kalerkantho

বুধবার । ১২ কার্তিক ১৪২৭। ২৮ অক্টোবর ২০২০। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ঋণের ফাঁদে ২০ শিক্ষক পরিবার, সুদ কারবারি নারীর বিরুদ্ধে মামলা

আবদুল কাদির, পার্বতীপুর( দিনাজপুর)    

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১৫:৩৬ | পড়া যাবে ১৩ মিনিটে



ঋণের ফাঁদে ২০ শিক্ষক পরিবার, সুদ কারবারি নারীর বিরুদ্ধে মামলা

’দশে চক্রে ভগবান ভূত’ বাংলায় এ প্রবাদটির অর্থ বিভিন্নভাবে করা হয়েছে। অধিকাংশ মানুষ মনে করেন , যতবড় ক্ষমতাশালী হোকনা কেন সমষ্টিগত মানুষের কাছে সে কিছুইনা। দিনাজপুরের পার্বতীপুরে চক্রবৃদ্ধি সুদের কারবারির বিরুদ্ধে গত ১৩ জুলাই দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকার ১৪ পৃষ্ঠায় ’ঋণের ফাঁদে ২০ শিক্ষক পরিবার’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে সুদের কারবারি নাজমা খাতুনের বাবা স্কুল শিক্ষক জয়নাল আবেদীন বলেছেন, তার এই বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলেন উপজেলার ৬ নং মোমিনপুর ইউনিয়নের যশাই সৈয়দপুর গ্রামে। তার স্বামীর নাম নুর ইসলাম। দুই পুত্র সন্তান জন্ম হয় এই ঘরে।  অভাব ও স্বামীর সাথে বনিবনা না হওয়ায় তার সংসার টেকেনি। 

এই নাজমা খাতুন দুই পুত্র নিয়ে বাবার বাড়ি তাজনগরে  চলে আসে। অভাবের তাড়নায় রাজাবাসর হাইস্কুলে চকোলেট বিক্রি করে কিছুদিন। পরে ব্র্যাক পরিচালিত স্কুল পাঠাগার চালায় সে। সুদের টাকা খাটানো সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেননা। তবে, শুনেছেন এখন তার অনেক টাকা জমি আর বাড়ি হয়েছে। 

এই নারী ২০১৩ সাল থেকে সুদের কারবার শুরু করেন। মাত্র ৬/৭ বছরের মধ্যে সে প্রায় ৩ কোটি টাকার আবাদি জমি ও বাড়ি করেছেন এবং সুদে লগ্নি করা আছে আরও প্রায় দেড় কোটি টাকা। স্বল্প সময়ে এতো বিপুল পরিমাণ অর্থবিত্তের মালিক হওয়ায় নাজমা খাতুন ধরাকে সরাজ্ঞান করে এসেছে এতোদিন। ভেবেছিলেন, সব কিছু ম্যানেজ করে তার অবৈধ কারবার চালিয়ে যাবেন অপ্রতিরোধ্য গতিতে। 

কিন্তু না, যারা তার কাছে চক্রবৃদ্ধি সুদে ঋণ নিয়ে সর্বশান্ত হয়েছেন,তারা কালের কণ্ঠে প্রতিবেদন প্রকাশের পর এখন  ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছেন। সবাই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আইনি লড়াই করেই সুদের কারবারি নাজমা খাতুনকে পরাস্ত করবেন। ইতিমধ্যে মোফাজ্জল হোসেন নামে একজন সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নাজমার বিরুদ্ধে দিনাজপুর আমলী আদালত -৫ (পার্বতীপুর) এ ৪২০/৪০৬/৫০৬ ধারায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। দায়ের করা মামলার তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্ত করছেন পার্বতীপুর মডেল থানার ওসি তদন্ত মোঃ সোহেল রানা। এছাড়াও মোঃ বেলাল হোসেন, হারুনর রশিদ, আব্দুল বাকি, আনিসুর রহমান,গিয়াস উদ্দিন, দেলোয়ার হোসেন সাইদী, মোঃ এনামুল হক, আবদুল জলিলসহ ১৯ জন সরকারি প্রাথমিক, হাইস্কুল ও মাদরাসার শিক্ষক নাজমা খাতুন ও তার সিন্ডিকেট সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করার  প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন বলে জানা গেছে।

এই ২০ জন শিক্ষক গত ২৪ জুন পার্বতীপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে যৌথ স্বাক্ষরে অভিযোগ করেছিলেন। অভিযোগে বলা হয়েছিল, আমাদের প্রত্যেকের নামে সোনালী ব্যাংক হুগলীপাড়া শাখায় সঞ্চয়ী হিসাব খোলা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে আর্থিক অনটনের কারনে ঋণ সুবিধা গ্রহণের জন্য গেলে দেখা মেলে নাজমা খাতুন, তার বড় ছেলে নাদিরশাহ্ নয়ন ও সাখাওয়াত হোসেন সাজু পিতা মৃত আব্দুস সামাদ সর্ব সাং ছোট হরিপুর মুন্সিপাড়া এদের সাথে। তারা সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের কথা বলে ৩০০ টাকার ননজুডিশিয়াল ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর ও চেক বইয়ে স্বাক্ষরযুক্ত ফাঁকা পাতাসহ জমির মূল দলিল ,স্বর্ণালংকার গ্রহণ করে। পরবর্তীতে ছলচাতুরী ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে প্রদত্ত ঋণের  ৫ থেকে ১০ গুণ বা তারও বেশি মুনাফা হাতিয়ে নেয়। তারপরও জামানতকৃত কাগজপত্র ফেরত না দিয়ে আরও বাড়তি মোটা টাকা দাবি করে এবং আমাদের  জিম্মি করে চেক ও ফাঁকা স্ট্যাম্প দিয়ে মিথ্যা মামলার ভয় দেখায়। 

অভিযোগে বলা হয়েছে, নাজমা ও সাজুদের ভাড়াটিয়া লোক আনিসুর রহমান, আল মামুন, মোতাহার হোসেন, অমেজুল হক, খালেদা বেগম ও অনেককে দিয়ে বাদি সাজিয়ে লাখ লাখ টাকার চেক জালিয়াতির মামলা, উকিল নোটিশ , এমনকি জমি বিক্রির ভূয়া বায়নামা তৈরি করে। এভাবে গড় ১০-১২ বছরে উপজেলার বিভিন্ন স্তরের শিক্ষক, কর্মচারী ও সাধারণ মানুষকে অবৈধভাবে নিঃস্ব করে কোটি কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মালিকানা অর্জন করেছে। তার এই অসাধু কাজে সহায়তা করেছেন আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য ও পার্বতীপুর সোনালী ব্যাংক হুগলীপাড়া শাখার বিভিন্ন সময়ে কর্মরত কতিপয় কর্মকর্তা, কর্মচারী। 
এর আগে ২৪ মার্চ সুদের কারবারি নাজমা খাতুনকে পার্বতীপুর বাসটার্মিনাল সংলগ্ন তার দাদন ব্যবসার অফিস থেকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোছাঃ শাহনাজ মিথুন মুন্নি আটক করেন। এসময় তার কাছে অবৈধভাবে ঋণদানের ফর্ম,বিভিন্ন ব্যক্তির স্বাক্ষর করা বিভিন্ন ব্যাংকের ফাঁকা চেকের পাতা,স্বাক্ষর করা ফাঁকা ৩০০ টাকার ননজুডিশিয়াল স্ট্যাম্প, সোনালী ব্যাংক হুগলীপাড়া শাখার সিল ৩টি, ৫নং চন্ডিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ৫নং ওয়ার্ডের মেম্বরের ১টি করে সীলসহ গুরুত্বপূর্র্ণ ও অপরাধজনক কাজে ব্যবহার করা অথবা বেআইনি কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্য সংবলিত প্রমানক ৩৫টি আইটেম পাওয়া যায়। 

দিনভর এই বড়মাপের অপরাধীকে ইউএনও অফিসে আটকে রেখে সন্ধ্যার দিকে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে ছেড়ে দেওয়া হয়। ছেড়ে দেওয়ার আগে একটি মুচলেকা নেওয়া হয় নাজমার কাছে।সেদিনের এ বিষয়টি ছিল পুরো উপজেলাব্যাপি আলোচিত এবং ভুক্তভোগীদের কাছে রহস্যজনক। কথাগুলো বলেছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে আবেদনকারী ২০ শিক্ষক। 

তারা বলেন, মুচলেকায় ছিল সমস্ত কাগপত্র সংশ্ল্টিদের কাছে ফেরত দিবেন। না দিলে আইনামলে আসবেন এই অঙ্গিকারও করা হয়। তবে, আগামীতে সে বেআইনি সুদের কারবার আর কখনো  করবেনা এই অঙ্গিকার করা হয়নি। এরফলে, প্রকারন্তে সুদের কারবারিকে তার অবৈধ কারবার চালিয়ে যাওয়ার প্রশ্রয় ও প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে বলে ভুক্তভোগীসহ সচেতন মানুষেরা মনে করেন।

২০ শিক্ষক আরও বলেন, আমাদের সন্দেহ অমূলক হলে সুদি নাজমা খাতুনকে পুনরায় গ্রেফতার ও তদন্ত সাপেক্ষে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো। 
নাজমার স্বামী নুর ইসলাম বলেছেন, তার বেপরোয়া চলাফেরায় বাঁধা দেওয়ায় আর বনিবনা না হওয়ায় সংসার ভেঙ্গে যায়।     

তিনি বলেন, শুনেছি এখন তাঁর অনেক টাকা. জমিজমা আর বাড়িও আছে রেশ কয়েকটি। তবে এসব কিভাবে হয়েছে তা তিনি জানেননা। নুর ইসলাম আরো  বলেন, আমার কাছ থেকে চলে যাওয়ার পরে ওর বাবার স্কুলে চকোলেট বিক্রি করতো। পরে স্কুলের ব্র্যাক পরিচালিত পাঠাগারে চাকুরি করতো বলে শুনেছি। 
এদিকে, সুদি নাজমা খাতুন যাদের জমি বাড়ি ট্র্যাপে ফেলে,প্রতারণা করে, জোরপূর্বক মামলা মোকদ্দমার ভয় দেখিয়ে অবৈধভাবে দলিল করে নিয়েছেন তাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। তবে ,প্রাপ্ত তালিকাও  একেবারে ছোট নয়। পার্বতীপুর সাবরেজিষ্ট্রি অফিসে নাজমা খাতুন, তার বড় ছেলে নাদির শাহ্ নয়ন,নাবালক পুত্র নিশাত বাবু ও নাজমার ব্যবসার পার্টনার সাখাওয়াত হোসেন সাজুর নামে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত জমি ও বাড়ি রেজিষ্ট্রির বিচ্ছিন্ন একটি তালিকা তুলে ধরা হলো।

২০১৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর সুদের কারবারি নাজমা খাতুনের নামে ৯ শতক জমির রেজিস্ট্রি হয়েছে।  জমির দাতার নাম সাখাওয়াত হোসেন,পিতা মৃত আব্দুস সামাদ। এই সাখাওয়াত হোসেন নাজমা খাতুনের কাছে টাকা ঋন নিয়ে শোধ করতে না পেরে তার জমি লিখে দেন। সাখাওয়াত হোসেন মুসলিম পরিবারে জন্ম নিলেও পরবর্তীতে খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেন। বর্তমানে এই সাখাওয়াত হোসেন নাজমা খাতুনের ব্যবসার পার্টনার বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন। সাখাওয়াত হেসেনের দেওয়া ৯ শতক জমির মূল্য ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা। প্রতি শতক ৬০ হাজার টাকা। জমির দলিল নং ৬৩৪১। দলিলে নাজমা খাতুনকে তালাকপ্রাপ্ত হিসেবে বলা হয়েছে।

২০১৬ সালের ৩০ মে উপজেলার বেলাইচন্ডি ইউনিয়নের বেলাইচন্ডি মৌজার সাড়ে ৫২ শতক জমি ৮লাখ টাকায় রেজিস্ট্রি করা হয়। দলিল নং ৩২৫৩। দাতা নরেশ চন্দ্র রায়, গ্রহিতা নাজমা খাতুন।  এ বছরের ২১ আগষ্ট ৫নং চন্ডিপুর ইউনিয়নের ছোট হরিপুর মুন্সিপাড়া মৌজার ২৩ শতক জমি দাতা মোঃ মোশারফ হোসেন মুন্সি গ্রহিতা নাজমা খাতুনকে রেজিস্ট্রি করে দেন। জমির মূল্য ধরা হয়েছে১ লাখ ২০ হাজার টাকা। দলিল নং ৫২০৮। এ বছরের ৩১ অক্টোবর ২নং মনমথপুর ইউনিয়নের রাজাবাসর মৌজার সাড়ে ৪ শতক জমি দলিল হয় ।  দলিল নং ৭০১৩।দাতা মোঃ মাহবুবুর রহমান মুন্সি । গ্রহিতা মোছাঃ নাজমা খাতুনের রড় ছেলে নাদির শাহ নয়ন । জমির মুল্য ধরা হয়েছে ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা । এ বছরের ১১ ডিসেম্বর ছোট হরিপুর মুন্সি পাড়া গ্রামের ২৩ শতক জমি রেজিস্ট্রি হয়। দলিলণং ৮১৯৪ । জমির মুল্য ধরা হয়েছে ১২ লাখ টাকা । দাতা মোঃ মোতালেব হোসেন মুন্সি ও মোঃ রফিকুল ইসলাম । গ্রহিতা মোছাঃ নাজমা খাতুন। নাজমার জাতীয় পরিচয় পত্রানুযায়ী জন্ম তারিখ ২১ মার্চ ১৯৭৫ । 

২০১৭ সালের ২১ মার্চ রাজাবাসর মুন্সিপাড়া গ্রামের ১৫ শতক জমি রেজিস্ট্রি হয় পার্বতীপুর সাব রেজিস্ট্রি অফিসে । দলিল নং ২৭৮১ । জমির দাতা মোঃ মাহবুবুর রহমান মুন্সি । গ্রহিতা মোছাঃ নাজমা খাতুনের বড় ছেলে নাদির শাহ নয়ন ।  নয়নের জন্ম তারিখ ২৯ ডিসেম্বর ১৯৯২ সাল । জমির মুল্য ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা । ২ দিন পরে একই মৌজার ২৪৪ বর্গলিং জমির ওপর নির্মিতএকটি ফ্লাটবাড়ি বিক্রি হয়। বাড়িটির মুল্য ধরা হয়েছে ১০ লাখ টাকা । দাতা ফারুক বিন জামান। গ্রহিতা মোছাঃ নাজমা খাতুন । বাড়ি ও জমির মুল্য ধরা হয়েছে ১০ লাখ টাকা ।ফারুক বিন জামান দাবী করেন তার বাড়ির মুল্য ২৩ লাখ টাকার  বেশি । তিনি নাজমা খাতুনের নিকট থেকে ঋন নিয়ে সুদ আসলে ৫ গুণ বেশি টাকা  পরিশোধ করেছেন । শেষ পর্যন্ত তার ট্রাপে পড়ে এই বাড়িটি তাকে রেজিষ্ট্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছে । 

২০১৭ সালের ১৬ মে মন্মথপুর ইউনিয়নের রাজাবাসর মৌজার ৮ শতক জমি ৪ লাখ ৫০ হাজার  টাকা দাম ধরে দলিল হয় । দলিল নং ৪০৩৪। দাতা মোঃ সুলতান আলী । গ্রহিতা মোছাঃ নাজমা খাতুনের রড় ছেলে  নাদির শাহ নয়ন। 

২০১৭ সালের ১৮ জুলাই পার্বতীপুর সাব-রেজিষ্ট্রেরি অফিসে ৪২ শতক জমির দলিল হয়। দলিল নম্বর ৫৩১৮। দাতা মোঃ মোশারফ হোসেন মুন্সি। গ্রহিতা মোছাঃ নাজমা খাতুন।  জমির মূল্য ধরা হয়েছে ৩০ লাখ টাকা। একই মৌজার ১৯ শতক জমি ২০১৮ সালের ৩১শে জানুয়ারী দলিল সম্পাদিত হয়েছে। জমির মূল্য ধরা হয়েছে ১০লাখ টাকা। দলিল নম্বর ১২২১।  দাতা মোঃ  আফজালুর রহমান। গ্রহিতা মোঃ শাখাওয়াত হোসেন নাজমা খাতুনের ব্যবসায়ীক পার্টনার। জমির দলিল নম্বর ১২৪৩। মৌজা মনমথপুর, পরিমান ৫১ শতক। মূল্য ধরা হয়েছে ৭লাখ ৬০হাজার টাকা।  গ্রহিতা নাজমা খাতুনের বড় ছেলে নাদির শাহ নয়ন। দাতা মোঃ আশরাফুর রহমান মুন্সি।  ২০১৮ সালের ৯ জুলাই মনমথপুর মৌজার ৮৪ শতক জমির রেজিস্ট্রি হয়। দলিল নম্বর ৪৬৬৩। জমির মূল্য ধরা হয়েছে ১২ লাখ ৫০হাজার টাকা। দাতা মোশারফ হোসেন মুন্সি। গ্রহিতা নাজমার নাবালক পুত্র মোঃ নিশাত বাবু। এ বছরের ১ আগস্ট রাজাবাসর মৌজার ৩৩ শতক জমি পার্বতীপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল সম্পাদিত হয়েছে যার নম্বর ৫৮১০। জমির মূল্য ধরা হয়েছে ৮ লাখ ৮৩ হাজার। দাতা মিসেস পারুল রায়। স্বামী মি. বিমল রায়। গ্রহিতা নাজমার নাবালক পুত্র মোঃ নিশাত বাবু। নিশাতের জন্ম তারিখ ২০০৫ সালের ২৯ জানুয়ারি । ২০১৮ সালের ৮ অক্টোবর মনমথপুর মৌজার ৬৪ শতক জমি ৯ লাখ ৫৩ হাজার টাকা দাম ধরে রেজেস্ট্রি হয়েছে। দাতা ছিলেন আশরাফুর রহমান। গ্রহিতা নাজমা খাতুন। দলিল নম্বর৭৮৯৫।  ২০১৯ সালের ১১ ফেব্রয়ারী মনমথপুর মৌজার জেএল নম্বর ৩০ এর ৬ শতক জমি রেজেস্ট্রি করা হয়েছে। জমির দলিল নম্বর ১৩০৭। জমির মূল্য ধরা হয়েছে  ৪ লাখ ৪২ হাজার টাকা। দাতা মোঃ মঞ্জুয়ারা বেগম। স্বামী মৃত মোঃ জাকির হোসেন। বাড়ি মনমথপুর ডাঙ্গাপাড়া। গ্রহিতা শাখাওয়াত হোসেন। পিতা মৃত আব্দুস সামাদ।

উল্লেখিত জমি সমূহের দাতাদের মধ্যে রাজাবাসর মুন্সিপাড়া গ্রামের মোশারফ হোসেন মুন্সি নাজমা খাতুন সম্পর্কে বলেন, সে বর্তমানে জমি, বাড়ি, স্থাবর, অস্থাবরসহ কমপক্ষে ১০ কোটি টাকার মালিক। নাজমা খাতুনের কাছে যারা চক্রবৃদ্ধি সুদ নিয়েছে তারা ৫/৬ গুণ বেশি টাকা পরিশোধ করেও নাজমার কাছে গচ্ছিত রাখা কাগজপত্র ফেরত পায়নি। ওইসব কাগজপত্র অবৈধ অন্যায়ভাবে ব্যবহার করে সে ঋণ গ্রহিতাদের ভয়ভীতি, মামলা মোকদ্দমা এবং সন্ত্রাসীদের দিয়ে চাপ প্রয়োগ করে জোরপূর্বক জমি রেজেস্ট্রি করে নিয়েছে। যাদের নিকট থেকে জমি লিখে নেয়া হয়েছে তারাও নাজমা খাতুনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে মোশারফ হোসেন মুন্সিসহ অন্যান্যরা জানিয়েছেন। 

নাজমা খাতুনের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করলে তিনি এ প্রতিনিধির সাথে পরে কথা বলবেন বলে জানান। পরে  বহুবার তার মোবাইলে কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। এ কারণে তার টাকার উৎস সম্পর্কে জানা সম্ভব হয়নি।

তবে একাধিক ঋণ গ্রহীতা বলেছেন, সোনালী ব্যাংক হুগলীপাড়া শাখা থেকে তার সুদের কারবার স্ফীত হয়েছে। এ ব্যাপারে ব্যাংকটিতে তদন্ত করা হলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে বলে মনে করেন তারা।

সোনালী ব্যাংক হুগলীপাড়া শাখার ম্যানেজার প্রদীপ কুমার রায় বলেছেন, আমি সদ্য এসেছি। তবে নাজমার বিষয়ে অভিযোগ শুনেছি। সত্য মিথ্য বলতে পারবো না।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহানাজ মিথুন মুন্নী বলেন, তাকে আটক করা হয়েছিল। আন্ডার টেকেন নিয়ে ৫০ হজার টাকা ভ্রাম্যমাণ আদালতে জারিমানর পর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। 

প্রসঙ্গত, গত ১৩ জুলাই কালের কণ্ঠ পত্রিকায় ঋণের ফাঁদে ২০শিক্ষক পরিবার শিরোনামে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে দিনাজপুর জজ কোর্টের সিনিয়র আইনজীবি সৈয়দুল আলম শান্তু   বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্তরা আইনের আশ্রয় নিলে প্রতিকার পাবেন। সুদের কারবারি নাজমা খাতুনকে তথ্যপ্রমাণ সহ আটকের পর ভ্রাম্যমাণ আদালতে ৫০ হাজার টাকা জরিমানার পর ছেড়ে দেওয়ার প্রসঙ্গে বলেঞ, এটি বিচারিক আদালতে বিচার্জ বিষয়। 

অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র দায়রা জজ আ ম আবু সাইদ বলেন, যারা ঋণ নিয়ে প্রতারিত হয়েছেন তারা আদালতে মামলা করলে সকলে প্রতিকার পাবেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা