kalerkantho

সোমবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১০ সফর ১৪৪২

করোনায় মৃতদের পরিবারে 'কান্নার ঈদ'

বিরামপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি   

৩ আগস্ট, ২০২০ ২০:৩৭ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনায় মৃতদের পরিবারে 'কান্নার ঈদ'

চলতি করোনাপ্রাদূর্ভাবের মধ্যে দিনাজপুরের বিরামপুরে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তিন ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। ওই পরিবারগুলো মধ্যে এবার নেই কোন ঈদের আনন্দ। কেউ বা স্বামী ছাড়া আবার কেউ বাবা ছাড়া নিরানন্দ ঈদ পালন করেছে। কোন পরিবার কেঁদে আবার কেউ রান্না না করেই পার করেছে ঈদের দিন। স্থানীয়রা ওই পরিবারগুলোকে কোরবানি পশুর ভাগ দিতে দেয়নি বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরিবারগুলোর খোঁজ নেয়নি উপজেলা প্রসাশন কিংবা স্বাস্থ্য বিভাগ।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সুত্রে জানা যায়, সোমবার পর্যন্ত উপজেলায় মোট করোনা রোগীর সংখ্যা ১৯৫ জন। তাদের মধ্যে সুস্থ ১২২ জন। এদের মধ্যে মারা গেছেন ৩ জন।

গত রোববার বিকেল থেকে সন্ধা পর্যন্ত বিরামপুর পৌরশহরের পূর্বপাড়া, পূর্ব জগন্নাথপুর ও ২নং কাটলা ইউনিয়নের কাটলাবাজারে ওই তিনটি পরিবারের সদস্যদের সাথে সরেজমিনে কথা হয় কালের কণ্ঠের সঙ্গে। সেই সময় ওই পরিবারগুলো জানান করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর ডাক্তারের চরম অবহেলা ও গাফিলতিতে করোনা আক্রান্ত এক রোগীর মৃত্যুর বিভৎস ও অজানা তথ্য।

পূর্বপাড়া মহল্লায় করোনায় মৃত আনিসুর রহমান মিনু'র বাড়ির সামনে গিয়ে তার মা সুরাতুন নেছার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, গত ১১ জুলাই আমার ছেলে করোনায় মারা যায়। পরে ছেলের স্ত্রীও করোনায় আক্রান্ত হয়। তখন থেকে আমার বাড়ি লকডাউন হওয়ায় বাড়িতে বন্দি জীবন কাটাচ্ছি। বাড়ি লকডাউন থাকায় প্রতিবেশিদের কেউই এখন পর্যন্ত দেখা করতে আসেনি। বাড়ির দরজার সামনে দিয়ে কেউ গেলে ইচ্ছে করে কথা বলেন না। একদিকে সন্তান হারার কষ্ট অন্যদিকে প্রতিবেশিদের অবহেলা সবমিলিয়ে খুব খারাপ সময় পার করছি।

মৃত মিনুর প্রতিবেশী এবং দূর সম্পর্কের বোন আম্বিয়া খাতুন (৫৫) বলেন, করোনায় মিনু মারা যাওয়ার পর থেকে ওই পরিবারের কারও সাথে দেখা করতে যাইনি। আরেক প্রতিবেশী দেলোয়ারা বেগম (৫০) বলেন, মিনু করোনা মারা যাওয়ার পর ভয়েই তার পরিবারের কারো সাথে দেখা করতে যাইনি।

গত ১৫ জুলায় করোনায় মারা যান বিরামপুরের পূর্ব জগন্নাথপুর মহল্লার বাসিন্দা ও পৌরসভার সিনিয়র স্বাস্থ্যকর্মী ময়নুল হোসেন। তার পরিবারের লোকজন বলেন, প্রতিবছর ঈদ ভালো কাটলেও এবারে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটির অকালমৃত্যুতে সংসারে চলছে আর্থিক টানাপোড়ন। আর সেকারণে এবার ঈদে কোরবানি দেয়া সম্ভব হয়নি। আর মৃত্যুর সময় রেখে যাওয়া দুই ছেলেমেয়ের জন্য ঈদের কেনাকাটার সুযোগ হয়নি।

উপজেলার কাটলাবাজারের বাসিন্দা নাজিম উদ্দিন গত ২৫ জুলাই করোনায় মারা যান। এরপর থেকে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের নির্দেশে তিনজন গ্রামপুলিশ এসে মৃতের বাড়িতে লকডাউন ঘোষণায় লাল পতাকা টাঙিয়ে দেন। আর এরপর থেকে ওই বাড়ির সদস্যদের জীবনে ঘটতে থাকে সব অমানবিক ঘটনা। 

মৃত নাজিম উদ্দিনের ছেলে মাহাবুব আলম (৩৫) কালের কণ্ঠকে বলেন, বাবা করোনায় মারা যাওয়ার পর তাকে আমাদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করতে স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকার মানুষ আমাকে অনেক হেনস্তা করেছে। কোনো যানবাহন না পাওয়ায় একমাত্র স্বজনদের সহযোগিতায় বাবার লাশ ঘাড়ে করে ৩ কিলোমিটার পথ হেঁটেছি। বাড়ি লকডাউনের পর থেকে আমার বাড়িতে উপজেলা ও স্থানীয় প্রশাসনের কেউ খোঁজখবর নিতে আসেনি।
 
শুধু তাই নয়, বাড়ি লকডাউন থাকায় এবং কসাই রাজি না হওয়ায় এবার কোরবানি দেয়া সম্ভব হয় নাই।

এ বিষয়ে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রাজুল ইসলাম বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে করোনায় মৃত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তবে ঈদের আগে এ উপজেলায় নির্বাহী অফিসার ও উপজেলাসহকারি কমিশনার (ভূমি) করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এ ছাড়া উপজেলা সমাজসেবা অফিসের তিনজন স্টাফ করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় করোনায় মৃত ব্যক্তির পরিবারের শোকাহত সদস্যদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করা সম্ভব হয়নি। তবে আমি  উপজেলা প্রশাসনের সাথে কথা বলে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে এ কাজটি করার উদ্যোগ নেব।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা