kalerkantho

বুধবার । ৮ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৫ সফর ১৪৪২

মির্জাপুর-ওয়ার্শী-বালিয়া সড়কে ধস, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি   

১৪ আগস্ট, ২০২০ ১৯:৪৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মির্জাপুর-ওয়ার্শী-বালিয়া সড়কে ধস, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

টাঙ্গাইলের মির্জাপুর-ওয়ার্শী-বালিয়া আঞ্চলিক সড়কের উত্তর রোয়াইল ব্রিজের সংযোগ সড়ক ধসে পড়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে প্রথমে ফাটল ধরে এবং পরে সড়কটি ধসে পড়ে। এতে উপজেলা সদরের সাথে দক্ষিণ মির্জাপুরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া পুরো সড়কটি খানাখন্দকে পরিণত হয়েছে। এতে ঢাকা ও মানিকগঞ্জের সাথে মির্জাপুরের সরাসরি বিকল্প যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

মির্জাপুর-ওয়ার্শী-বালিয়া আঞ্চলিক সড়কটি উপজেলার দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির ফসল। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকাকালীন অর্থমন্ত্রী ড. এর আর মল্লিক মির্জাপুর ওয়ার্শী বালিয়া সড়কটি নির্মাণের উদ্যোগ নেন। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট ঘাতক বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করায় সড়কটি নির্মাণ বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে সড়কটি নির্মাণের উদ্যোগ নেন। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে তা বন্ধ করে দেন। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে সড়কটি নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেন। ২০১১ সাল থেকে সড়কটি নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ২০১৭ সালের জুন মাসে শেষ হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গত ২০১১ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়ে মির্জাপুর উপজেলা সদর থেকে ওয়ার্শী হয়ে মানিগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়া পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার পাকা সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এরমধ্যে মির্জাপুর অংশে ৯.১২ কিলোমিটার এবং মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার অংশে ২.৮৮ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এই সড়কটির জন্য জমি অধিগ্রহণসহ নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১শ' ১১ কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে টাঙ্গাইল ও মানিকগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এর ফলে উপজেলার দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান হয়। সড়কটি চালু হওয়ার পর ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানবাহনের চাপ অনেক কমে যায়। যানজটপ্রবণ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিকল্প সড়ক হিসেবেও এই সড়কটি গুরুত্ব বহন করে। ঢাকা ও মানিকগঞ্জ সড়কের শত শত যানবাহন এই সড়ক দিয়ে চলাচল করে থাকে।

সড়কটি নির্মাণের জন্য কয়েকটি গ্রুপে টাঙ্গাইল ও ঢাকার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব পায়। প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে প্রায় ১৯ জন ঠিকাদার ১৩টি কালভার্ট ৫টি ব্রিজ ও মাটি ভরাটসহ সড়ক নির্মাণের কাজ করেন। ওইসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দরপত্র অনুযায়ী সড়ক নির্মাণের কাজ করেনি বলে সড়কটি উদ্বোধনের ৯ মাসের মাথায় নির্মাণ কাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠে। এ ছাড়া এলাকাবাসী সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. একাব্বর হোসেন এমপির কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। সড়কটি নির্মাণে অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে ওই সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদটি স্থানীয় এমপিসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আসে।

পরবর্তীতে সংসদীয় কমিটি সভা করে বিষয়টি তদন্তের জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। গঠিত কমিটি ২০১৮ সালের ২০ মার্চ সরেজমিন মির্জাপুর-ওয়ার্শী-বালিয়া সড়কটির তদন্তে আসেন। সেই সময় ওই সংসদীয় তদন্ত কমিটি অনিয়মের সত্যতা পায়।

তদন্ত কমিটি এই আঞ্চলিক সড়কটি তদন্তে এসে সড়ক নির্মাণে অনিয়মের সত্যতা পেয়েছেন বলে কমিটির প্রধান নাজমূল হক প্রধান তখন সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন।

এ বছর দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় মির্জাপুরের এই সড়কটিসহ সব আঞ্চলিক সড়কের বিভিন্ন অংশ পানিতে নিমজ্জিত হয়। পানির প্রবল স্রোতে সড়কের উপজেলা সদরের পোষ্টকামুরী, রাজনগর, ঘুঘি, উত্তর রোয়াইল অংশসহ বিভিন্ন অংশে ভাঙন ধরে। বন্যার পানি কমার ফলে সড়কে ভাঙন ও ক্ষত চিহ্ন দেখা দেয়। দুর্ভোগ বাড়তে থাকে এই সড়ক দিয়ে চলাচলকারী মানুষের। সড়ক পথে চলতে গিয়ে মানুষ এখন বিকল্প হিসেবে নৌকা ব্যবহার করছে। এতে সময় লাগছে বেশি এবং বারতি টাকাও খরচ হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার বিকেলে সড়কটির উত্তর রোয়াইল ব্রিজের দক্ষিণ পাশে নিচ থেকে মাটি ধসে প্রায় ত্রিশ ফুট পাকা সড়ক ভেঙে গেছে। এতে ওই সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ব্রিজটির ওপর দিয়ে মানুষ পায়ে হেঁটেও চলাচল করতে পারছে না। ব্রিজের নিচে খালে প্রবল স্রোত প্রবাহিত হওয়ায় ব্রিজটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া ব্রিজের পাশে মিনুর রহমান, হারাধন সরকার, আফাজ উদ্দিন ও ফজল হকের বাড়ি হুমকির মুখে পড়েছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া সড়কটির বিভিন্ন স্থানে যানবাহন উল্টে প্রতিদিন ঘটছে দুর্ঘটনা।

উত্তর রোয়াইল গ্রামের মিনুর রহমান ও হারাধন সরকার বলেন, সকালে ব্রিজের দক্ষিণ পাশের সংযোগ সড়কে ফাটল দেখা যায়। পরে আস্তে আস্তে সড়কটি ধসে পড়ে।

ওই সড়কে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালক আশিষ, রুবেল, মজিবর, সনজিত, মুক্তার, সবির বলেন, রাস্তাটি ভাঙনের ফলে চলাচলে খুবই কষ্ট হচ্ছে। আমাদের আয়ের পথ এখন বন্ধই হয়ে গেছে।

সিএনজিচালক মুক্তি মিয়া, শহিদুল ও আলমগীর হোসেন জানান, আমরা যাত্রী নিয়ে ধামরাই, সাটুরিয়া, মানিকগঞ্জ, নবীনগর, নাগরপুরসহ দক্ষিণে বিভিন্ন স্থানে চলাচল করে থাকি। সড়কটির পোষ্টকামুরী, ঘুঘী ও উত্তর রোয়াইল নামক স্থানে ভাঙন থাকায় মির্জাপুর সদরের সাথে সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এ ছাড়া তাদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে সড়ক মেরামতের জোর দাবি জানান।

ওয়ার্শী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. ফরহাদ মিয়া ও আওয়ামী লীগ নেতা শাজাহান মিয়া জানান, সড়কটি নির্মাণকাজ নিম্নমানের হওয়ায় অল্প দিনেই বিভিন্ন স্থানে ধসে যাচ্ছে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের মির্জাপুর অফিসের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. এনামুল কবির বলেন, মির্জাপুর-ওয়ার্শী-বালিয়া আঞ্চলিক সড়কের বিভিন্ন স্থানে ধসে যাওয়ার কথা তিনি শুনেছেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সড়কটি পরিদর্শনে আসবেন বলে তিনি জানান।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা