kalerkantho

বুধবার । ৫ কার্তিক ১৪২৭। ২১ অক্টোবর ২০২০। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী লোপাটসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ

গোমস্তাপুর ইউএইচএফপিও’র বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়

আহসান হাবিব, চাঁপাইনবাবগঞ্জ    

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ২২:০৬ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



গোমস্তাপুর ইউএইচএফপিও’র বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়

করোনাকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী লোপাটসহ নানা অনিয়ম ও দুনীর্তির গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। করোনাকালে সিএইচসিপি ও স্বাস্থ্য সহকারীদের বরাদ্দের সুরক্ষা সামগ্রী লোপাট এবং করোনা রোগী ভর্তি না করেও হাসপাতালে ভর্তি দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, ভেষজ গাছ কেটে বাগান তৈরি, হোম কোয়ারেন্টিনে সুস্থ হওয়া করোনা রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি দেখিয়ে থোক বরাদ্দর টাকা আত্মসাৎ, বরাদ্ধকৃত ছয় শ পিপিই বিক্রি করে ১২ লাখ আত্মসাৎ, এসি মেরামতের নামে কোটেশন দেখিয়ে ২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা আত্মসাৎসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিভিন্ন দপ্তরে প্রেরিত লিখিত অভিযোগ থেকে পাওয়া যায় এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য।

এ ছাড়াও জঙ্গি মামলার আসামি ও নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগে বরখাস্তকৃত দুই উপ-সহকারীকে কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসারকে আইন লঙ্ঘন করে টাকার বিনিময়ে স্বপদে বহাল, সরকারি গাড়ির অপব্যবহার, স্টাফদের বিরুদ্ধে মিথ্যে অভিযোগে বদলি, হুমকি-ধামকি, টেন্ডার ছাড়াই আম ফলবিক্রিসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগও উঠে আসে।

গোমস্তাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ সারওয়ার জাহান সরকারিভাবে নিজ অফিস কক্ষ ও বাসভবনে এসি ব্যবহারের অনুমতি না থাকলেও হাসপাতালের ওটি, এক্সরে ও আল্ট্রাসনোগ্রাফি রুম থেকে ৫টি এসি খুলে নিজ অফিস কক্ষ, বাসভবন, ডাক্তারদের রেস্টরুম ও আরএমও’র রুমে এসব এসি প্রতিস্থাপন করেন।

ডা. সারওয়ার জাহান গত ফেব্রুয়ারি মাসে গোমস্তাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদানের পর থেকেই তার স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজেকে জড়িয়েছেন একের পর এক অনিয়ম ও দুর্নীতিতে।  আর এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগও করেছেন বঞ্চিত সিএইচসিপি, স্বাস্থ্য সহকারী, হাসপাতালের আবাসিক চিসিৎক এবং এলাকাবাসী।

গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর বাজারের ইউনুস আলী মাস্টার কেন্দ্রে স্বাস্থ্য সহকারীদের সুরক্ষা সামগ্রী ছাড়াই করোনাকালে শিশুদের টিকা প্রদান করতে দেখেন এলাকাবাসী। একই চিত্র কাজীহাটাসহ উপজেলার ৩৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকের। যেখানে সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়েই সেবা দেন সিএইচসিপি ও স্বাস্থ্য সহকারীরা।

কাজীহাটা কমিউনিটি ক্লিনিকে শিশুদের টিকা প্রদান করতে সিএইচসিপি সদস্যদের মধ্যে কয়েকজন জানান, করোনাকালে সরকারের দেওয়া স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী (বরাদ্দকৃত ৫টি পিপিই, ১০ টি মাস্ক, ২০টি গ্লোভস, হ্যান্ড স্যানিটাইজার)) বার বার চাওয়া হলেও তা দেননি ডা. সারওয়ার জাহান।

এসব অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্তের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ হেলথ অ্যাসিসটেন্ট ও উপজেলা সিএইচসিপি অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা। গোমস্তাপুর উপজেলা সিএইচসিপি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আহম্মেদ রুশদি জানান, করোনাকালে আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এখন পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছি। অথচ জেলার অন্যান্য উপজেলা বরাদ্দকৃত সুরক্ষা সামগ্রী পেলেও আমরা পাইনি। এ বিষয়ে আমরা বার বার ইউএইচএফপিও ডা. সারওয়ার জাহান, সিভিল সার্জন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অবহিত করলেও এখন পর্যন্ত তা পাইনি। আমরা চাই এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত।

বাংলাদেশ হেলথ অ্যাসিসটেন্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি নিয়ামতুল্লাহ জানান, ‘সুরক্ষা সামগ্রী ছাড়া শিশু ও মহিলাদের টিকা প্রদান করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এ অবস্থায় আমাদের বরাদ্দকৃত সুরক্ষা সামগ্রীর জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বার বার বলার পরও তা দেননি। অথচ আমরা জানতে পেরেছি আমাদের নামে ঠিকই বরাদ্দ এসেছে।

অভিযোগে জানা যায় মার্চ-এপ্রিল মাসে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের ৬/৭টি সেকশন, কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি এবং অনুদানকৃত পিপিই মিলিয়ে ৬০০’র অধিক পিপিই তিনি লোপাট করেছেন। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ ওই সময় বাজারে পিপিই সরবরাহ কম এবং চাহিদা বেশি থাকায় প্রতিটি পিপিই’র মূল্য ন্যূনতম  দুই হাজার টাকা করে হলেও ৬০০ পিপিইর বাবদ ১২ লাখ টাকা এবং অন্যান্য সুরক্ষা সামগ্রী থেকে আরো প্রায় ৫ লাখ টাকা তিনি আত্মসাৎ করেছেন।

হোম কোয়ারেন্টিনে সুস্থ হওয়া করোনা রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি দেখিয়ে থোক বরাদ্দের ৩ লাখ টাকা আত্মসাতের এর সত্যতাও নিশ্চিত করেছেন হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও)। আর এ ধরনের ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন রোগীরা।

আরএমও ডা. সালাহ উদদীন আহম্মেদ জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে নিজের ভাবমূর্তি তুলে ধরতে, হোম কোয়ারেন্টিনে সুস্থ হওয়া করোনা আক্রান্ত রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি দেখিয়ে বরাদ্দকৃত ৩ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করে ডা. সারওয়ার জাহান। কাগজে কলমে হাসপাতালে রোগী ভর্তি দেখানো হলেও বাস্তবে কোনো করোনা রোগী হাসপাতালে ভর্তিই ছিল না।

ভর্তি দেখানো করোনা রোগীদের কয়েকজন হাসপাতালের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তারা হোম কোয়ারেন্টিনে সুস্থ হয়েছেন। কখনোই তারা হাসপাতালে ভর্তি হননি এবং কোনো ধরনের সেবা নেননি। তারা বলেন, কিভাবে হাসপাতালের অফিস প্রধান করোনা পজিটিভ রোগীকে নিয়ে এ ধরনের মিথ্যা, জালিয়াতি রির্পোট প্রদান করেন। আমরা অনিয়ম-দুর্নীতির আমরা বিচার চাই।

শুধু সুরক্ষা সামগ্রীই নয় ডা. সারওয়ারের স্বেচ্ছাচারিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির প্রমান মেলে ফুলের বাগান গড়তে ধ্বংস করেছেন হাসপাতালের সরকারি ভেষজ বাগানও। যেখানে ছিল মূল্যবান হরতকি, শতমূলী, বহেড়া, আসামলতা, নাগফনীসহ প্রায় ৫০ জাতের ঔষধি গাছ। তিনি কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই সেসব গাছ কেটে ধ্বংস করেছেন।

বাগানের দায়িত্বে থাকা হারবাল আসিসটেন্ট তরিকুল ইসলাম জানান, ‘১৭ বছর ধরে গড়ে তোলা ভেষজ বাগানটি অসৎ উদ্দেশ্যে একক ক্ষমতাবলে ধ্বংস ফুলের বাগান গড়ে তুলেন। উল্টো তিনি আমাকে বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জিজ্ঞেস করলে মিথ্যে দিয়ে বলবে, আম্পান ঝড়ে ভেষজ বাগান ভেঙে গেছে। আমি আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এএমসিকে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য।

আর হাসপাতালের আরএমও ডা. সালাহ উদদীন আহম্মেদ জানান, হাসপাতালের সীমানা প্রাচীরের ভেতর চমৎকার একটি ভেষজ বাগান ছিল। অথচ ফুলের বাগান গড়তে কাউকে না জানিয়ে সরকারি ভেষজ বাগানটি ধ্বংস করেন ইউএইচএফপিও। তিনি বলেন, ভেষজ বাগানটি ধ্বংস না করে অন্য জায়গায় ফুলের বাগান তৈরি করা যেত। ভেষজ বাগানটি রক্ষা করা বেশি প্রয়োজনীয় ছিল ফুলের বাগানের চাইতে।

এ বিষয়ে ডা. সালাহ উদদীন জানান, ডেল্টাল চেয়ার, ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাফি, এসি প্রভৃতি মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি মেরামত করার জন্য ‘নিমিউ’ এবং‘ গণপূর্ত’ নামক সরকারি প্রতিষ্ঠান আছে। তারাই নিধার্রণ করবে কোন যন্ত্রটি নষ্ট এবং কোনটি ঠিক আছে। এক্ষেত্রে তিনি সরকারি আদেশ অগ্রাহ্য করে নিজেই অর্থ আত্মসাৎতের জন্য অবাস্তব এই কোটেশন করেন এবং বিল ভাউচারে আমাকে সাক্ষর করতে বললে আমি তা করিনি। পরবর্তীতে তিনি আমাকে কোটেশন কমিটি থেকে বাদ দিয়ে তার পছন্দের লোককে কমিটির সদস্য বানিয়ে ২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন।

ডা. মোহাম্মদ সারওয়ার জাহান এর বিরুদ্ধে জঙ্গি মামলার আসামি ফারিকুল ইসলাম (জঙ্গিবাহিনী আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য। ফৌজদারি মামলা চলমান এবং দুই দফায় জেলও খেটেছেন) ও নির্বাচনে অনিয়মের দায়ে আব্দুস সামাদ নামে সাময়িক বরখাস্তকৃত দুই উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসাকে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে টাকার বিনিময়ে স্বপদে বহাল করারও গুরুতর অভিযোগ উঠে। ফারিকুল ও আব্দুস সামাদ এর কাজে যোগদানের বিষয়টি সিভিল সার্জন ও ডা. সারওয়ারের মৌখিক নির্দেশেই হয় বলে জানা যায়।

ডা. সরওয়ার জাহান তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সকল কার্যক্রমই সিভিল সার্জনকে জানানো হয় এবং তার নির্দেশেই আমি এ সকল কাজ করেছি। তিনি বলেন, যেহেতু আমার বিরুদ্ধে যারা যেসব অভিযোগ করেছে তা আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তদন্ত করছেন। সিভিল সার্জন তদন্ত করছে তার সাথে কথা বলেন। আমি আর এসব নিয়ে কথা বলতে চাই না।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সিভিল সার্জন ডা. জাহিদ নজরুল চৌধুরী গোমস্তাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে জানান, তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। শিগগিরই এসব বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা