নাটোরের লালপুর উপজেলায় লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) এখন এক নীরব মহামারিতে রূপ নিয়েছে। সরকারি হাসপাতালে টিকার তীব্র সংকট, পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাব এবং দ্রুত সংক্রমণের কারণে প্রতিদিনই গরু হারাচ্ছেন কৃষকরা। উপজেলায় প্রায় ২০হাজার গরু এই রুগে আক্রান্ত। এখনও পর্যন্ত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে ৩৬ টি গরুর মৃত্যু হয়েছে। একদিকে গরুর মৃত্যু, আর অন্যদিকে ঋণের বোঝা—সব মিলিয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে উপজেলার শত শত ক্ষুদ্র খামারি।
বিলমাড়িয়া ইউনিয়নের নওসারা সুলতানপুর গ্রামের ছোট খামারী হাবিল উদ্দিনের ছেলে মো. ফিরোজ আলীর গল্প যেন এই সংকটের প্রতিচ্ছবি। লাখ টাকা দামের ৫টা গরুটি ছিলো তার খামারে। এই রোগের কারণে অর্ধেক দামে বিক্রি করে দিতে হয়েছে। পরে আবার ৩ টি গরু কিনে খামরি ফিরোজ আলী। তার মধ্যে একটি গরুর ৩ মাসের বাচুর আবার লাম্পি রোগের আক্রান্ত হয়েছে। প্রায় ২০ থেকে ২৫ দিন হলো আক্রান্ত হয়ে পড়ে আছে। এই রোগ সম্পর্কে তারা উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে যোগাযোগ করলেও কোন প্রতিকার মেলেনি। তবে ঝাড়ফু ও হোমিও ট্রিটমেন্ট নিয়ে চিকিৎসা করছে এই গবাদি পশুকে। নিজের টাকা খরচ করে আরো দুইটা গরুর ল্যাম্পি রোগের টিকা দিয়েছেন এই ছোটখাটো খামারি। এই ল্যাম্পি রোগে সময়মতো সরকারি টিকা পেলে হয়তো কৃষকের এই ক্ষতি হতো না ।
গত বুধবার (৮ জুলাই) সরেজমিনে দেখা যায়, পদ্মা তীরবর্তী বিলমাড়িয়া ইউনিয়নে প্রথম সংক্রমণ শুরু হয় এবং বিল্লাল আলী নামের এক কৃষকের ২টা গরু এই রোগে মারা যায়। গত এক মাসের মধ্যে মহরাজপুর, নাশোষা, নওশারা ও সুলতানপুরসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে রোগটি।
স্থানীয় পশু পল্লী চিকিৎসক মোসলেম উদ্দিন জানান, শুধু বিলমাড়িয়া ইউনিয়নেই গত এক মাসে ৪৫ থেকে ৫০ টি গরু মারা গেছে এবং প্রায় সাড়ে ৩ হাজার গরু আক্রান্ত হয়েছে। যদিও উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের হিসেবে গত মে মাস থেকে এখনো পর্যন্ত ৩৬ টি গরুর মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে, তবে স্থানীয়দের দাবি প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি।
নওশারা সুলতানপুর গ্রামের মো. নুর নবী ঘোষ জানান, তার খামারের ৬টি গরু ইতোমধ্যে মারা গেছে এবং আরো ৩টি এখনো আক্রান্ত। পশু হাসপাতালে গিয়েও কোনো সহযোগিতা পাইনি।
একই গ্রামের মো. টুটুল ইসলামের ২টি গরু আক্রান্ত অবস্থায় রয়েছে। বারবার পশু হাসপাতালে যোগাযোগ করেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা পাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি। এছাড়া মো. ফিরোজ আলি ও শাহানাজ পারভীনও একই সংকটে রয়েছেন।
পানসিপাড়া গ্রামের দিনমজুর কামরুল ইসলামের একটি গরু ১০ দিন ধরে আক্রান্ত। তিনি হোমিও চিকিৎসা, ধূপ, ন্যাপথলিনের বড়ি ও নিমপাতা ব্যবহার করে চিকিৎসার চেষ্টা করছেন। একই অবস্থা ফতেপুর গ্রামের জোসনার। তার গরুটিও ১০ দিন ধরে আক্রান্ত, কিন্তু টিকা বা আধুনিক চিকিৎসা না পেয়ে ঘরোয়া উপায়ে চিকিৎসা চালাচ্ছেন।
বিজলী নামের এক নারীও একইভাবে ক্ষতির শিকার হয়েছেন। তার গরুও দীর্ঘদিন ধরে আক্রান্ত, কিন্তু সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে দিন দিন অবস্থার অবনতি হচ্ছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্যমতে, গত ২০২১ সালে সর্বপ্রথম লালপুরে এই রোগ সংক্রমণ হয়েছে।
লালপুর উপজেলায় মোট ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪২২টি গরুর মধ্যে প্রায় ২০ হাজার গরু ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বিলমাড়িয়া ইউনিয়ন, যেখানে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার গরু আক্রান্ত।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাত্র ৩৫০ ডোজ টিকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। ফলে বর্তমানে টিকাদান কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে, যেখানে অন্তত ৫০ হাজার ডোজ টিকার প্রয়োজন ছিল।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুল্লাহ বলেন, ‘জনবল সংকটের কারণে কিছু তথ্যের গরমিল থাকতে পারে। আমরা প্রকৃত তথ্য যাচাই করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছি।’ তিনি আরো জানান, নতুনভাবে জুলাই মাসের জন্য ২৫ হাজার ডোজ টিকার চাহিদা পাঠানো হলেও এখনো কোনো সরবরাহ আসেনি।
এদিকে ভেটেনারি সার্জন ডা. শুভ কুমার দাস খামারিদের সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আক্রান্ত পশুকে আলাদা রাখা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
টিকার অভাব, চিকিৎসা সংকট এবং দ্রুত সংক্রমণের কারণে লালপুরের খামারিরা এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ ও পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ না হলে এই সংকট আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।







