kalerkantho

রবিবার । ৯ কার্তিক ১৪২৭। ২৫ অক্টোবর ২০২০। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

সেই কপোতাক্ষ, এই কপোতাক্ষ

শেখ হাসান   

১৭ অক্টোবর, ২০২০ ১৪:১৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সেই কপোতাক্ষ, এই কপোতাক্ষ

রাস্তা নির্মাণের আগের ছবি।

মাইকেলের একটি বিখ্যাত কবিতা  ‘কপোতাক্ষ নদ’  কবিতার প্রথম লাইন টি ‘সতত হে নদ তুমি পড় মোর মনে’  ঠিক তেমনি আমারও কপোতাক্ষ নদের কথা মনে পড়ে! কিন্তু আমার যখন কপোতাক্ষ নদের কথা মনে পড়ে তখন আমার মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায়! কারণ আমার বাড়ির পাশের সেই কপোতাক্ষ নদ এখন আর নাই। সেখানে এখন বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করা হয়। এই নদের উপর দিয়ে এখন মানুষ গাড়ি চালিয়ে ওপারে যায়। কপোতাক্ষ নদ যে এখন দুই টুকরো করা হয়েছে, এটা নিয়ে আমি কারো মাথাব্যাথা দেখিনা এবং কোথাও লেখালেখি করতে দেখে না।

এখন আমি আমার দেখা কপোতাক্ষ নদের বর্ণনা দেব। আমার বাড়ি কপোতাক্ষ নদের তীরে, আমার ছোটবেলার বেশির ভাগ সময় কেটেছে কপোতাক্ষ নদে। এই নদ যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলায় ভৈরব নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে সাগরদাঁড়ির পাশ দিয়ে, সাতক্ষীরা জেলার পাটকেলঘাটা, তালা, আশাশুনি উপজেলা ও খুলনা জেলার পাইকগাছা, কয়রা উপজেলার ভিতর দিয়ে এটি পরে কয়রায় খোলপেটুয়া নদীতে গিয়ে পতিত হয়েছে। এর দৈর্ঘ্য ১৮০ কিলোমিটার। এই নদ ৮০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে অবস্থিত। কিন্তু বর্তমানে নদটি খালের আকারে যশোরের চৌগাছা থেকে প্রবাহিত হয়ে খুলনা জেলার পাইকগাছার শিবসা নদীতে মিলিত হয়েছে। এই মিলিত হওয়ার স্থান থেকে সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি থানার বড়দল পর্যন্ত দীর্ঘ ছয় সাত কিলোমিটার নদী এখন মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে। উপগ্রহ মানচিত্রের এখন আর এই এলাকায় কোন নদীর চিহ্ন দেখা যায় না।

আশির দশকেও আমি দেখেছি কপোতাক্ষ  নদের ভরা যৌবন। জেলেদের রাতদিন মাছ ধরার দৃশ্য। শত শত জেলে পরিবারের একমাত্র জীবিকার উৎস ছিল এই নদ। প্রতিদিন সকালে তিনটি লঞ্চ এই নদ দিয়ে খুলনায় যেত, আবার রাত্রে খুলনা থেকে সেগুলা ফিরে আসতো। একটি লঞ্চ যেত কয়রার দিকে অন্য দুটি যেত সাতক্ষীরার আশাশুনি দিকে। সুন্দরবন থেকে কাঠ গোলপাতা বোঝাই করে বড় বড় নৌকাগুলো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেত। গরান (গজারি) কাঠ বোঝাই করে কার্গোগুলো সরাসরি ঢাকায় চলে আসতো।

কপোতাক্ষ নদের স্রোত ও গভীরতা এতই ছিল যে অনেক সময় বড় বড় নৌকা দুর্ঘটনায় পড়ে ডুবে গেলে সেগুলো আর উদ্ধার করা সম্ভব হতো না। এমনকি অনেক সময় তার সন্ধানও মিলতো না। কিন্তু খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার চাঁদখালী ইউনিয়ন ও সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি থানার দর্গাপুর ইউনিয়নের ভিতর দিয়ে বয়ে চলা নদের অংশটিতে ধীরে ধীরে পলি জমতে থাকে। নদের পাড় দিয়ে একটু একটু করে চর জাগতে থাকে, আর সেই চর স্থানীয়রা বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করতো। এভাবে ধীরে ধীরে নদটি সংকুচিত হতে থাকে। নদের তলদেশেও পলি জমে নাব্যতা কমতে থাকায় একসময় বড় নৌকা লাঞ্চ কার্গো চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু নদের এই  অংশে সংস্কার বা খননের কোনো উদ্যোগ নিতে কখনো দেখা যায়নি বরং এটিকে গলাটিপে হত্যা করা হচ্ছে।

এ নদীর মাঝ বরাবর বাঁধ দিয়ে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। এখন সেই রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলে। ঠিক এইখানে একসময় খেয়া ঘাট ছিল। নৌকায় করে মানুষ এপার থেকে ওপারে যেত। এই খেয়াঘাটের পাশেই একটি বাজার ছিল, বাজারের নাম কাটাখালি বাজার। আগে বাজারটির অবস্থান ছিল বেড়িবাঁধের ভিতর, এখন বাজারটি বেড়িবাঁধের বাইরে আগে যেখানে  নদ ছিল।

এই বাঁধের ফলে কপোতাক্ষ নদ এখন দুই ভাগে বিভক্ত। এই নদীর মাঝে কয়েক কিলোমিটার এলাকা এখন প্রভাবশালীদের দখলে। সেখানে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করা হয়। এর ফলে খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার কয়েকটি গ্রাম ও সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি থানার কয়েকটি গ্রাম স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতার আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ নদটি যেহেতু বাঁধ দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এর ফলে এখন আর পানির প্রবাহ নেই।

দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলোতে ২৪ ঘন্টায় দুইবার জোয়ার ভাটা হয়। জোয়ারের সময় পানি পানি বৃদ্ধি পায় আবার ভাটার সময় পানি নেমে যায়। আগে কখনো এই এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে থাকত না। কারণ যতই বৃষ্টি হোক ভাটার সময় সব পানি নদীতে চলে যেত। আরো একটি বড় সমস্যা হল এই এলাকায় প্রায় বারোমাসই  লবণ পানি আটকে রেখে মাছ চাষ করা হয়। ফলে মাটির উপরে অংশ তো বটেই মাটির তলদেশেও লবণাক্ত হয়ে গেছে। এলাকার মানুষ গভীর নলকূপ বসানোর পরেও মিষ্টি পানির সন্ধান পায় না। ফলে এসব এলাকার মানুষ এখন খাবার পানির চরম সংকটে পড়েছে।

শেখ হাসান: কালের কণ্ঠের জ্যেষ্ঠ ফটোসাংবাদিক।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা