kalerkantho

শনিবার । ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭। ৮ আগস্ট  ২০২০। ১৭ জিলহজ ১৪৪১

গাইবান্ধা জেলার ৭২ হাজার হতদরিদ্রের জন্য

মানবিক সহায়তার তালিকায় মিল-চাতাল ও জমির মালিক

গাইবান্ধা প্রতিনিধি   

১১ জুলাই, ২০২০ ০৯:০৩ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মানবিক সহায়তার তালিকায় মিল-চাতাল ও জমির মালিক

গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নে করোনা সংকটকালে প্রধানমন্ত্রীর মানবিক সহায়তার তালিকা প্রণয়নে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। অনেক স্বচ্ছল ব্যক্তি এই তালিকাভুক্ত হলেও সুবিধাভোগী ৭১১ জনের তালিকায় স্থান পাননি প্রকৃত দরিদ্র ও কর্মহীন মানুষ। কর্মসূচির সুবিধাভোগী নির্বাচন করতে এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও সদস্যসহ প্রভাবশালীরা আত্মীয়-স্বজন ও নিজেদের পছন্দের ব্যক্তির নাম এই তালিকাতে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

এলাকাবাসীর অভিযোগ ও রসুলপুর ইউনিয়নের সুবিধাভোগী তালিকা যাচাই করে দেখা গেছে, ৩৪৭ নম্বরে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ছান্দিয়াপুর গ্রামের আবদুল্যা আল মামুনের নাম। অথচ তার বাবা জাহাঙ্গীর আলমের রয়েছে ধান ভানা মিল, চাতাল ও প্রায় ৪০ বিঘা জমি। ৩৪৬ ও ৩৫০ নম্বরে রয়েছেন একই গ্রামের ২০ বিঘা জমি ও বিল্ডিং বাড়ীওয়ালা স্বচ্ছল দুই ভাই আতোয়ার রহমান ও আলতাফ হোসেন।

ইউপি চেয়ারম্যান তার ১০ আত্মীয়-স্বজনকে নির্মাণ শ্রমিক হিসাবে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তার মধ্যে ১৬৬ নম্বরে তার ফুফাতো ভাইয়ের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম, ২৫৯ ও ২৬০ নম্বরে আপন দুই ভাইয়ের স্ত্রী লিপি বেগম ও ফিরোজা বেগম, ২৬২ নম্বরে ছোট বোন বুলবুলি বেগম, ২৬৩ ও ২৬৫ নম্বরে দুই চাচা চাঁন মিয়া ও সিরাজ উদ্দিন, ২৬৯ ও ৬৩৫ নম্বরে দুই চাচাতো ভাই রায়হান সরকার ও কামরুজ্জামান, ৬৩৭ নম্বরে ফুফাতো ভাই আমিনুল ইসলাম এবং ৬২৮ নম্বরে ফুফাতো ভাইয়ের ছেলের স্ত্রী শারমিন আক্তার রয়েছেন। এদিকে ৬২৫ নম্বরে রয়েছে ইউপি চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত সহকারী হারুনের নাম। এছাড়া ২২৪, ২২৫ ও ৩ নম্বরে যথাক্রমে তার মা হামিদা, দুই ভাই ফারুক ও আসাদুল ইসলাম ঈদুলের নাম রয়েছে।

অপরদিকে তালিকার ১৭ নম্বরে ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল লতিফের চাচা আজগর আলী মন্ডল, ৭ নম্বরে আজগর আলী মন্ডলের স্ত্রী জেসমিন আক্তার ও ৫ নম্বরে আজগর আলী মন্ডলের মেয়ে আফিফা আক্তারের নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে। এছাড়া ৩১ নম্বরে রয়েছেন দীন মোহাম্মদ নামে ইউপি সদস্য আব্দুল লতিফের অপর এক চাচাতো ভাই। একইভাবে তালিকার ১৮৪ নম্বরে ৬ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য আতোয়ার মিয়া তার স্ত্রী মোরশেদা বেগমসহ আত্মীয়-স্বজন এবং ৪, ৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত সদস্য লাইলী বেগমেরও ছেলে-মেয়েসহ একাধিক অত্মীয়-স্বজনের নাম এই তালিকায় রয়েছে।

এছাড়া ৬৭০ নম্বরে রসুলপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি সুলতান নিজেই দিনমজুর হিসাবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন। শুধু তাই নয় তালিকায় ২৯৬ ও ৫৯১ নম্বরে দুইবার রয়েছে তার শ্বশুর আতোয়ারের নাম। ৬৭২ নম্বরে তার ভাবি সাবিনা বেগম ও ৫৯০ নম্বরে চাচা জাহেদুল হক রয়েছেন। এই তালিকায় তার ১০ জন আত্মীয়-স্বজনের নাম দিনমজুর ও নির্মাণ শ্রমিক হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এমনকি ৪৭ ও ৪৯ নম্বরে পাশ্ববর্তী জামালপুর ইউনিয়নের হামিন্দপুর গ্রামের দুই ব্যক্তির নামও অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে।

পুরো তালিকাজুড়েই একইভাবে নানা কৌশলে ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর এই মানবিক সহায়তায় লাভবান হওয়ার চেষ্টা করেছেন। একই গ্রামের একরামুল হোসেন জানান, বগুড়া শহরে রিকশা চালিয়ে তিনি সংসার চালান। কিন্তু করোনা শুরু হওয়ায় দীর্ঘ দিন থেকে গ্রামেই আছেন। তিনি বলেন, শুনেছি সরকার আমাদের মত লোকজনদের সাহায্য করছেন। চেয়ারম্যান-মেম্বরের কাছে সেই সাহায্যের জন্য কতবার গেলাম। কিন্তু আমাদের কিছুই দেওয়া হলো না।

তালিকায় নয়-ছয় আর স্বজনপ্রীতির এমন ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে রসুলপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল গফুর মিয়া বলেন, ‘ত্রাণ বিতরণ আর দুই হাজার ৫০০ টাকার তালিকাতে যে অনিয়ম হয়েছে তাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে।’ তিনি এসব অনিয়মের সুষ্ঠ তদন্ত করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

ইউপি চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত সহকারী হারুন বলেন, গরীব হওয়ায় এই তালিকায় তাদের নাম ইউপি চেয়ারম্যান ও সরকার দলীয় কোটায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রসুলপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি সুলতান বলেন, আমি ও আমার আত্মীয়-স্বজনরা দরিদ্র। এছাড়া এই আত্মীয়-স্বজনরাই আমাকে দলীয় কর্মকাণ্ডে সহায়তা করে। তাই তারা তালিকাভুক্ত হয়েছেন। ছান্দিয়াপুর গ্রামের আতোয়ার রহমান বলেন, আমার নাম কিভাবে এই তালিকাভুক্ত হয়েছে তা আমি জানি না।

একই গ্রামের আবদুল্যা আল মামুনকে একাধিকবার ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। তবে তার বাবা জাহাঙ্গীর আলম জানান, তার ছেলে চেয়ারম্যানের সাথে ওঠাবসা করেন। এই কারণে এই তালিকায় তার ছেলের নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে।

অভিযোগ অস্বীকার করে রসুলপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান রবিউল করিম দুলা জানান, সহায়তা পাবার যোগ্যরাই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এখানে আত্মীয়-স্বজনের পরিচয় মুখ্য নয়। তারা দরিদ্র তাই তালিকায় এসেছেন। সাদুল্লাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. নবীনেওয়াজ বলেন, অভিযোগ পেলে অনিয়মের বিষয়টি দ্রুত খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গাইবান্ধা-৩ (সাদুল্লাপুর-পলাশবাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট উম্মে কুলসুম স্মৃতি বলেন, ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হবে । এ অনিয়মের সাথে জড়িতদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, গাইবান্ধা জেলার ৭২ হাজার হতদরিদ্র ও কর্মহীন পরিবার এই সহায়তা পাবেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা