ৪৩/১ টুটপাড়া দিলখোলা রোডের সৈয়দ আলী শিকদারের ছেলে সুমন শিকদার (৩৮)-কে আটক করে। মূল ধর্ষক নাহিদুজ্জামান ও ভিডিও ধারণকারী ইমরাজ জুয়েল বর্তমানে কারাগারে আছেন।

ভুক্তভোগী নারী বলেন, দিনদুপুরে ওরা আমার সব কিছু কেড়ে নিয়েছে। ভাই বলে, হাত-পা ধরলেও ওরা আমাকে রেহাই দেয়নি। আমার শিশুপুত্রকে জিম্মি করায় চিৎকার করারও সুযোগ পাইনি। একা নির্জন ঘরে ওরা আমাকে শেষ করে দিত। পাশের ঘরে থাকা আমার ১৪ বছরের ছোট ভাইও কিছু বুঝতে পারেনি। আমি আমার ইজ্জত ছাড়া সব কিছু দিতে রাজি ছিলাম, কিন্তু ওরা আমাকে শেষ করে দিয়েছে। 

কান্নাজড়িত কণ্ঠে শান্তনা রাণী পাঁচ মাস আগের সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, তখন সকাল ১১টা হবে। ঘরে রান্না করছিলাম, পাশের রুমে ছোট ভাই (১৪) পড়ছিল। পাঁচ বছরের ছেলেটি খেলা করছিল। এমন সময় অপরিচিত দুই ব্যক্তি আমার বাসার রুমের দরজার বাইরে থেকে নক করে। খোলা দরজায় পর্দা টাঙানো ছিল। তারা বাসা দেখতে এসেছে বলে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে। সুমন নামের এক ব্যক্তি তাদের পাঠিয়েছে বলে তারা জানায়। পরে এক গ্লাস পানি খেতে চায়। আমার ছোট ভাইকে ডেকে ওদের পানি দিতে বলি। ও পানি এনে দিতে দিতে ওদের মধ্যে দাড়িওয়ালা ব্যক্তিটি (আলী ইমরাজ জুয়েল) আমার ছেলে ও মোবাইল ফোনটি কাছে টেনে নেয়। পরে আমার সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত কথা আছে বলে ছোট ভাইকে অন্য রুমে যেতে হবে। এবার ওদের চেহারা পাল্টে চায়। ওরা কুপ্রস্তাব দিতে শুরু করে। আমি ওদের ভাই বলে আকুতি-মিনতি শুরু করি। এমনকি আমার ছোট ভাইকে ঢেকে ওদের জন্য কোল্ড ড্রিংকস আনতে দিই। ওরা আমার সন্তানকে জিম্মি করে ফেলে, রাতে স্বামীকে হত্যার হুমকি দেয়। ছোট বাচ্চাটার জন্য চিৎকারও দিতে পারছি না। এর মধ্যে মো. নাহিদুজ্জামান (৪৪) আমার সব কিছু শেষ করে দেয়। আর আলী ইমরাজ জুয়েল ছবি ও ভিডিও তুলতে থাকে। ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে আমার কাছে এক হাজার টাকা জোর করে নিয়ে যায়। ঘটনা জানালে আরো খারাপ অবস্থা হবে বলে হুমকি-ধমকি দিতে শুরু করে। ওরা আমার কোনো আকুতি-মিনতি শোনেনি। আমার সব কিছু শেষ করে দিয়েছে। আমি কোনোভাবেই ওই বীভৎস দিনের কথা ভুলতে পারছি না। 

নির্যাতিতা ওই নারী আরো বলেন, লোকলজ্জার ভয়ে ভাড়া করা বাড়িটিও ছাড়তে বাধ্য হয়েছি। কিন্তু তাতেও রেহাই মিলছে না। ধার-দেনায় চালানো ছোট ওষুধের দোকানটিও ঘড়ভাড়া বকেয়া থাকা ও পুঁজির অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। বাড়িওয়ালা বারবার দোকানঘর ও বাসাবাড়ি ছাড়ার নির্দেশ দিচ্ছেন। ধর্ষক নাহিদুজ্জামানের স্ত্রী, বোনসহ তার পরিবারের সদস্যরা নতুন বাসায় এসে দেখে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, ধর্ষণ মামলার আসামি সুমন জামিনে ছাড়া পেয়ে মামলাটি তুলে নিতে আমাকে ও আমার স্বামীকে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। দ্রুত মামলা তুলে না নিলে ধর্ষণের সময় করা ভিডিও অনলাইনে ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। ধর্ষণের পর বাড়িওয়ালা তাঁর বাসা থেকে আমাদের বের করে দিয়েছেন। উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম স্বামীর ওষুধের দোকানটিরও অচলাবস্থা। তিন-চার মাসের ঘরভাড়া বাকি, বাইরেও বের হতে পারি না। ঘরের মধ্যে না খেয়ে মরার মতো অবস্থা।

আবেগাপ্লুত কণ্ঠে শান্তনা রাণী বলেন, অসুস্থ স্বামী, সন্তান নিয়ে আত্মাহুতি ছাড়া আমার আর কোনো পথ খোলা নাই। দুবেলা-দুমুঠো খেতে পারছি না। আমাদের কারো জীবনের নিরাপত্তা নেই। আমি ধর্ষিতা, আমি ভালো নাই ! আমি কোথাও যেতে পারছি না। কোনো কাজ করতে পারছি না। স্বামীর ওষুধের দোকানটিও হয়তো টিকবে না। তার চেয়ে মৃত্যু অনেক ভালো। আমি বাঁচতে পারছি না; আমাদের কমিউনিটিরও (খ্রিস্টান) কেউ আমার পাশে নেই। আমি নষ্ট বলে আমার সন্তানের আকুতিও তাঁর আপনজনের কাছে পৌঁছে না। তাহলে আমি কোথায় যাব। 

মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা ও খুলনা সদর থানার এসআই মোহাম্মদ আবু সাঈদ কালের কণ্ঠকে বলেন, অত্যন্ত আন্তরিকতার  সঙ্গে আমরা মামলাটি তদন্ত করছি। এজাহারে কারো নাম না থাকলেও অভিযুক্তদের ৪৮ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ডিএনএ রিপোর্ট এসেছে। মোবাইলে ছবি ও ভিডিও তুলে অর্থ আদায়ের বিষয়টি প্রযুক্তিগত যাচাই-বাছাই চলছে। রিপোর্ট পেলেও দ্রুত অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।

তিনি আরো বলেন, অপরাধীরা জঘন্য ঘটনা ঘটিয়েছে। ভুক্তভোগী বিচারের সুফল পাবেন বলে আশা করি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা