kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৩ কার্তিক ১৪২৭। ২৯ অক্টোবর ২০২০। ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

গৃহকর্তীর বর্বরতা... মনি'র শরীরের কোথাও বাদ যায়নি গরম খুন্তির ছ্যাঁকা!

পাকুন্দিয়া (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি    

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১৭:৩৩ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গৃহকর্তীর বর্বরতা... মনি'র শরীরের কোথাও বাদ যায়নি গরম খুন্তির ছ্যাঁকা!

আগুনে পোড়া ঘায়ের মত দেখতে অসংখ্য ছোট-বড় কালো দাগ। মাথা থেকে শুরু করে হাত-পায়ের প্রতিটি আঙ্গুল পর্যন্ত। গরম খুন্তি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ও পিটিয়ে এমনই অবস্থা করা হয়েছে পুরো শরীর। ক্ষতবিক্ষত এই শরীর নিয়ে ক্ষুধায় কাতরাতে থাকলেও মন গলেনি গৃহকর্তীর। উল্টো লাঠি ও বেলন দিয়ে পিটিয়ে অচেতন করে ঘরের মেঝেতে ফেলে রাখা হয়। এমন নির্মম ও নিষ্ঠুর নির্যাতনের পরেও সামান্য চিকিৎসাও জোটেনি শিশুটির কপালে। 

অবশেষে খবর পেয়ে গত ২১ সেপ্টেম্বর শিশুটির মা তাকে উদ্ধার করে নিজ বাড়িতে নিয়ে এসে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করান। ১২ বছরের ওই নির্যাতিতা শিশুটি গত পাঁচদিন ধরে হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। ঢাকাস্থ আজমপুরের একটি বাসায় এ নির্মম নির্যাতনের শিকার হয় শিশু মনি। সে ওই বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করত। তার বাবার নাম আবদুল মোতালিব। তিনি একজন দিনমুজুর। বাড়ি কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার এগারসিন্দুর ইউনিয়নের খামা গ্রামে।

মনি'র পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় আট মাস আগে পাশ্ববর্তী তালদশী গ্রামের ইন্নছ আলীর মেয়ে মরিয়ম ঢাকার আজমপুর রয়েল-জবা দম্পতির বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে শিশুটিকে নিয়ে দেন। ওই দম্পতি আজমপুর উত্তরার ৫নম্বর সেক্টরের একটি ফ্ল্যাট বাসায় ভাড়া থাকেন। এর কিছুদিন পর থেকেই নানা বিষয় নিয়ে গৃহকর্তী জবা বেগম মনিকে বকাঝকা ও নির্যাতন শুরু করেন। 

হাসপাতালে বসে শিশু মনি জানায়, তাকে দিয়ে ঘর মোছা, কাপড় পরিস্কার ও পানি আনা থেকে শুরু করে সব কাজ করানো হত। ঘাম ঝরানো খাটুনি শেষে খাবার চাইলে সেটিও মিলত না। মাঝে মধ্যে পঁচাবাসি খাবার দিত। এগুলো সে খেতে পারত না। ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করত। এসব নিয়ে কথা বললেই নেমে আসত নির্যাতনের খড়গ। কোনো কাজ শেষ করতে একটু দেরি হলেই গরম খুন্তি দিয়ে ছেঁকা দেওয়া হত তার শরীরে। এ ছাড়াও লাঠি ও রুটি বানানোর বেলন দিয়ে বেধড়ক পেটাত। এ সময় সে অচেতন হয়ে পড়ত। খুন্তির ছেঁকা আর লাঠি ও বেলনের পিটুনিতে তার মাথা ও হাত-পায়ের আঙ্গুলসহ পুরো শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে। সে এখন হাটতে ও চলতে পারে না। 

এ সময় পাশেই বসা ছিলেন মনির মা নিলুফা বেগম। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, মেয়েটি ঢাকা যাওয়ার আগে  অনেক মোটা ছিল। এখন শুকিয়ে কঙ্কাল হয়ে গেছে। খুন্তি দিয়ে ছেঁকা ও লাঠি আর বেলন দিয়ে পিটানোর কারণে মেয়ের সমস্ত শরীরে পঁচন ধরে গেছে। আমার মেয়েটি ভালো হয় কিনা, কে জানে। আমি ওই মহিলার কঠোর বিচার দাবি করছি।

মনির বাবা আবদুল মোতালিব জানান, মেয়েকে লোভ দেখিয়ে আমাদের অজান্তে ঢাকার একটি বাসায় নিয়ে গৃহকর্মীর কাজ দেয় মরিয়ম। এলাকার লোকজন নিয়ে মেয়েকে ঢাকা থেকে ফেরত আনার জন্য চাপ দেওয়া হয়। পরে গত ২১ সেপ্টেম্বর ক্ষতবিক্ষত অসুস্থ মেয়েটিকে এনে আমার বাড়িতে ফেরত দেয়।

তিনি বলেন, এটি মরিয়মের ব্যবসা। গ্রামের ছোট ছোট মেয়েদের নিয়ে ঢাকার বিভিন্ন বাসায় গৃহকর্মীর কাজ দেয়। এতে সে মোটা অঙ্কের টাকা পায়। 

এ ব্যাপারে মরিয়মের কাছে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি মনিকে ওই বাসায় নিয়ে দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার বলে বলেন, মনিকে গৃহকর্মী মারধর করেছে কিনা আমার জানা নেই। তবে ওই গৃহকর্তীর পূর্ণ ঠিকানা মরিয়মের কাছ থেকে সংগ্রহ করা যায়নি। তিনি শুধু আজমপুর উত্তরার ৫নম্বর সেক্টরে ওই গৃহকর্তীর বাসা, এইটুকুই বলেন। 

গৃহকর্তী জবা মুঠোফোনে জানান, মনিকে মারধর করা হয়নি। সে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তাই তার মাকে খবর দিয়ে এনে মনিকে তার মায়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও মনির চিকিৎসার জন্য তিন হাজার টাকাও দেওয়া হয়েছে। বাসার ঠিকানা জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। 

পাকুন্দিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) শ্যামল মিয়া বলেন, একটি শিশু বাচ্চাকে এমন নিষ্ঠুরভাবে কোনো বিবেকবান মানুষ নির্যাতন করতে পারে না। এটি অমানুষের কাজ। এ ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার জন্য মেয়ের অভিভাবককে বলা হয়েছে। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগটি পাঠানো হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা