kalerkantho

শুক্রবার । ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৭ নভেম্বর ২০২০। ১১ রবিউস সানি ১৪৪২

হাটহাজারী পৌরসভা

প্রশাসক স্বেচ্ছাচারী, কাজ ছাড়াই বেতন অ্যাকাউনটেন্টের, দাপিয়ে বেড়ান লাইনম্যান

হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি   

১৯ অক্টোবর, ২০২০ ১২:৪০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রশাসক স্বেচ্ছাচারী, কাজ ছাড়াই বেতন অ্যাকাউনটেন্টের, দাপিয়ে বেড়ান লাইনম্যান

হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌর প্রশাসক মো. রুহুল আমিনের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে হাটহাজারী পৌরসভায় নিয়োগপ্রাপ্ত হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. শহীদ উল্লাহ নিজের চেয়ারে বসতে পারছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ দীর্ঘ ৯ মাস ধরে তাকে কোনো কাজ ছাড়াই প্রতিমাসে ৪০ হাজার টাকা করে বেতন দেয়া হচ্ছে। এ কর্মকর্তা ডিউটি না করেই হাটহাজারী পৌরসভা থেকে গত জানুয়ারি থেকে সেপ্টম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে সর্বমোট ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা বেতন তুলেছেন। তার মধ্যে অফিসে বসে কাজ না করেই প্রথম ৫ মাসের বেতন একত্রে ২ লাখ টাকা তাকে দেয় পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। দপ্তরের কাগজপত্রে তিনি কর্মরত থাকলেও তাকে তার চেয়ারে বসতে দিচ্ছেন না পৌর প্রশাসক। হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ছাড়া কিভাবে আর্থিক হিসাব নিকাশ সম্পন্ন হয়? কার স্বাক্ষরেই এসব অবৈধ লেনদেন হয় এমন দাবি সচেতন মহলের। 

এদিকে, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাকে বসার চেয়ার না দিলেও প্রশাসকের বিশেষ লোক হিসেবে পরিচিত পৌরসভার বিদ্যুতের লাইনম্যান মো. মনোয়ার হোসেন পৌরসভা কার্য্যালয়ের ৭ নম্বর কক্ষে সুসজ্জিত অফিসে চেয়ারে বসে নিয়মিত অফিস করছেন। বিদ্যুৎ লাইনম্যান হলেও তাকে পৌর নাগরিকরা কোনো দিন সড়কবাতির কাজ করতে দেখেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। পৌরসভা কার্যালয় এলাকায় মনোয়ার সুপারভাইজার হিসেবে পরিচিত। মনোয়ারের দাপটে পৌরবাসীরা তটস্থ থাকেন। এতে পৌরসভার নাগরিকদের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এমন অভিযোগ পৌরবাসীদের। 

বিনা ডিউটিতে ৯ মাসে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা বেতন দেয়া কী পৌরসভার লাভ হয়েছে? কেন এত টাকা অপচয় করা হলো? এই টাকাগুলো দিয়ে পৌরসভার কোন উন্নয়ন কাজ করলে আমরা পৌরবাসীরা অন্ত উপকৃত হতাম। এ টাকাগুলো তো আমাদের ঘামঝরা পরিশ্রমের। কেন শুধু শুধু টাকা নষ্ট করা হলো? এমন প্রশ্ন ও মন্তব্য ক্ষুব্ধ পৌরবাসীদের।

নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়,  উপস্থিতির স্বাক্ষর বইয়ে হাজিরা দিয়ে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা শহিদ উল্লাহ প্রতিদিন বাসায় ফিরে যান। অথচ হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা চেয়ারে বসতে না পারলেও পৌরসভা কার্যালয়ের ৭ নম্বর কক্ষে নিয়মিত বসে অফিস করেন পৌরসভার বিদ্যৎ লাইনম্যান মো. মনোয়ার হোসেন। বিদ্যুৎ লাইনম্যান হিসেবে কর্মরত থাকলেও পৌরসভায় লাইনম্যান মনোয়ার সুপারভাইজার হিসেবেই এলাকায় পরিচিত। মনোয়ার মোটরসাইকেল নিয়ে সারাদিন পৌরসভার এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত দাপিয়ে বেড়ান। তাছাড়া পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের ঠিকাদার হিসেবে মনোয়ার মাঠে প্রকল্পের সাইটে ব্যস্ত থাকেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার ও ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন। সরকারি চাকরি করেও মনোয়ার কীভাবে ঠিকাদারী কাজ করেন এ প্রশ্ন অভিযোগকারীদের। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাটহাজারীর একাধিক ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, পৌরসভার উন্নয়ন না হলেও উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে পৌরসভার প্রতিটি কর্মকর্তা ও কর্মচারির। পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলীসহ জমি কিনে হাটহাজারীতে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন অনেক কর্মচারি। শুধু তাই নয়, অষ্টম শ্রেণি পাস বিদ্যুৎ লাইনম্যানও জায়গা কিনেছেন এ পৌরসভায়। দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে পৌরসভা আর উপজেলা। হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ছাড়া কীভাবে আর্থিক হিসাব নিকাশ সম্পন্ন হয়? কার স্বাক্ষরেই এ সব অবৈধ লেনদেন হয় তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন। এলাকাবাসী সরকারি কর্মচারিদের এসব অনিয়ম তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। 

জানতে চাইলে পৌরসভার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. শহীদ উল্লাহ  জানান, চলতি বছর জানুয়ারিতে এ পৌরসভায় হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা পদে যোগদান করার জন্য নীলফামারী থেকে আসি। কিন্তু যোগদানপত্র গ্রহণ করেনি কর্তৃপক্ষ। তবে অবশেষে মার্চ মাসে যোগদানপত্র গ্রহণ করেন পৌর প্রশাসক। এরপর হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেই কেটে যাচ্ছে দিন, সপ্তাহ, মাসের পর মাস। যোগদানপত্র গ্রহণ করলেও পৌরসভায় বসার কোনো সুযোগ দেয়নি কর্তৃপক্ষ। শুধু স্বাক্ষর  করেই চলে যেতে হয় আমাকে। এরপর ৫ মাসের বেতন একত্রে ২ লাখ টাকা আমার হিসাবে জমা হয়। তারপর থেকেই স্বাক্ষর করেই বেতন দিচ্ছে পৌরসভা। 

শহিদ উল্লাহ বলেন, বিনা পরিশ্রমে পৌরসভা যদি বেতন দেয় তাহলে আমার ক্ষতি কী! কেন পৌরসভা কর্তৃপক্ষ আমাকে বসিয়ে বসিয়ে বেতন দেয় সেটা আমার জানা নেই। পৌরসভা কর্তৃপক্ষ সেটা ভালো বলতে পারবে। 
 
পৌরসভার সচিব বিপ্লব চন্দ্র মুহরীর কাছে জানতে চাইলে তিনি হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আছেন বলে জানালেও বাকি সব পৌর প্রশাসক মহোদয় বলতে পারবেন বলে সাংবাদিকদের জানান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পৌর প্রশাসক মোহাম্মাদ রুহুল আমিন স্থানীয় সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বলেন, পৌরসভায় হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আছেন। তবে কাজ নেই, বসার জায়গা নেই, তাই স্বাক্ষরেই বেতন দিচ্ছি। ওই কর্মকর্তা দুর্নীতির কারণে এই পৌরসভায় থেকে অন্য জায়গায় বদলি হয়েছেন। তারপর তিনি তদবীর চালিয়ে এ পৌরসভায় যোগদান করে। তাকে প্রত্যাহার করার জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। কোনো শোকজ করা হয়নি বলে তিনি জানান।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা