kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ কার্তিক ১৪২৭। ২০ অক্টোবর ২০২০। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

এখনো বিপৎসীমার ওপরে অনেক নদী, চলছে ভাঙনও

অনলাইন ডেস্ক   

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০৯:০৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এখনো বিপৎসীমার ওপরে অনেক নদী, চলছে ভাঙনও

ঋণ নিয়ে পানের বরজ করেছিলেন ইয়াকুব আলী (৪০)। তাঁর সেই পানের বরজে এখন বুক সমান পানি। রংপুরের পীরগাছা উপজেলার আটষট্টিপাড়া গ্রামের ইয়াকুবের মতো বহু প্রান্তিক কৃষকের পানের বরজ, রোপা আমন ও রবিশস্য তলিয়ে গেছে ঘাঘট নদের পানিতে।

টানা বৃষ্টি আর উজানের ঢলে নদটি ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। একদিকে পার উপচে ফসলের মাঠে, লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে পানি, অন্যদিকে ভাঙছে নদ। স্থানীয় লোকজন বলছে, ঘাঘটের এমন ভয়াল রূপ তারা আগে দেখেনি।

ইয়াকুব আলী বলেন, 'অনেক আশা নিয়ে এনজিও থাকি ঋণ তুলি পানের বরজ দিছনু, কিন্তু পানি উঠি সউগ ভাসি গেল। এমনিতে করোনার কারণে পানের দাম আছিল না। এখন ডুবি গেল সউগ।'

একই গ্রামের ছাইফুল ও হযরত আলীর পানের বরজ, আশরাফ আলীর মুলার ক্ষেত, ফজলুর রহমান ও নুর মোহাম্মদের সবজিক্ষেত এবং আলম মিয়ার করলার ক্ষেত এখন পানির নিচে।

গত কয়েক দিনে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে এ অঞ্চলে। বৃষ্টির পানি অপ্রস্থ ঘাঘট নদ দিয়ে নেমে যেতে না পেরে তা উপচে লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে।

গত তিন দিনে আটষট্টিপাড়াসহ আশপাশের গ্রামে ঘাঘটসংলগ্ন সাতটি বাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে প্রায় অর্ধশত বাড়ি।

স্থানীয় উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, উপজেলায় চলতি মৌসুমে ২০ হাজার ৫৭০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। বৃষ্টি ও বন্যার পানিতে দুই হাজার হেক্টর জমির রোপা আমান পানিতে তলিয়ে গেছে। ১০০ হেক্টর রবিশস্য পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।

রংপুর নগরীর কামাল কাছনা এলাকার নাজমুল হুদা ২২ হাজার টাকায় পুকুর লিজ নিয়ে ৫০ হাজার টাকার মাছের পোনা ছেড়েছিলেন। এক রাতের রেকর্ড বৃষ্টিপাতে সব পোনা ভেসে গেছে। শুধু নাজমুল হুদা একা নন, তাঁর মতো সব মৎস্য ব্যবসায়ীর মাথায় হাত পড়েছে।

গত কয়েক দিনের ভারি বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢলে গাইবান্ধায় করতোয়া, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ঘাঘটসহ জেলার সব নদ-নদীর পানি অব্যাহতভাবে বাড়ছে। গত সোমবার বিকেল ৩টা থেকে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত করতোয়ার পানি ২১ সেন্টিমিটার বেড়েছে। ঘাঘটের পানি বিপৎসীমার মাত্র ১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তিস্তা, ব্রহ্মপুত্রের পানি অনেকটা বাড়লেও এখনো বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও গাইবান্ধা সদর উপজেলার চরাঞ্চল এবং নদীতীরবর্তী নিচু এলাকা ডুবে গেছে। ওই সব এলাকার সহস্রাধিক বাড়িঘরে পানি উঠেছে। অন্যদিকে করতোয়া নদীর পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় পলাশবাড়ী উপজেলার কিশোরগাড়ী ইউনিয়নের টোংরাদহের দুটি পয়েন্টে প্রায় ৬০ মিটার বাঁধ ভেঙে গেছে।

করতোয়ার পানিতে ডুবে গেছে গোবিন্দগঞ্জের নদীতীরবর্তী ১৮টি গ্রামের কলা, আখ ও রোপা আমনসহ শাক-সবজির ক্ষেত। গোবিন্দগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী অফিসার রামকৃষ্ণ বর্মণ জানান, পৌরসভাসহ ১০টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। আট হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। এরই মধ্যে পৌরসভায় দুটি এবং হরিরামপুরে একটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেগুলোতে শতাধিক পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। দুর্গত মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ শুরু করা হয়েছে।

নওগাঁর আত্রাই ও মান্দা উপজেলার বন্যা পরিস্থিতিও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এই দুই উপজেলার কমপক্ষে ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফ উজ্জামান খান গতকাল জানান, আত্রাই ও যমুনার পানি এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

আত্রাই উপজেলার হাটকালুপাড়া, কালিকাপুর, আহসানগঞ্জ, শাহাগোলা, বিশা, পাঁচুপুরসহ সাতটি ইউনিয়ন এবং মান্দা উপজেলার কসব, বিষ্ণপুর ও নুরুল্যাবাদ ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে বন্যার পানিতে। এসব এলাকার মাঠের আমন ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বেশির ভাগ পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। প্রচুরসংখ্যক মাটির বাড়িঘর ভেঙে গেছে।

এসব এলাকার বয়স্ক ব্যক্তিরা বলেছেন, গত ৪০-৫০ বছরে তাঁরা এমন বন্যা দেখেননি। হাটকালুপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শুকুর আলী এ এলাকাকে উপদ্রুত বিশেষ এলাকা হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন।

নেত্রকোনায় অবশ্য ধীরগতিতে হলেও পানি কমতে শুরু কমছে। জেলার প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি বিপৎসীমার নিচে থাকলেও খালিয়াজুরিতে ধনু নদের পানি গতকাল বিপৎসীমার ২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। জেলার ১০ উপজেলায় অন্তত ২০ হাজার ২০৪ হেক্টর জমির ফসল নিমজ্জিত হয়েছে। তবে তলিয়ে যাওয়া ব্রি-৫১ ও ব্রি-৫২ ধানের তেমন ক্ষতি হবে না বলে জানিয়েছেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. হাবিবুর রহমান। তিনি জানান, ব্রি-৫১ ও ব্রি-৫২ ধানের চারা পানির নিচে প্রায় দুই সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে। ১৪ হাজার ২০৪ হেক্টর জমিতে প্রায় ৬৪ হাজার ৮০০ টন ধান উৎপন্ন হওয়ায় কথা ছিল। পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় প্রায় ৪৫ হাজার কৃষক পরিবারের ১৬২ কোটি টাকা ক্ষতির হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কালীগঙ্গা নদীর ভাঙন থেকে মানিকগঞ্জ শহর রক্ষায় নির্মিত বাঁধে ধস শুরু হয়েছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে বাঁধসংলগ্ন এলাকার বাড়িঘর, দোকানপাট।

মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, কালীগঙ্গা নদীর তীব্র স্রোতে বাঁধটির চারটি অংশে ভাঙন দেখা দিয়েছে।

এদিকে রাজবাড়ী জেলা শহরসংলগ্ন গোদার বাজার এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ১২০ মিটার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল আহাদ জানান, তীব্র স্রোত ও বাতাসের কারণে গত সোমবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে অবকাশকেন্দ্রসহ ১২০ মিটার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তাঁরা ভাঙন প্রতিরোধে কাজ শুরু করেছেন। গতকাল দিনভর সেখানে এক হাজার ৩৫০ বস্তা বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে।

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার কালের কণ্ঠ'র প্রতিনিধিরা।] 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা