kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৬ আশ্বিন ১৪২৭ । ১ অক্টোবর ২০২০। ১৩ সফর ১৪৪২

পাখির কারণেই গ্রামের নাম 'বক পাড়া'

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি   

৮ আগস্ট, ২০২০ ১৮:৪৩ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পাখির কারণেই গ্রামের নাম 'বক পাড়া'

গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে হেঁটে যেতে হাজারো পাখির কলকাকলি যেকোনো পথচারীর মনোযোগ কাড়বে। সূর্য ওঠার আগে থেকে শুরু হওয়া এই পাখির কিচিরমিচির সন্ধ্যায় আরো বেড়ে যায়। একটু দূরে তাকালেই চোখে পড়বে মেঠো পথের ধারে খালপাড়ে বেড়ে ওঠা বিশাল এক তেঁতুল গাছ জুড়ে বসেছে হাজারো বক পাখির মেলা। প্রথম দেখায় মনে হবে সাদা কাশফুল যেন ছড়িযে ছিটিয়ে আছে পুরো গাছটি জুড়ে। এ ছাড়া আশপাশের আরো কয়েকটি গাছের ডালে রয়েছে বক আর পানকৌড়ির দৃষ্টিনন্দন সহঅবস্থান। ধবল বক আর কালো রংয়ের পানকৌড়ির এমন সরব উপস্থিতি যে কারোর মাঝেই মুগ্ধতা নামায়।

প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই এই গ্রামটিতে বসে এমনি হাজারো পাখির মেলা। গ্রামবাসীদের সতর্ক নজরদারী আর তাদের ভালোবাসায় ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে টিকে রয়েছে এই দুই প্রজাতির পাখির এমন বর্ণাঢ্য উপস্থিতি।

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার বক পাড়া গ্রামের পাশ দিয়ে চলে গেছে ইছামতি নদী। কাগজে-কলমে কিংবা সরকারি নথিতে বক পাড়া নামে কোনো গ্রামের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া না গেলেও গ্রামটি এ নামেই সকলের কাছে পরিচিত।

এই গ্রামের প্রবীণ কৃষক আলতাফ হোসেন জানালেন, ব্রিটিশ আমলে গ্রামটির প্রাচীন নাম ছিল নটি হরিনা। এরপর কাগজে-কলমে গ্রামটি চর গোবিন্দপুর হিসেবে নামকরণ করা হয়। কিন্তু বর্তমানে এলাকাবাসীর কাছে এই গ্রামটি বক পাড়া হিসেবেই পরিচিত। এলাকার অনেকেই এখন এই গ্রামটিকে গোবিন্দপুর নামে চিনতে পারে না। আর বক পাড়া গ্রামের নামকরণ করা হয়েছে শুধুমাত্র এই বক পাখিদের উপস্থিতির কারণেই।

এই গ্রামের মৃত নূর মুহম্মদ হাজীর বিশাল বাড়ি জুড়েই বসেছে এই বক আর পানকৌড়ির মেলা। তার ছোট ছেলে জেলহক জানালেন, প্রায় ২০০ বছর ধরেই তাদের এই বাড়িতে বক আর পানকৌড়ির অবস্থান। প্রতি বছর চৈত্র মাসের দিকে ঝাঁক বেঁধে পাখিরা এসে অবস্থান নেয় তাদের বাড়ির তেঁতুল, বইন্যা, কড়ি আর পাইয়া গাছে। প্রায় ছয় মাস এখানে কাটিয়ে শীত মৌসুমের আগে অর্থাৎ আশ্বিন মাসের দিকে এসব পাখিরা দল বেঁধে অন্য কোথাও উড়াল দিয়ে চলে যায়। তার মতে চার পুরুষের বেশি সময় ধরে তাদের বাড়িতে অবস্থান নিয়েছে এই পাখির দল।

তার বড় ভাই সাবেক ইউপি সদস্য আলী আকবর জানালেন, ৮২ শতক জায়গার উপরে তাদের এই বাড়িতে এক সময় আরো বেশ কয়েকটি ছাতিম গাছ ছিল। এই গাছ গুলোতে এসে বসতো শত শত পাখি। কিন্তু তাদের পরিবারের লোক সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ১৫ বছর আগে এই ছাতিম গাছগুলো কেটে ফেলা হয় এখন সেখানে ঘর তোলা হয়েছে। তবে পাখির সংখ্যা খুব একটা কমেনি। বর্তমানে পাখিগুলো একটি বিশাল তেঁতুল গাছ ছাড়াও কড়ি, বইন্যা এবং পায়া গাছে আশ্রয় নিয়েছে।

তিনি জানালেন, তার বাবা মৃত্যুর আগে তাদের নির্দেশ দিয়ে গেছেন তেঁতুল গাছটা যেন কাটা না হয়। নানা সমস্যা হলেও আমরা গাছটি না কেটে বাবার কথা রেখেছি।

জেলহকের স্ত্রী বিউটি বেগম জানালেন, ঝড়ের দিন কিংবা দমকা বাতাস বইতে থাকলে গাছগুলো থেকে টুপটাপ করে অনেক বক মাটিতে পড়ে আহত হয়। কিন্তু আমরা এই পাখিগুলোকে শুশ্রুষা করে ছেড়ে দিই। একটি পাখিও শিকার করি না। ভরা জোসনা রাতে গাছের দিকে তাকালে মনে হয় গাছ জুড়ে যেন থোকা থোকা সাদা গোলাপ ফুল ফুটে আছে। এমন সৌন্দর্য দেখে বুক ভরে যায়, পাখি শিকারের কথা মনেও আসে না। অনেক সময় এসব পাখিরা হেঁটে হেঁটে আমাদের কাছাকাছি চলে আসে মনে হয় যেন ওরা আমাদের কত চেনা।

গ্রামের শুকুর আলী জানালেন, দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই পাখিগুলো দেখতে আমাদের গ্রামে আসেন। কেউ কেউ পাখিগুলো ধরার ইচ্ছা পোষণ করে থাকেন কিন্তু আমরা গ্রামবাসীরা এ ব্যাপারে তীক্ষ্ণ নজর রেখেছি। কোনো পাখি শিকারি আমাদের এই গ্রামে ঢুকতে পারে না। আর কোনোভাবেই যেন পাখি শিকার করা না হয় সে ব্যাপারেও গ্রামের শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই সজাগ।

গ্রামের কিশোরী উম্মে সালমা জানালেন, সারাদিন এই গাছগুলোতে শুধু পাখির ছানারাই অবস্থান করে। আর দিনের মাঝে মাঝে মা পাখিরা মাছ শিকার করে ঠোঁটে করে তার ছানাদের খাওয়াতে আসে। মূলত সন্ধ্যার সময় পাখিদের আনাগোনা বেড়ে যায়। তখন পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে আরো বেশি মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। সাদা বকের উপস্থিতিতে গাছের পাতা প্রায় চোখেই পড়ে না।

এনজিওকর্মী ফজলু জানালেন, বক পাড়া গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ইছামতি নদী। এক সময়ে এই নদীতে মাছের প্রাচুর্যতা থাকলেও এখন ক্রমশ কমে আসছে। প্রতিদিন শত শত বক আর পানকৌড়ি এসে এই নদীতে মাছ শিকার করে। আর রাতে বিশ্রাম নেয় এই সব গাছগুলোতে। পাখি গুলোকে বিরক্ত না করায় দীর্ঘদিন ধরে তারা এখানেই বসবাস করে চলেছে।

গ্রামের কবির হোসেন জানালেন, বক আর পানকৌড়ির ছানাদের খাবারের জন্য মা পাখিরা নদী থেকে মাছ শিকার করে ঠোঁটে করে বয়ে আনে। কখনো কখনো ছানাদের খাওয়াতে গিয়ে তাদের ঠোঁট থেকে এসব মাছ মাটিতে পড়ে যায়। অনেক সময় এসব মাছ জীবিত থাকায় গাছের গোড়ায় লাফাতেও দেখা যায়। যা গ্রামের শিশু-কিশোরদের আনন্দের খোরাক হয়ে ওঠে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা