kalerkantho

সোমবার । ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭। ১০ আগস্ট ২০২০ । ১৯ জিলহজ ১৪৪১

সৈকতের বর্জ্য নিয়ে তদন্ত কমিটি

কাছিম পাঠানো হয়েছে ময়না তদন্তে
সাগরের পানিতে দূষণ মিলেনি

বিশেষ প্রতিনিধি, কক্সবাজার   

১৪ জুলাই, ২০২০ ০২:০২ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সৈকতের বর্জ্য নিয়ে তদন্ত কমিটি

সামুদ্রিক জোয়ারের পানিতে কক্সবাজার সৈকতে ভেসে আসা বর্জ্যের ঘটনা নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসন সোমবার ৭ সদস্যের এ কমিটি গঠন করে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আশরাফুল আফসারকে প্রধান করে গঠিত কমিটি জোয়ারে আকস্মিক বর্জ্য ভেসে আসার উৎসের সন্ধান করবে। সেই সঙ্গে সাগরে পরিবেশ দূষণের বিষয়টিও কমিটি খুঁজে দেখবে।

এদিকে সৈকতে আসা বর্জ্য নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সোমবার রাতে জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন জানিয়েছেন, সৈকত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার কাজ চলছে। তবে এনজিওদের নিয়ে ব্যাপক কর্মসূচি নিয়ে নামা হবে পরিচ্ছন্নতা অভিযানে।

আষাঢ়ের এমন ঘোর বর্ষার সময় কাছিম ও সাপসহ সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যু নিয়ে সামুদ্রিক বিজ্ঞানীরাও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। কাছিমের মৃত্যুর কারণ উদঘাটন করার জন্য সোমবারই ভেসে আসা কাছিম উদ্ধার করে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে পাঠানোর উদ্যোগ নে‌ওয়া হয়েছে।

কক্সবাজারের পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ও জেলা প্রশাসকের গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব শেখ মো. নাজমুল হুদা জানিয়েছেন, ল্যাবে ময়না তদন্তের পর আশা করা যাচ্ছে যে, অন্তত সামুদ্রিক প্রাণীটির মৃত্যুর কারণ জানা যেতে পারে।

এদিকে জোয়ারের পানিতে বর্জ্য ভেসে আসার পরিমাণ কমে গেলেও মৃত এবং অর্ধ মৃত সামুদ্রিক কাছিম ও সামুদ্রিক সাপ ভেসে আসা অব্যাহত রয়েছে। সোমবারও বহুসংখ্যক কাছিম সৈকতে ভেসে এসেছে। সাগরে গত ২০ মে থেকে যেখানে মাছ ধরা বন্ধ রয়েছে সেখানে গভীর সাগরের তলদেশের প্রাণী কাছিমসহ সামুদ্রিক সাপ ভেসে আসার বিষয়টি সামুদ্রিক বিজ্ঞানীদেরও বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। কি কারণে এমন অসময়ে কাছিম মারা যাচ্ছে তা নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন সামুদ্রিক বিজ্ঞানীরা।

কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণা কেন্দ্রের (এফআরআই) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, এ সময়টা সামুদ্রিক কাছিমের প্রজনন সময় নয়। কাছিম ডিম দিতে তীরে উঠে আসে ডিসেম্বর-জানুয়ারির শীত মৌসুমে। বর্জ্যের কারণে আকস্মিক সাগরের পানি দূষণের শিকার হয়েছে কিনা তাও সোমবার তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে।

তিনি জানান, কক্সবাজারস্থ গবেষণাগারের ল্যাবে সোমবারই সাগরের পানি পরীক্ষা করে স্বাভাবিক পাওয়া গেছে। তবুও আরো পরীক্ষা করার জন্য ঢাকায় সামুদ্রিক জোয়ারের পানি পাঠানোর কথাও জানান তিনি।

সামুদ্রিক জোয়ারের পানিতে গত তিন দিন ধরে ভেসে আসা বর্জ্য নিয়ে লোকজনের সন্দেহেরও যেন শেষ নেই। নানা জনের নানা কথা রয়েছে এ প্রসঙ্গে। অনেকেরই ধারণা, বর্ষার প্রথম বর্ষণে উজানের পাহাড়ী ঢলের সঙ্গে কক্সবাজার-চট্টগ্রামের বহু নদী ও খাল দিয়ে সাগরে ভেসে যায় টন টন বর্জ্য।

বলা হচ্ছে রেজু, বাঁকখালী, মাতামুহুরিসহ অনেক নদী ও খাল দিয়ে সাগরে গড়িয়ে পড়ে বর্জ্য। এসব খাল-নদী দিয়ে সাগরে নেমে পড়া বর্জ্যেরই অংশ বিশেষ। আবার  এসবের দ্বিমতও রয়েছে। বলা হচ্ছে, ভেসে আসা বর্জ্যের বোতল ও প্লাস্টিকসহ অন্যান্য সামগ্রী দেশীয় ব্যবহারের নয়।

কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণা কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ সামুদ্রিক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আশরাফুল হকের নেতৃত্বে তিনজনের একটি বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার দল সোমবার দিনব্যাপী সৈকত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তাদের প্রাথমিক ধারণা হচ্ছে যে, সাগরে নিক্ষিপ্ত বর্জ্যগুলো জাল দিয়ে আটকানো ছিল। বর্ষার এমন সময়ে সাগরের বৈরি আবহাওয়ায় হয়তোবা এসব বর্জ্যের আটকানো জালসহ ভাসতে ভাসতে কক্সবাজারের সৈকতে এসে যায়। আর সাগরে বর্জ্য বোঝাই জালের বিশাল থলির সাথে সামুদ্রিক কাছিম ও সাপ আটকা পড়ে ভেসে আসে। ভেসে আসা অনেকগুলো কাছিম জালে আটকানোর মতো আহতও দেখতে পাওয়া গেছে।

অপরদিকে সৈকতের কয়েক কিলোমিটার এলাকায় গত তিন দিনের ভেসে আসা বর্জ্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজও এগিয়ে চলছে। সরকারি ও পরিবেশবাদী সংগটনগুলোর ব্যবস্থাপনায় এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে সৈকত পরিচ্ছন্নতার কাজ। কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইমরান জাহিদ খান জানান, কক্সবাজার সৈকতের লাবণী পয়েন্ট থেকে শুরু করে দরিয়ানগর এবং হিমছড়ি পর্যন্ত এলাকায় পরিচছন্নতার কাজ চালানো হচ্ছে। সৈকত ব্যবস্থাপনা কমিটির কর্মী, পরিবেশবাদী সংগঠনের কর্মী থেকে শুরু করে স্থানীয় দরিদ্র লাকড়ী কুঁড়োনীর বহুসংখ্যক নারী-পুরুষের দলও সৈকতের বর্জ্য তুলে ফেলছে।

জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জানান, সোমবার সকাল থেকে বর্ষণের কারণে সৈকতে পরিচ্ছন্নতা অভিযান ব্যাহত হলেও বিকালে বৃষ্টি কমে যাওয়ায় ২৫ জনের একটি পরিচ্ছন্নতা কর্মীর দল কেবল মাত্র দরিয়ানগর সৈকত থেকে ২৬ বস্তা বর্জ্য কুঁড়িয়ে তুলে নেয়। ওদিকে হিমছড়ি এলাকা থেকে ভাঙ্গারি ও লাকড়ি কুঁড়িয়ে দলের লোকজন গতকাল এক দিনেই কয়েক টন বর্জ্য সংগ্রহ করে নিয়ে গেছে।

পরিবেশবাদী সংগঠনের কর্মীরা জানিয়েছেন, গত দু'দিনে কমপক্ষে অর্ধ শতাধিক মৃত কাছিম ভেসে এসেছে। সেই সঙ্গে আহত এবং আধমরা অবস্থায় উদ্ধার করা কাছিমের সংখ্যা হবে শতাধিক। সোমবারও সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সৈকতে ভেসে আসা কমপক্ষে ২০টি কাছিম উদ্ধার করা হয়েছে। জীবিত কাছিমগুলোকে নৌযান নিয়ে উদ্ধারকর্মীরা গভীর সাগরে পানিতে ছেড়ে দিয়ে আসছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা