kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ কার্তিক ১৪২৭। ২০ অক্টোবর ২০২০। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম

রায়হানের পরিবারের ৬ দফা দাবি

সিলেট অফিস ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি    

১৯ অক্টোবর, ২০২০ ০২:৫৩ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম

সিলেটে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনে নিহত রায়হানের পরিবারের পক্ষ থেকে গতকাল তাঁর বাড়িতে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

সিলেটে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনে রায়হানের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের বরখাস্ত উপপরিদর্শক (এসআই) আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ জড়িতদের আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে নিহতের পরিবার। একই সঙ্গে এই ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করা হয়েছে। অন্যথায় হরতাল, অবরোধসহ কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

নিহত রায়হানের বাড়িতে গতকাল রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি করা হয় এবং হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। পরিবার ও এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে ছয় দফা দাবি তুলে ধরে বলা হয়, দাবিগুলো মানা না হলে উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য সিলেট মহানগর পুলিশ প্রশাসন দায়ী থাকবে। সংবাদ সম্মেলনে রায়হানের মা সালমা বেগমের উপস্থিতিতে তাঁর পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন রায়হানের মামাতো ভাই শওকত আলী।

সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত ছয় দফা দাবি হচ্ছে—বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন, হত্যায় জড়িত এসআই আকবরসহ দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার, পলাতক আকবরকে গ্রেপ্তারে আইজিপির নির্দেশ, সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনারের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য প্রদান, নিহতের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জড়িতদের গ্রেপ্তার না করলে হরতাল-সড়ক অবরোধসহ বৃহত্তর আন্দোলন।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, রায়হান হত্যার সুষ্ঠু বিচার দাবিতে এরই মধ্যে পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঘটনার আট দিন পরও এতে জড়িত কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। উপরন্তু মূল অভিযুক্ত এসআই আকবর পালিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে রায়হানের মা সালমা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে কোনো দল করত না। তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ক্ষতিপূরণ বলতেও আমার একটাই চাওয়া—আমার ছেলের হত্যাকারীদের প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়া হোক। কারণ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিলেও ছেলেকে আর ফিরে পাব না।’

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, স্থানীয় কাউন্সিলর মখলিছুর রহমান কামরান, ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর রেজাউল হাসান কয়েস লোদি, ১০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর তারেক উদ্দিন তাজ, ৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ইলিয়াসুর রহমান, রায়হানের সত্বাবা হাবিব উল্লাহসহ এলাকার মুরব্বিরা।

এসআই আকবর কি তবে বিদেশে পালিয়েছেন?

সিলেটের বন্দরবাজার ফাঁড়িতে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনে রায়হানের মৃত্যুর ঘটনার আট দিন পরও হোতা এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া ধরাছোঁয়ার বাইরে। আকবর কোথায়—এই প্রশ্ন এখন সিলেট ও তাঁর জন্মস্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে।

অভিযোগ উঠেছে, এসআই আকবরকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছে পুলিশ। দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া ঠেকাতে সব সীমান্তে সতর্কতা জারির উদ্যোগটিও বিলম্বে নেওয়া হয়েছে। অন্য আরেকটি সূত্র বলছে, আকবর দেশেই আছেন এবং পুলিশের নজরদারির মধ্যেই রয়েছেন। ঘটনায় জড়িত বাকিদের দু-এক দিনের মধ্যেই গ্রেপ্তার দেখানো হবে।

গত ১১ অক্টোবর বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয় নগরের আখালিয়া এলাকার বাসিন্দা রায়হান আহমেদকে। পরে তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনার পরপরই ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ এসআই আকবর পালিয়ে যাননি, বরং এ সময় থেকে আকবর কোথায় আছেন সে বিষয়ে পুলিশ স্পষ্ট করে কিছু বলেনি।

সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার এক দিন পর গত সোমবার সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হন আকবরসহ অভিযুক্ত অন্য পুলিশ সদস্যরা। এদিন রাত ৯টা পর্যন্ত আকবর পুলিশ লাইনসে ছিলেন। কিন্তু এর পর থেকেই তিনি লাপাত্তা।

আকবরের বিষয়ে জানতে গত মঙ্গলবার যোগাযোগ করা হয় মহানগর পুলিশের তৎকালীন উপকমিশনার (গণমাধ্যম) জ্যোতির্ময় সরকারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় অভিযুক্তদের সবাইকে পুলিশ লাইনসে যুক্ত করা হয়েছে। তাঁরা সেখানেই আছেন।’

আকবর পালিয়ে যাওয়ার গুঞ্জন আরো জোরালো হয়ে উঠলে গত মঙ্গলবার আবারও জ্যোতির্ময় সরকারের সঙ্গে কথা বলার জন্য এসএমপি গণমাধ্যমের মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হয়। ওপাশ থেকে বি এম আশরাফ উল্লাহ তাহের নামের একজন জানান, জ্যোতির্ময় সরকারের স্থলে তিনি যোগ দিয়েছেন। আগের দিনের বিষয়টি উল্লেখ করে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তাঁকে গ্রেপ্তারে পুলিশ সর্বাত্মকভাবে কাজ করছে। যেকোনো সময় ভালো খবর জানতে পারবেন।’

আকবর পুলিশ লাইনসে আছেন এমন কথা আগের দিন জানানো হয়েছিল উল্লেখ করে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি মাত্রই দায়িত্ব নিয়েছি। এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারব না। তবে তাঁকে গ্রেপ্তারে কাজ করছে পুলিশ।’

একটি সূত্র বলছে, ঘটনার পরদিন সোমবার রাতের কোনো এক সময় আকবর পুলিশ লাইনস থেকে বের হয়ে সীমান্ত এলাকায় চলে যান। সেখানে দুই দিন আত্মগোপনে থেকে চিহ্নিত মাদক কারবারিদের সহায়তায় সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধভাবে ভারতে পালিয়ে যান।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, হেফাজতে রায়হানকে নির্যাতন করে হত্যার ঘটনায় মূল অভিযুক্ত এসআই আকবর হোসেন এখন কোথায় আছেন, তা নিয়ে জেলার সর্বত্র আলোচনা চলছে। তবে আকবর তাঁর জন্মস্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে নেই বলেই ধারণা অনেকের। তবে বিদেশে পালিয়েছেন কি না, সে বিষয়েও কেউ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছে না। ঘটনার দু-তিন দিন পর থেকে তিনি পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ এড়িয়ে চলছেন।

আশুগঞ্জ থানার ওসি জাবেদ মাহমুদ জানান, আকবরের বিষয়ে তাঁদের কাছে কোনো ধরনের নির্দেশনা নেই। তিনি এলাকায় আছেন কি না, সে বিষয়টিও তাঁদের জানা নেই।

আশুগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হানিফ মুন্সি বলেন, ‘এসআই আকবর এলাকায় আছেন কি না, সে বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। তিনি বিদেশে পালিয়েছেন বলে যে কথা বলা হচ্ছে, সে বিষয়েও আমি অবগত নই।’

জেলার এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, আকবর যাতে দেশ ছেড়ে পালাতে না পারেন সে বিষয়ে সীমান্ত এলাকাগুলোতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সতর্ক অবস্থায় আছেন। তবে আকবর দেশে কোথাও আছেন কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য নেই।

আকবরের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার বগইর গ্রামে। ২০০৫ সালে পুলিশে কনস্টেবল পদে যোগ দেন তিনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা