kalerkantho

শনিবার । ৮ কার্তিক ১৪২৭। ২৪ অক্টোবর ২০২০। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

শাখা যমুনার ভাঙনে বিলীনের পথে গ্রাম-মসজিদ-বিদ্যালয়

মাহাবুর রহমান, বিরামপুর ও দিনাজপুর প্রতিনিধি   

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১৯:৪৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শাখা যমুনার ভাঙনে বিলীনের পথে গ্রাম-মসজিদ-বিদ্যালয়

দিনাজপুরের বিরামপুরে শাখা যমুনা নদীর পানি হু হু করে বাড়ছে। ফলে পৌর শহরের ৯ নং ওয়ার্ডের মুন্সি পাড়া গ্রামের বেশ কিছু বাড়ি বিলীন হয়েছে। ওই গ্রামের ২০টি বাড়ি এবং ভবানিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মুন্সিপাড়া জামে মসজিদসহ বেশ কিছু স্থাপনা নদী ভাঙনের অপেক্ষায়। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, নদী ভাঙনরোধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

জানা যায়, বিরামপুর শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ছোট শাখা যমুনা নদী। এই নদীটি দিয়েই এক সময় যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে স্থানীয় ব্যক্তিরা। কালের বিবর্তনে পানি পথে যাতায়াত বন্ধ হলেও সর্বনাশী নদীর গতিপদ বার বার বদল করেছে। নদীটি দিনাজপুর ইছামনি নদীর শাখার শাখা হয়ে বিরামপুর এসে ছোট শাখা যমুনা নদী নাম হয়েছে। এটি বিরামপুর হয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে।

সোমবার সরেজমিন মুন্সিপাড়া গ্রামবাসীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েকদিনে টানা বৃষ্টিতে নদীতে উজান থেকে নেমে আসা পানির তীব্র স্রোতের কারণে নদী ভাঙন শুরু হয়েছে। চলতি মাসে টানা বর্ষাতে গ্রামটির তিনটি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নদীর পাড় থেকে ২ মিটার দূরত্বে অবস্থিত গ্রামের একমাত্র জামে মসজিদটিও যেকোনো মুহূর্তে নদীর ভাঙনে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন অসহায় গ্রামবাসী। শুধু তাই নয়, একই গ্রামের মন্ডলপাড়াতে ভবানীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও রয়েছে হুমকির মুখে। বিদ্যালয়ের ৫ হাত দূরে নদীর ভাঙন শুরু হয়েছে। বিদ্যালয়টিকে রক্ষার জন্য রবিবার দুপুরে গ্রামবাসী নদীর পাড়ে বাঁশ ও গাছের গুঁড়ির বাঁধ দিয়ে রক্ষার চেষ্টা করেছে।

কথা হয় ওই গ্রামের আব্দুল মাবুদ (৫০) নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে। তিনি জানান, নদীর পাড়ের যে অংশটিতে তিনি বসে আছেন সেটি কয়েকদিন আগে তার বাড়ির বারান্দা ছিল। চোখের সামনেই এক এক করে নিজের হাতে সাজানো ৫টি ঘর চলে গেছে নদীর ক্ষুধার্ত পেটে। প্রতিদিনই তিন থেকে পাঁচ হাত করে বসতভিটার মাটি খেয়ে ফেলছে নদীটি। এখন কোথায় যাবে এমন কোনো উত্তর নেই তার কাছে।

ওই গ্রামের বাসিন্দা শওকত আলী (৫০) বলেন, ২০০৫ সালে তার বসতবাড়ি ও ১৮ বিঘা আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। পরে নদী থেকে প্রায় ৫০০ হাত দূরে পাকারাস্তা সংলগ্ন জমিতে যে বাড়ি করেছি নদী ভাঙনে সেটিও এখন হুমকির মুখে।

শওকত আলী আরো বলেন, ২০০৫ সালের আগ পর্যন্ত আমার বর্তমান বাড়ির পূর্বপাশে ২২টি বাড়ি ছিল যেগুলো সব নদীর ভাঙনে বিলীন হয়েছে। সেইসাথে গ্রামের মানুষের পারিবারিক কবরস্থানটিও বিলীন হয়েছে। পরে ওই বাড়িহারা মানুষগুলো গ্রামের দক্ষিণ পাশে নতুন করে বাড়ি করে বসত গড়েছেন।

গ্রামের সর্বউত্তরে বাসিন্দা ও নদীর ভাঙনে বাড়িহারা আব্দুল লতিফ বলেন, আজ থেকে ১২ বছর পূর্বে আমার বাড়িটিই ছিল গ্রামের ঠিক মাঝখানে। অথচ নদীর ভাঙনে গ্রামের উত্তরপাশের সব বাড়িঘর নদীতে বিলীন হওয়ায় এখন আমার বাড়ির অবশিষ্ট বারান্দাটি গ্রামের সর্বউত্তরের হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কোথায় মাথাগোঁজার ঠাঁই নেব সেই চিন্তায় রাতে ঘুম আসে না!

বিরামপুর পৌরসভার ৯ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. নূর আলম বলেন, ভবানীপুর ও গ্রামের বিদ্যালয়টিকে নদীর ভাঙন থেকে রক্ষার জন্য ইতোপূর্বে কয়েকবার পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ ৩-৪ বার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গেলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

গ্রামবাসী সূত্রে জানা যায়, ২০০৭ সালে দিনাজপুর-৬ আসনের তৎকালীন সংসদসদস্য আজিজুর রহমান চৌধুরীর নিকট এ ব্যাপারে আবেদন করলে তিনি নদীর পাড়ে গাইড বাঁধ দেওয়া বাবদ ৩০ হাজার ও তৎকালীন ইউএনও আবু সাইদ মো. নূরে আলম ৫ হাজার টাকা দেন।

পরে ২০০৮ সালে দিনাজপুর জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে নদীর পাড়ে পাইলিং বাঁধ তৈরিতে ১ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সে সময় বরাদ্দকৃত ওই টাকায় গ্রামরক্ষা বাঁধ দিলেও একবছরের মাথায় সেগুলোও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।

জানতে চাইলে বিরামপুর উপজেলা নির্বহীঅফিসার ইউএনও পরিমল কুমার সরকার বলেন, পৌরসভার ৯নং পারভবানিপুর মুন্সিপাড়া গ্রাম ও ভবানিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি শাখাযমুনা নদীর ভাঙনে ব্যপক ক্ষতির মধ্যে পড়েছে। ভবনটি রক্ষায় এরই মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। গ্রামের অসহায় মানুষের বাড়ি ও প্রাথমিক বিদ্যালয়টি রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

এ বিষয়ে দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আসফাউদদৌলা বলেন, স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের খবরেই সেখানে গিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। সেখানকার সার্বিক অবস্থা আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত দিলেই এবছরই ভাঙন ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা