kalerkantho

সোমবার । ১০ কার্তিক ১৪২৭। ২৬ অক্টোবর ২০২০। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

কৃষকের হাতি রোগ!

হায়দার আলী বাবু, লালমনিরহাট   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ২২:৫৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কৃষকের হাতি রোগ!

কৃষক হাতি কিনেছে এটা প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। তাই অনেকদূর থেকে দেখতে এসেছি। আগে গ্রামেগঞ্জে সার্কাস হলে হাতি দেখা যেত, কিন্তু এখন আর তা চোখে পড়ে না। তাই এখানে হাতি দেখে অনেক মজা পেলাম। কথাগুলো বলছিলেন লালমনিরহাট সদর উপজেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের রতিধর গ্রামের দুলাল চন্দ্র রায়ের বাড়িতে উপস্থিত আবু কালাম। 

অজপাড়াগাঁয়ের এক কৃষক তাঁর বাড়িতে হাতি কিনে এনেছেন—এই খবরের সত্যতা যাচাইয়ে পাকা সড়ক, ইটবাঁধানো রাস্তা আর মেঠোপথ পাড়ি দিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেল এলাহি কাণ্ড। শিশু, বৃদ্ধ, তরুণ-যুবক, নারী-পুরুষ সব শ্রেণির মানুষ সেখানে উপস্থিত হস্তী দর্শনে। দুলাল চন্দ্রের বাড়িতে হাতি আনার পর থেকেই দিন দিন যেন বাড়ছে মানুষের সমাগম। আমার মতো অনেকেই এসেছেন শোনা কথা ঠিক কি না তা যাচাই করতে। 

দুলালের প্রতিবেশী অনিল চন্দ্র এ প্রতিবেদককে বললেন, ‘শুনেছি ভগবান ওদের হাতি কিনতে বলায় তা কিনে আনা হয়েছে। এর আগে খরগোশ, রামছাগল, ঘোড়া কিনেছে। হাতি কেনার নির্দেশ না মানলে যদি কোনো ক্ষতি হয় সে জন্যই সেটি কিনে এনেছেন তাঁরা।’ 

হাতির রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিত মাহুত ইব্রাহিম মিয়া বলেন, ‘হাতি কিনে আনার সময় আমাকেও নিয়ে আসা হয়েছে। খাওয়া-দাওয়াসহ আমার বেতন ১৫ হাজার টাকা। হাতিটি দেখতে এই বাড়িতে অনেক মানুষ আসছে, এটা দেখে ভালো লাগছে। তবে হাতি দিয়ে তিনি (দুলাল) এখন কী করবেন সেটা আমি জানি না।’

পরিবারটির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সপ্তাহখানেক আগে মৌলভীবাজার জেলার আব্দুল করিমের কাছ থেকে সাড়ে ১৬ লাখ টাকায় কেনা হয়েছে হাতিটি। পরিবহনসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় হয়েছে আরো এক লাখ টাকা। সব মিলিয়ে হাতির দাম দাঁড়িয়েছে সাড়ে ১৭ লাখ টাকা। বর্তমানে হাতিকে কলাগাছ, ভুসি, কলাসহ বিভিন্ন জিনিস খাওয়ানো হচ্ছে। জানা গেছে, হাতি কেনার খরচ জোগাতে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ১১ বিঘা জমির দুই বিঘা বিক্রি ও এক বিঘা বন্ধক রাখতে হয়েছে দুলাল-তুলসী দম্পতিকে। এ ছাড়া বিক্রি করতে হয়েছে দুটি গরু ও কিছু গাছ। এর আগে জমি বিক্রি করে ঘোড়া কিনেছিলেন তাঁরা।

এদিকে স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর—স্বামী বিবেকানন্দের এই মহৎ বাণী অনুসরণে আসলে হাতি পালনে উদ্যোগী হননি কৃষক দুলাল চন্দ্র রায় ও তুলসী রানী দম্পতি। এর মাধ্যমে তাঁরা মানুষকে বোকা বানিয়ে আর্থিক সুবিধার ধান্দা করছেন আসলে।

এ প্রসঙ্গে তুলসী রানী বলেন, ‘কালীমাতা আমার গাঁয়ে এসে কথা বলেন। তাঁর আশীর্বাদেই শনি ও মঙ্গলবার আমি দৈবযোগে মানুষের সমস্যার সমাধান করি। তাঁরা যা দেন, তা-ই গ্রহণ করি।’

তুলসীর স্বামী দুলাল চন্দ্র রায় বলেন, ‘সৃষ্টিকর্তার নির্দেশেই আমরা সব কিছু করে থাকি। তিনি এবার হাতি কেনার নির্দেশ করায় আমরা তা পালন করেছি।’ এই হাতি দিয়ে এখন কী করবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে তিনি এখনো কোনো নির্দেশনা দেননি। সৃষ্টিকর্তা যা বলবেন তাই করব। আর তা না হলে বাড়িতেই এটি পুষব।’ হাতি পোষার ব্যয় মেটানোর প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটা সৃষ্টিকর্তাই ব্যবস্থা করে দিবেন।’

হাতি পোষার জন্য সরকার থেকে লাইসেন্স ও পজিশন সার্টিফিকেট নিয়েছেন কি না জানতে চাইলে দুলাল চন্দ্র বলেন, ‘যার কাছ থেকে হাতি কিনেছি তিনি তাঁর লাইসেন্সের ফটোকপি ও স্ট্যাম্পে আমাকে লিখে দিয়েছেন। আমাকেও লাইসেন্স করতে হবে সেটা জানা ছিল না। তবে বন বিভাগ আমাকে ফোন করে লাইসেন্সের জন্য অফিসে যেতে বলেছে।’ 

লালমনিরহাট জেলা বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নুরন নবী গতকাল রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হাতি কেনার বিষয়টি কিছুক্ষণ আগে জানতে পেরে দুলাল চন্দ্রের সঙ্গে কথা বলে তাঁকে অফিসে আসতে বলেছি। তিনি আগামীকাল (বুধবার) অফিসে এসে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করলে কাগজপত্র ঢাকায় পাঠানো হবে।’

লালমনিরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উত্তম কুমার বলেন, ‘একজন কৃষক হাতি কিনে এনেছেন জানার পর আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।’ 

হাতি পালনে সরকারি বিধি
পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের ২০১৭ সালের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, লাইসেন্স ও পজিশন সার্টিফিকেট ছাড়া কেউ হাতি পালন করতে পারবে না। লাইসেন্সের জন্য ২০ হাজার, প্রসেস ফি দুই হাজার ও পজিশন ফির জন্য পাঁচ হাজার টাকা প্রদান করতে হবে। এ ছাড়া প্রতি বছর লাইসেন্স ও পজিশন সার্টিফিকেট নবায়ন ছাড়াও হাতি পালনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। আর লাইসেন্সপ্রাপ্ত কেউ হাতিকে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া বিক্রি, হস্তান্তর বা দান করতে পারবে না।

এদিকে হাতি পালন বিষয়ে প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, নিজস্ব মালিকানা, ভাড়া বা সরকারের কাছ থেকে দীর্ঘ মেয়াদি ইজারামূলে প্রাপ্ত ভূমির দখল থাকতে হবে। লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে চারণ সার্টিফিকেট গ্রহণ ব্যতিরেকে সরকারি বনাঞ্চলে হাতি চারণ করা যাবে ন। প্রত্যেক হাতির কানে লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নির্ধারিত মূল্যে ট্যাগ কিনে স্থানীয় বন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে সেটা দিয়ে চিহ্নিত করতে হবে। বাচ্চা প্রসবের ৯০ দিনের মধ্যে বাচ্চা হাতির কানেও ট্যাগ লাগিয়ে চিহ্নিত করতে হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা