kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ শ্রাবণ ১৪২৭। ৭ আগস্ট  ২০২০। ১৬ জিলহজ ১৪৪১

সাধারণের কাছে মানবিক, অপরাধীদের কাছে দাপুটে ম্যাজিস্ট্রেট

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি   

১২ জুলাই, ২০২০ ২১:৫৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সাধারণের কাছে মানবিক, অপরাধীদের কাছে দাপুটে ম্যাজিস্ট্রেট

বৈশ্বিক মহামারি করোনায় নিজের নিরাপত্তার কথা না ভেবে দিন-রাত জনগণের সেবায় নিজেকে কর্মব্যস্ত রেখে চলেছেন গোপালগঞ্জে কর্মরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শেখ সালাউদ্দীন দিপু। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর থেকে গোপালগঞ্জবাসীর পাশে থেকে অবিরত লড়াই করে যাচ্ছেন এই করোনাযোদ্ধা। কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষদের জন্য ত্রাণ নিয়ে ছুটেছেন দিন-রাত। যেখানেই মানুষের সমস্যার কথা শুনেছেন সেখানেই তিনি ছুটে যাচ্ছেন।

আইন অমান্যকারীদের জন্য হয়ে উঠছেন কঠোর থেকে কঠোরতরো। বাল্যবিবাহ বন্ধ, মাদককারবারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, ভেজাল পণ্য তৈরির কারখানা অভিযানসহ নানান কাজে নিজেকে করছেন সম্পৃক্ত। সমস্যা সমাধানে নিয়েছেন নানান পদক্ষেপ। তার এই কর্মকাণ্ডে খুশি গোপালগঞ্জবাসী। ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে অনেকেই তার কর্মকাণ্ডের ছবি পোস্ট করে প্রশাংসা করেছেন।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শেখ সালাউদ্দীন দিপুর সাথে কথা বলে জানা গেছে, করোনা সংক্রমণের শুরুতে যখন সুরক্ষা সামগ্রী নিয়ে দেশব্যাপী হৈ চৈ শুরু হয়, তখনই তিনি বিন্দুমাত্র ভয়ভীতিকে তোয়াক্কা না করে নির্ভয়ে গোপালগঞ্জে চালিয়েছেন সামাজিক দূরত্ব ও লকডাউন নিশ্চিতকরণ কার্যক্রম। মানুষকে ঘরে রাখতে একের পর এক অভিযান পরিচালনা করেছেন এই কর্মকর্তা। জেলাব্যাপী যখন লকডাউন, তখন এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যাওয়া আসা বন্ধ করতে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে মানুষকে রাস্তায় আসতে বাধ্য করেছেন এই কর্মকর্তা। বাজার, যেখানে সবচেয়ে বেশি জনসমাগম হয়, ভোর ৬টা থেকে সারাদিন সেখানে অভিযান পরিচালনা করেন এই ম্যাজিস্ট্রেট। লকডাউনের সময় গোপালগঞ্জের বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি না মানার জন্য বড় অংকের জরিমানা করেন তিনি।

করোনায় কর্মহীন হয়েপড়া অসহায় মানুষকে এই দুঃসময়ে তার অন্নের খোঁজ যোগাতে জেলা প্রশাসনের ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানোকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছিলেন তিনি। জেলা প্রশাসক, গোপালগঞ্জ এর নির্দেশে সকল অসহায় দুস্থ বৃদ্ধ মানুষদের মাঝে খাদ্য ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি।

গত ১৯ এপ্রিল এই কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে 'একটি কলা, হাজার কোটি টাকা' শিরোনামে একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন, যেটি ফেইসবুকে ভাইরাল হয় এবং কালের কণ্ঠসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। 

করনা আক্রান্ত ব্যক্তির আইসোলেশন ও হোম কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত, একের পর এক আক্রান্তের বাড়ি লকডাউন, সে বাড়িতে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সরবারহ নিশ্চিত করতে কাজ করছেন তিনি। আক্রান্ত ব্যক্তি যাতে কোনোভাবেই সুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শে না আসেন, সেদিকে কড়া নজরদারি রাখছেন তিনি।
এ ছাড়া জেলায় বাল্যবিবাহ বন্ধ ও ইভটিজিং এর বিরুদ্ধে প্রায়শই অভিযান পরিচালনা করেন এই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। চলতিমাসের গত সপ্তাহেও (সাবিনা খানম নামের) ১৩ বছর বয়সী অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া এক মেয়ের বাল্যবিবাহ বন্ধ করে দেন তিনি। ভুয়া জন্মসনদ তৈরি করে তাকে বিয়ে দেওয়া হচ্ছিল।

করোনার ছোবলের মধ্যেও থেমে নেই মাদক ব্যবসায়ীদের ছোবল। সেই সাথে থেমে নেই এই অপরাধীদের বিরুদ্ধে এই কর্মকর্তার আইনি ব্যবস্থা। গত ৩ মাসে অনেকগুলো অভিযান পরিচালনা করেন। এসব অভিযানে ৮ জন মাদক ব্যবসায়ী ও মাদক সেবীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন এবং উদ্ধার করেন বিপুল পরিমাণ গাঁজা ও ইয়াবা।

করোনাকে পুঁজি করে গোপালগঞ্জের এক শ্রেণির মানুষ শুরু করে ভেজাল স্বাস্থ্য সামগ্রী ব্যবসা। বিভিন্ন তথ্য প্রমানের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করে জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে উদ্ধার করেন ৭৫ লিটার স্যাভলন ও ভুয়া সার্জিকাল মাস্ক। এ ছাড়া আরো অভিযানের মাধ্যমে উদ্ধার করেন বিপুল পরিমাণ নকল হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও সার্জিকাল মাস্ক।

গত ২৪ ও ২৬ জুন অভিযান পরিচালনা করে বের করেন ভুয়া প্রসাধনী সামগ্রী তৈরির দুই দুইটি কারখানা। সেখান থেকে উদ্ধার করেন ভুয়া জনসন্স বেবি লোশন, কোলগেট টুথপেস্ট, নেওয়া ব্রান্ডের মেহেদী, লোশন, ক্রিম এবং এসব তৈরির জন্য খালি বোতল, মোড়ক, স্টিকার, লোগো, বিএসটিআই এর লোগো, দেশি বিদেশি নামী দামী বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কম্পানির বিভিন্ন পণ্য তৈরির উপকরণ, জায়ান্ট মিক্সার ম্যাশিনসহ প্রায় ১০-১৫ লক্ষ টাকার ভেজাল পণ্য ও সেসব তৈরির উপকরণ। আসামিদের কারাদণ্ড প্রদান করেন এবং ধ্বংস করেন জব্দকৃত পণ্য।

গোপালগঞ্জ জেলা সদরের বেশ কয়েকজনের সাথে কথা হলে তারা বলেন, এই ম্যাজিস্ট্রেট খুব তেজি লোক। অন্যায়কে প্রশ্রয় দেন না। শহরের বেশ কয়েকটি অভিযান চালিয়ে ভেজাল ও নকল কারখানা ধরেছে। করোনার প্রাদুর্ভাব কমাতে বিভিন্ন দোকানে সামাজিক দূরত্ব ঠিকঠাক রয়েছে কি না তা প্রতিদিন তদারকি করে চলছেন।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শেখ সালাউদ্দীন দিপুর সাথে কথা হলে তিনি বলেন, তার আমি যা করেছি বা করছি সেগুলো সবই আমার দায়িত্ব। জেলা প্রশাসক, গোপালগঞ্জ এর চমৎকার দিক নির্দেশনার কারণেই এসব কাজ করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে মানুষের মাঝে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে রাস্তায় চলাচল নিশ্চিত করার জন্যই মূলত কাজ করে যাচ্ছি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা