kalerkantho

রবিবার। ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭। ৯ আগস্ট ২০২০ । ১৮ জিলহজ ১৪৪১

কুলাউড়ায় বাড়িতে থেকেই সুস্থ হচ্ছেন শতভাগ করোনা রোগী

মাহফুজ শাকিল, কুলাউড়া থেকে   

৮ জুলাই, ২০২০ ০৩:২৩ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কুলাউড়ায় বাড়িতে থেকেই সুস্থ হচ্ছেন শতভাগ করোনা রোগী

প্রতিদিন খবর পাতা খুললেই দেখা যায় হাসপাতালে মৃত কভিড-১৯ রোগীদের আত্মীয়-স্বজনের আহাজারী। কিন্তু মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায় হাসপাতালে না গিয়েই বাড়িতে আইসোলেশনে থেকে শতভাগ রোগী সুস্থ হয়েছেন। এতে যেমন রোগীদের মনোবল বেড়েছে তেমনি এই মহামারির সময়ের জন্য একটি সুখবর। 

গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত কুলাউড়া উপজেলায় ১০৬ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৭৪ জনই সুস্থ হয়েছেন। এই ৭৪ জনের মধ্যে শতভাগই বাড়িতে থেকে সুস্থ হয়েছেন। 

কুলাউড়া উপজেলার ঘাগটিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের একজন (সিএইচসিপি) স্বাস্থ্যকর্মী এ কে এম জাবের (৩২)। গত ২৫ এপ্রিল তাঁর দেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পিসিআর ল্যাবে পাঠানো হয়। ৫ মে তাঁর করোনা রিপোর্ট পজিটিভ আসে। এরপর তাঁকে নিজ বাসায় আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। 

এরপর ৫ মে পুনরায় জাবেরসহ তাঁর পরিবারের সকল সদস্যদের দেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করার পর ১৬ মে তাদের সকলের করোনা রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। সম্প্রতি তিনি করোনা থেকে সুস্থ হয়ে জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে বাড়িতেই আইসোলেশনে থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, প্রতিটি মুহূর্তকে স্পর্শ বা অনুভব করাটাই জীবন। কারণ জীবন কোনো রিউইন্ডস বা ব্যাক টু দ্য বিগিনিং নাই। তাই আমাদের উচিত অতিরিক্ত স্মৃতি মন্থন বা আগামীর আশায় বসে না থেকে আজকের দিনটাতে ভাল থাকা। তিনি বলেন, ‘ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর আমি প্রতিদিন কমপক্ষে পাঁচ বার আদা চা এবং গরম পানি পান করেছি। সেই সঙ্গে নিয়মিত ওষুধ ও ফলমূল খেয়েছি।’

উপজেলার কাদিপুর ইউনিয়নের মনসুর গ্রামের বাসিন্দা, কুলাউড়া শহরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী রেহান উদ্দিন আহমদ (৪৫)। তিনি জাসদ ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সদস্য ছিলেন। তিনি জানালেন, গত ৩১ মে করোনা পরীক্ষার জন্য স্যাম্পুল দিয়েছিলাম। ৫ মে রিপোর্ট পজিটিভ আসে। দ্বিতীয় স্যাম্পুল ১৩ জুন দিয়েছিলাম, ২৩ জুন রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। ২৪ দিন বাড়িতে থেকে আমি কোন ভয় না পেয়ে হোম আইসোলেশনে থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেছি। ভিটামিন সি-জাতীয় ফলমূল খেয়েছি। বিশেষ করে আদা, লেবু, গোলমরিচ, লং, দারুচিনি মিশিয়ে গরম পানি বার বার খেয়েছি। এছাড়া প্রতিদিন গরমপানির ভাপ আর কুলি করেছি। কখনো টান্ডা পানি ব্যবহার করিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুলাউড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একজন নারী চিকিৎসক জানান, ১৫-২১ জুন পর্যন্ত আমি হাসপাতালে ডিউটি করি। এ সময় হঠাৎ করে শরীর একটু খারাপ হলে আমি স্যাম্পুল দেই। গত ২০ জুন করোনা পরীক্ষার জন্য স্যাম্পুল দিয়েছিলাম। ২২ জুন রিপোর্ট পজেটিভ আসে। ১ জুলাই ২য় স্যাম্পুল দিলে ৫ জুলাই রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। ১৫ দিন পরে আমি স্বাস্থ্যবিধি মেনেই বাসায় আইসোলেশনে ছিলাম। প্রতিদিন সাবান পানি দিয়ে রুম পরিষ্কার করতাম। প্রতিদিনই গরম পানি দিয়ে অন্তত ৩-৪ বার গড়গড়া করতাম, ভাপ নিতাম এবং পান করতাম। রং চাও খেয়েছি। প্রচুর ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ ফল খেয়েছি। আল্লাহর রহমতে এখন সুস্থ আছি। আক্রান্ত হওয়ার পর উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে নিয়মিত খোঁজ-খবর নিয়েছেন আমাদের টিএইচও স্যার।
 
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলায় গত ৪ এপ্রিল প্রথম করোনা উপসর্গ নিয়ে এক ব্যবসায়ী মারা যান। পরে তার নমুনা পরীক্ষার ফলাফলে করোনা ‘পজিটিভ’ ধরা পড়ে। এরপর কমলগঞ্জ উপজেলায় একজন চা শ্রমিক মারা যান। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে জেলার সবগুলো উপজেলাতেই করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। এদের মধ্যে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রয়েছেন।

জেলার মোট ৫৭৫ জন করোনা রোগীর মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৩১৩ জন। এর মধ্যে বাড়িতে থেকে সুস্থ হয়েছেন ২৮৬ জন এবং হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়েছেন ২৭ জন। বাকী রোগীদের মধ্যে বর্তমানে হোম আইসোলেশনে আছেন ২৩৪ জন, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ২২ জন। মারা গেছেন ৬ জন তন্মধ্যে বাড়িতে ৪ জন ও হাসপাতালে মারা গেছেন ২ জন।

উপজেলা ভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় ১১ জন করোনা রোগীর মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৫ জন, রাজনগর উপজেলায় ৪৩ জনের মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ১৯ জন, কুলাউড়া উপজেলায় ১০৬ জনের মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৭৪ জন, বড়লেখা উপজেলায় ৫২ জনের মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৩২ জন, কমলগঞ্জ উপজেলায় ৬৬ জনের মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৩৫ জন, শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ৫৭ জনের মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৪৬ জন ও জুড়ী উপজেলায় ৫৪ জনের মধ্যে ৪২ জন সুস্থ হয়েছেন। 

মৌলভীবাজারে করোনার উপসর্গ দেখে নমুনা সংগ্রহ এবং পরীক্ষায় করোনা ‘পজিটিভ’ শনাক্ত হওয়ার পর রোগীদের নিজ বাড়িতে থেকেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে তাদের হোম আইসোলেশনেই চিকিৎসা চলছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মাঠকর্মীরা বাড়িতে গিয়ে রোগীর অবস্থান পর্যবেক্ষণ করছেন।

কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নুরুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়িতে গিয়ে রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। আজ পর্যন্ত কুলাউড়া উপজেলায় ১০৬ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৭৪ জনই সুস্থ হয়ে উঠেছেন। বাড়িতে যারা চিকিৎসা নিচ্ছেন তাদের প্রায় শতভাগ মানুষ চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন। আমরা সবসময় ফোনে রোগীদের ফলোআপ করছি ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছি।’ এছাড়া সীমিত আকারে হলেও যাদের প্রয়োজন তাদের স্যাম্পুল সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠাচ্ছি। 

মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ড. তউহীদ আহমদ মঙ্গলবার বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জেলায় সুস্থ হয়ে ওঠা রোগীদের মধ্যে মাত্র কয়েকজন হাসপাতালে সুস্থ হয়েছেন। বাকিরা বাড়িতে থেকেই সুস্থ হয়েছেন। প্রতিটি উপজেলায় করোনা কন্ট্রোল কমিটি আছে। তারাই সরাসরি আক্রান্তদের তত্ত্বাবধান করছেন। প্রথমে সরকারি নিয়ম ছিল দু’বার নমুনা পরীক্ষার ফল নেগেটিভ হলেই সুস্থ বলা হতো। এখন রোগীর উপসর্গ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। আরো অনেকেই প্রায় সুস্থ হয়ে উঠেছেন। তবে রোগীও বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে সুস্থ হয়ে ওঠা রোগীদের সংখ্যা।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা