kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭। ১১ আগস্ট ২০২০ । ২০ জিলহজ ১৪৪১

এক সঙ্গে ৫১৮ বাড়িতে সাইনবোর্ড দিয়ে পুলিশের হুঁশিয়ারি : আমরা সব দেখছি!

লিমন বাসার, বগুড়া   

২৪ জুলাই, ২০২০ ১৪:১৩ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



 এক সঙ্গে ৫১৮ বাড়িতে সাইনবোর্ড দিয়ে পুলিশের হুঁশিয়ারি : আমরা সব দেখছি!

নির্মাণাধীন বাড়ি দেখলেই চাঁদাবাজরা হাত বাড়ায়। এমন ঘটনা ঘটলেই অবগত করার অনুরোধ জানিয়ে পুলিশের পোস্টার। ছবি : কালের কণ্ঠ

বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, আর পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ! বহুল প্রচলিত প্রবাদটি পুলিশকে হেয় করতে বেশির ভাগ সময় উদাহরণ হিসেবে টানে সবাই। তবে এই প্রতিবেদনের গল্পটি একটু আলাদা। বগুড়া পুলিশ গুনে গুনে ‘ছত্রিশ ঘা’ ঠিকই দিচ্ছে, তবে মাস্তানদের গুণ্ডামি ঠেকাতে। এবার কৌশলী চাঁদাবাজদের ‘পাকা ধানে মই দিল’ বগুড়া পুলিশ।

চাঁদাবাজি হরেক ধাঁচের হয়। তবে সেই চাঁদাবাজির নতুন সংজ্ঞা পাওয়া গেল বগুড়ায়। চাঁদাবাজিটা রীতিমতো শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে সেখানকার দুর্বৃত্তরা। চাঁদার টাকা নগদে নিলে চোখে লাগে। তাই বগুড়ার মাস্তান সিন্ডিকেট বের করল চাঁদাবাজির ‘আধুনিক সংস্করণ’। স্থানীয়রা এই চাঁদাবাজির নাম দিয়েছে ‘ঘুরানো চাঁদা’। সেই ঘুরানো চাঁদা আবার কেমন! জানুন, বগুড়া শহরের মালগ্রাম এলাকার বাসিন্দা চাকরিজীবী আবু তাহেরের (ছদ্মনাম) মুখে। তিনি বলেন, ‘আমি বগুড়া শহরে দোতলা বাড়ি করছি ঋণ করে। বাসা করতে গিয়ে চাঁদাবাজদের অত্যাচারে একরকম হতাশ। এলাকার একটি সিন্ডিকেট আমার কাছে বাজারদামের দেড় গুণ দামে বালু ও ইট সরবরাহ করছে। সরবরাহ করা সরঞ্জামগুলোও নিম্নমানের। একবার ভালো মানের এক ট্রাক বালু গোপনে বাইরে থেকে কিনেছিলাম। এ জন্য ওই মাস্তান সিন্ডিকেটকে জরিমানা হিসেবে দিতে হয়েছে ১০ হাজার টাকা। তারা সরাসরি নগদ টাকা চায় না। জবরদস্তি করে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী গছিয়ে দিয়ে দেড় থেকে দুই গুণ দাম হাতিয়ে নেয়।’

বগুড়া শহরের শাকপালা, ব্যাংকপাড়া, ঠনঠনিয়া, মালতিনগর, সেউজগাড়ি, চেলোপাড়া, নারুলী, সাবগ্রাম, সূত্রাপুর, বাদুরতলা, নামাজগড়, শিববাটি, মাটিডালি, রহমাননগরসহ প্রতিটি এলাকার মাস্তানির ছবি একই। শাকপালা এলাকার বাসিন্দা আমিনুল এই প্রতিবেদককে ফোন করে জানান, তিনি বাড়ি করার আগেই চাঁদাবাজদের এই অত্যাচার দেখে নির্মাণকাজই বন্ধ রেখেছেন। একই ধরনের অভিযোগ করে সাবগ্রামের আব্দুল হামিদ বলেন, ‘পুলিশকে জানালে উল্টো বিপদে পড়তে হয়। তখন চার হাজার টাকার বালু কিনতে হয় আট হাজারে। সন্ত্রাসীদের অনেকেই ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে জড়িত। এ কারণে ভয়ে মুখ খুলতে পারি না।’

বাড়ি নির্মাণ করতে গেলেই নির্মাণসামগ্রী সরবরাহের নামে জিম্মি করছে এই চাঁদাবাজচক্র। এই সিন্ডিকেটের বালু সরবরাহের বিরোধে খুনোখুনির সংখ্যাটাও ভয়ংকর। বালুর কর্তৃত্ব নিয়েই এক মাসে লাশ পড়েছে চারটি। এর পরই চাঁদাবাজদের ‘ছত্রিশ ঘা’ দিতে নড়েচড়ে বসে বগুড়া পুলিশ। বাড়ি বানাতে গিয়ে এই জিম্মিদশা থেকে মুক্তি দিতে ত্রাতা হিসেবে সামনে আসে তারা। প্রতিটি নির্মাণাধীন বাড়িতে এখন পুলিশের কড়া চোখ। নিজের পছন্দমতো নির্মাণসামগ্রী কেনার ব্যাপারে সহায়তা দিতে এরই মধ্যে ৫১৮টি বাড়িতে পোস্টারিংও করেছেন পুলিশ সদস্যরা। এতে চাঁদাবাজরা একরকম মুষড়ে পড়েছে। বগুড়া পুলিশের এমন পদক্ষেপ সব মহল থেকেই পাচ্ছে বাহবা।

এখন বগুড়ার নির্মাণাধীন প্রতিটি বাড়ির সামনে গেলে দেখা যায় পুলিশের টানানো সতর্কবার্তার ‘বিশেষ বিজ্ঞপ্তি’। তাতে বড় করে লেখা ‘এ বাড়ির নির্মাণকাজ জেলা পুলিশ বগুড়া পর্যবেক্ষণ করছে’। এর নিচেই লেখা ‘বাড়িওয়ালা নিজ পছন্দমতো সুবিধাজনক জায়গা থেকে ইট, বালু, রডসহ অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী ক্রয় করবেন। কেউ ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার নির্মাণসামগ্রী ক্রয় ও বিক্রয়ের চেষ্টা করলে অথবা চাঁদা দাবি করলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। চাঁদাবাজিসংক্রান্ত কোনো অভিযোগ থাকলে নিম্নলিখিত নম্বরে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানানো যাচ্ছে। সেখানে জেলা পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও সংশ্লিষ্ট থানা/ফাঁড়ির অফিসার ইনচার্জের যোগাযোগের নম্বর সংযুক্ত করা হয়েছে।’

এ ব্যাপারে বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞা বলেন, ‘অনেকেই ভয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ করে না। এ কারণে বিষয়গুলো এত দিন অজানা ছিল। শহরের প্রতিটি এলাকাতেই নির্মাণকাজে মালপত্র সরবরাহ করার নামে একটি সিন্ডিকেট গ্রুপ গড়ে উঠেছে। এরাই বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত। পুলিশ তাদের তালিকা করে ব্যবস্থা নিচ্ছে। আর প্রতিটি নির্মাণাধীন বাড়ির সামনে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে একটি সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘শহর এবং শহরতলির ৫১৮টি নির্মাণাধীন বাড়ি এখন পুলিশি নজরদারিতে। এগুলোতে সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন পুরনো মামলায় সিন্ডিকেটের ১০ সদস্যকে গ্রেপ্তার করছে পুলিশ।’

এদিকে জেলা পুলিশের সিন্ডিকেট তালিকায় উঠে এসেছে বগুড়া সদরের ১৩৩ দুর্বৃত্তের নাম। এরা বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় নিজ নিজ বাহিনীর ছেলেদের দিয়ে নির্মাণাধীন স্থাপনায় ইট, বালু, সিমেন্টসহ অন্যান্য মালপত্র সরবরাহের নামে চাঁদাবাজি করে। ভয় দেখিয়ে নির্ধারিত দামের দেড় থেকে দুই গুণ বেশি দামে মালপত্র কিনতে বাধ্য করত তারা। এর মধ্যে আবার এক হাজার ইটের বদলে মিলত ৮০০, ট্রাকে বালু থাকত কম। এক নম্বর ইট কিনলে দেওয়া হতো দুই নম্বরি ইট। তাদের দেওয়া মালপত্র না নিয়ে বাইরে থেকে কেনার চেষ্টা করলে জরিমানা গুনতে হতো স্থাপনার মালিককে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পুলিশের তৈরি করা ১৩৩ জন চাঁদাবাজ দুর্বৃত্তের মধ্যে ১০৪ জনই ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠন এবং বিএনপি ও জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এদের মধ্যে আবার ৪৫ জন একাধিক মামলার আসামি। তারা হলো গোয়ালগাড়ির সৈয়দ রিটু আহম্মেদ (আওয়ামী লীগ), সাবগ্রামের রাসেল, বৃন্দাবনপাড়ার গলাকাটা নুরু (যুবলীগ), চান্দুপাড়ার আখের আলী (শ্রমিক লীগ), তাজেল মিয়া, পল্লী মঙ্গলহাটের রঞ্জু মিয়া (আওয়ামী লীগ), শিববাটির রুবেল (আওয়ামী লীগ), সোহেল (আওয়ামী লীগ), ধাওয়াকোলার আশিষ খাঁ (বিএনপি), নাটাইপাড়ার আব্দুস সালাম (যুবলীগ), মোহাম্মদ রানা (যুবলীগ), চেলোপাড়ার তনয় পোদ্দার (বিএনপি), বাবুল চন্দ্র দাস (বিএনপি), সুশান্ত দাস (বিএনপি), সবুজ ব্যাপারী, সেউজগাড়ির আমিনুল সরকার  (স্বেচ্ছাসেবক লীগ),  মালতিনগরের লিটন হোসেন (আওয়ামী লীগ), ব্যাংক কলোনির বছির (আওয়ামী লীগ), জামিল মাদরাসার সামসাদ (আওয়ামী লীগ), ঠনঠনিয়া পশ্চিমপাড়ার নূর নবী আলম (আওয়ামী লীগ), চকফরিদের রঞ্জন (আওয়ামী লীগ), চকলোকমানের নিকেল (আওয়ামী লীগ), চকফরিদের ব্যাটা কালাম (আওয়ামী লীগ), চকলোকমানের সাঈদ (আওয়ামী লীগ), ফুলদীঘির শাকিল (আওয়ামী লীগ), রব্বানী (আওয়ামী লীগ), নাজিম (আওয়ামী লীগ), ফুলতলার নাছির (যুবলীগ), নওদাপাড়ার বাদল (আওয়ামী লীগ), ফুলবাড়ীর জিতু (বিএনপি), রুবেল (যুবলীগ), সজীব (যুবলীগ),  নওদাপাড়ার ফারুক ও সাজু (আওয়ামী লীগ), মানিকচকের পিন্টু (জামায়াত), কুরশাপাড়ার সোহাগ হোসেন (বিএনপি), ডাকুরচকের লিটন (স্বেচ্ছাসেবক লীগ), নামাবালার ফারুক হোসেন (আওয়ামী লীগ), নারুলী উত্তরপাড়ার কাজী সোহাগ আলী, নারুলী দক্ষিণপাড়ার করিম মণ্ডল (যুবলীগ), মতিন প্রামাণিক (যুবলীগ), চকনাটাইপাড়ার বাপ্পী (যুবলীগ), নাটাইপাড়ার বাবর আলী, নারুলীর উজ্জল হোসেন ও নারুলী উত্তরপাড়ার  নিয়ামত আলী।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক নির্মাণাধীন বাড়ির মালিক বলেন, ‘বাড়ি নির্মাণ করতে গেলেই হাজির হতো কথিত বালু দুর্বৃত্তরা। বাড়ির মালিকের পছন্দ বাদ দিয়ে জবরদস্তি করা হতো তাদের বালু ও নির্মাণসামগ্রী কিনতে। এসব কারণে সব সময় ভয়ে তটস্থ থাকতাম। এখন পুলিশি উদ্যোগে কিছুটা রক্ষা পেয়েছি।’

এ ব্যাপারে বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক উপদপ্তর সম্পাদক মাশরাফি হিরো বলেন, ‘চাঁদাবাজরা নিজেদের স্বার্থে ক্ষমতাসীন দলের নাম ব্যবহার করে। আসলে তারা চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসী। এরা সুবিধাবাদী। পুলিশের উদ্যোগ ভালো। দলের নাম ব্যবহার করে কেউ কোনো অপকর্ম করলে ছাড়া পাওয়ার সুযোগ নেই।’

অভিযোগের ব্যাপারে নারুলী দক্ষিণপাড়ার যুবলীগ নেতা করিম মণ্ডল বলেন, ‘আমি কখনো বালু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। আমার নামে কোনো মামলাও নেই। পুলিশ মনগড়া এই তালিকা তৈরি করেছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা