kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৪ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১১ সফর ১৪৪২

ওপরে শাপলা, নীচে কই খলিশার ছোটাছুটি

রফিকুল ইসলাম, বরিশাল   

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১০:৩৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ওপরে শাপলা, নীচে কই খলিশার ছোটাছুটি

পিচঢালাই সড়কের দু’ধারে শাপলা-বোনা বিল। ইতিউতি শালুক, সঙ্গে জল মাকড়সার সাঁতার। টলটেল জলের তলে শিং কৈ-দের এদিক সেদিক ছোটাছুটি। তখনও অন্ধকার সরিয়ে বিলের জলে আলো পৌঁছায়নি। সূর্যশূন্য ভোর, পর্যটকরা ছুটছেন শাপলা বিলের সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে। আর মাছের দল চাইছে মাকড়সা দিয়ে সকালের নাস্তাটা সারতে। তবে স্থানীয়রা চাইছেন ফাঁদে থেকে মাছের দলকে ডাঙায় তুলতে। সকলের কর্মকাণ্ড বিলে পোতা ভাঙা ডালে বসে এক দৃষ্টিতে দেখছে নিঃসঙ্গ পানকৌড়ি। 

বলছিলাম, সাতলা বিলের প্রকৃতির কথা। যেটি জাতীয় ফুল শাপলার বাহারি সৌন্দর্যের কারণে লাল শাপলা বিলে পরিচিতি পাচ্ছে। বিলের দূর থেকে মনে হবে লাল আর সবুজের মাখামাখি। কাছে গেলে ধীরে ধীরে সবুজের পটভূমিতে লালের অস্তিত্ব আরো গাঢ় হয়ে ধরা দেবে। চোখ জুড়িয়ে দেবে লাল শাপলার বাহারি সৌন্দর্য। সূর্যের সোনালী আভা শাপলাপাতার ফাঁকে ফাঁকে পানিতে প্রতিফলিত হয়ে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে বিলের সৌন্দর্য। 

বরিশাল সদর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে উজিরপুর উপজেলার সাতলা ইউনিয়নের উত্তর সাতলা গ্রাম। গ্রামের নামেই বিলের নাম, সাতলা বিল। তবে শাপলার রাজত্বের কারণে সেটি এখন শাপলা বিল নামেই বেশি পরিচিত। ইতিমধ্যে বরিশালের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিলের কথা ছড়িয়ে পড়েছে অন্যান্য স্থানে। বিশেষ করে শহরে ইট-পাথরের বন্দি জীবন কাটানো মানুষ প্রশান্তির আশায় ছুটে আসেন এ বিলে। শীত মৌসুমের আগেই পর্যটকের ভিড় বেড়েছে এই বিলে।

অস্তিত্ব সংকটে শাপলা বিল
উজিরপুরের সাতলা এবং পাশের আগৈলঝাড়া উপজেলার বাগধা ইউনিয়নের বাগধা ও খাজুরিয়া গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে বিছিয়ে আছে শাপলার বিল। বিলে ঠিক কত আগে থেকে এভাবে শাপলা জন্মাতে শুরু করেছে, সে তথ্যও দিতে পারেনি স্থানীয়রা। বিলের সঠিক আয়তন জানা নেই কারো। তবে স্থানীয়দের মতে, প্রায় ২০০ একর জমির ওপর প্রাকৃতিকভাবে বিলটি গড়ে উঠেছে। স্থানীয়দের অনেকে জীবিকার জন্য বছরের একটা বড় সময় বিলের মাছ ও শাপলার ওপর নির্ভরশীল।

আগৈলঝাড়া উপজেলার বাগধা ইউনিয়নের বাগধা ও খাজুরিয়া গ্রামের বিস্তীর্ণ বিলজুড়ে যে শাপলা ছিল, তা সংকুচিত হয়ে এসেছে। বিলে মাছ চাষের কারণে শাপলা তুলে ফেলা হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাগধায় এখন লাল শাপলা নেই বললেই চলে। ওই এলাকার সুনীল হালদার মুঠোফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, তার তিন একর জমি ছিল। এই মৌসুমে লাল শাপলা জন্মতো। শাপলা বিক্রি করে স্থানীয়রা সংসার চালাতো। কিন্তু জমির মালিক হিসেবে তিনি কিছুই পেতেন না। তাই এই মৌসুমে তিনি বারো হাজার টাকায় জমি ইজারা দিয়েছেন। 

পূর্ব সালতার পটিবাড়ী এলাকায় ৮ সেপ্টেম্বর ভোরে গিয়ে দেখা যায়, কালভার্ট লাগোয়া বিশাল মাছের ঘের। কয়েক বছর আগে সেখানে শাপলার বিল ছিল। কিন্তু প্রভাবশালীরা সেখানে শাপলার তুলে মাছের ঘের করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয়রা জানান, প্রতিবছর শাপলার বিল গিলে খাচ্ছে মাছ চাষিরা। কারণ এই বিলাঞ্চলের বাসিন্দাদের আয়ের একমাত্র উৎস মাছ চাষ। তাই নামমাত্র মূল্যে জমি ইজারা নিয়ে শাপলার বিল ধ্বংস করে ঘের বানানো হচ্ছে। 

নৌকায় পর্যাটকদের নিয়ে ভোরে ঘুরে বেড়ান শংকর রায়। সুর্য্য ওঠার পরে নৌকার করে শাপলা তুলে বাজারে বিক্রি করেন। বিকেলে ছোট ডিঙি নৌকা নিয়ে প্রতিদিনই বিলের পানিতে মাছ ধরেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রতিদিন প্রায় ৩০০ বড়শি পেতে তিনি মাছ ধরেন। কই, খলিশা, টাকি, শোল, পুঁটিসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরা পড়ে। মাছ বিক্রি করে দিনে প্রায় ৪০০ টাকা আয় হয় তার। আর ১৫ থেকে ২০টি শাপলার একটি আঁটি তিন থেকে পাঁচ টাকায় বিক্রি হয়। শাপলা বিক্রি করে দিনে তার প্রায় ২০০ টাকা আয় হয়। 

এক যুগের বেশি সময় ধরে এ বিল নিয়ে কাজ করছেন আরিফুর রহমান। পেশায় সংবাদকর্মী হলেও শখ তার ঘুরে বেড়ানো। সঙ্গে করে পর্যটক নিয়ে বিলে তার আসা-যাওয়া নিয়মিত। ৮ সেপ্টেম্বর তিনি পর্যটক নিয়ে বিলে এসেছিলেন। বিলেই তার সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের সঙ্গ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকারি উদ্যোগে শাপলার বিল সংরক্ষণ করা যায়। সেক্ষেত্রে এই বিলের বড় একটা অংশ সরকার অধিগ্রহণ করতে পারে। তাছাড়া যোগাযোগব্যবস্থার পাশাপাশি পর্যটকদের রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা করা হলে বিলের পরিচিতি আরো বেড়ে যাবে। তখন পর্যটকদের ঢল নামবে, তাতে করে অর্থনীতির চাকা আরো সচল হবে। 

জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, শাপলা বিল যাতে পর্যটন স্পট হিসেবে গড়ে ওঠে, তার প্রস্তাবনা পাঠানো আছে। সেটি বাস্তবায়িত হলে শাপলা বিল সংরক্ষিত হবে। পাশাপাশি পর্যটন স্পট হিসেবে সাতলায় উন্নয়নের ছোয়ায় এলাকার গোটা জীবনধারা পাল্টে যাবে। তখন স্থানীয়রা শাপলার বিল ধ্বংস না করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিজেরাই নিবেন। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শাপলা ধ্বংস করে মাছ চাষ কমে আসবে, বিকাশিত হবে শাপলার বিল।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা