kalerkantho

মঙ্গলবার । ৩০ আষাঢ় ১৪২৭। ১৪ জুলাই ২০২০। ২২ জিলকদ ১৪৪১

পুলিশের পিটুনিতে কৃষকের মৃত্যু: পাঁচ লাখ টাকায় সমঝোতা?

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি   

৬ জুন, ২০২০ ২৩:৩৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পুলিশের পিটুনিতে কৃষকের মৃত্যু: পাঁচ লাখ টাকায় সমঝোতা?

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় ‘পুলিশের পিটুনিতে’ কৃষক নিখিল তালুকদার নিহতের ঘটনা পাঁচ লাখ টাকায় সমঝোতা করেছেন বলে এলাকাবাসী ও স্বজনরা জানিয়েছেন। নিহতের ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে তিন সদস্যবিশিষ্ট বিভাগীয় তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। তারা তদন্ত কাজ শুরু করেছেন।

আজ শনিবার কোটালীপাড়া উপজেলা চেয়ারম্যানের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে ওই ঘটনার মীমাংসা করা হয়। এসময় উপজেলা চেয়ারম্যান বিমল কৃষ্ণ বিশ্বাস, সাবেক উপজেলার চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদার, পৌর মেয়র এইচ এম কামাল হোসেন, কোটালীপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবীর রামশীল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান খোকন বালা ও কোটালীপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ লুৎফর রহমানসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। 

নিহত নিখিলের পরিবার ও সভায় উপস্থিত ব্যক্তিদের সূত্রে জানা গেছে, নিহত নিখিলের পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা ও তার স্ত্রী ইতি তালুকদার এবং ছোট ভাই মন্টু তালুকদারকে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ওই ঘটনা মীমাংসা করা হয়। নিহত নিখিলের ভাই শংকর তালুকদার সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের হাতে দুই লাখ টাকা দিয়েছে। বাকি তিন লাখ আগামী পাঁচ-ছয় দিনের মধ্যে দিবে এবং আমাকে ও বৌদিকে চাকরি দেওয়ার কথা বলেছে নেতারা। 

কোটালীপাড়া থানার ভারপ্রপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ লুৎফর রহমান বলেন, নিখিলের মৃত্যুর ব্যপারে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। এই বিষয়টি নিয়ে কোটালীপাড়া গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপজেলা কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে বসেছিলেন। সেখানে আমিও ছিলাম। প্রথমে সেখানে নিখিলের স্মরণে শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। নিখিলের মৃত্যুর ব্যপারে যে অভিযোগ উঠেছে তা নিয়ে পুলিশ বিভাগ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। ওই কমিটিতে রয়েছে গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত আসলাম খান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর ও কোটালীপাড়া সার্কেল) মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন ও আমিনুল ইসলাম। স্যারেরা তদন্ত করছেন। রির্পোট দেওয়ার পর আসল ঘটনা জানা যাবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, টাকার বিনিময়ে মীমাংসা এটা পুলিশের পক্ষ থেকে হয়নি। সভায় যেসব নেতারা উপস্থিত ছিলেন তারা নিখিলের অবর্তমানে পরিবার চালানোর জন্য একটা টাকার ব্যবস্থা করেছেন।

তদন্ত কমিটির প্রধান পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত আসলাম খান বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে তার সঠিক তদন্ত হবে। মীমাংসার বিষয়টি আমার কোনো বিষয় নয়। আমার কাজ সঠিক তদন্ত করে রির্পোট পেশ করা। তদন্ত কাজ শুরু করেছি। আগামী দুই তিন দিনের মধ্যে রির্পোট দাখিল করা হবে। তবে অভিযুক্ত শামীম যদি দোষী হয় তাহলে তাকে শাস্তি পেতে হবে।

রামশীল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান খোকন বালা সাংবাদিকদের বলেন, আমি ওই সভায় উপস্থিত ছিলাম। সভায় সিদ্ধান্ত হয় নিহত নিখিলের পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রী ও ছোট ভাইকে চাকরি দেওয়া হবে। এসময় উপজেলার চেয়ারম্যান (সাবেক ও বর্তমান), পৌর মেয়র (সাবেক ও বর্তমান) উপস্থিত ছিলেন। আমি লোক মুখে নিখিলের নিহতের ব্যাপারে যে কথা শুনেছি, সেটা যদি সত্য হয় তাহলে ওই পুলিশের উপযুক্ত শাস্তি হওয়া উচিত। তা না হলে আইনের শাসন থাকে না। 

কোটালীপাড়ার উপজেলা পরিষদের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, নিখিলের মৃত্যুর বিষয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে তার সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ কেউ দিতে পারেননি। অসহায় পরিবারে দিকে তাকিয়ে আমরা সবাই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তার পরিবারের হাতে দুই লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। বাকি তিন লাখ টাকা কয়েক দিনের মধ্যে দেওয়া হবে। এছাড়া তাদের পরিবারে দুই সদস্যের চাকরির ব্যবস্থা করা হবে।

কোটালীপাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান বিমল বিশ্বাস জানিয়েছেন, নিখিল যেহেতু পরিবারের উপার্জন করতো। তাই পরিবারটিকে রক্ষার জন্য আমিসহ কোটালীপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান ও সাবেক কমিটির নেতারা বসেছিলাম। সেখানে উপস্থিত সবাই নিখিলের পরিবারটিকে বাঁচানোর জন্য পাঁচ লক্ষ টাকা ফান্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এদিন নিখিলের পরিবারের হাতে দুই লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছে। বাকি তিন লক্ষ টাকা এক সপ্তাহের মধ্যে দেওয়ার সিদ্ধান্ত  নেওয়া হয়েছে। আর পুলিশের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তার জন্য আমরা সবাই বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছি।

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার বিকেলে রামশীল বাজারের ব্রিজের পূর্ব পাশে নিখিলসহ চারজন তাস খেলছিলেন। ওই সময় কোটালীপাড়া থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক শামীম হাসান একজন ভ্যান চালক ও একজন জন যুবককে নিয়ে সেখানে যান এবং আড়ালে দাঁড়িয়ে মোবাইলে তাস খেলার দৃশ্য ধারণ করেন। তাস খেলতে থাকা ওই চার ব্যক্তি যখন দেখতে পান তাদের খেলা মোবাইলে ধারণ করছে, তখন তারা দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন।

এসময় অন্য তিন জন পালিয়ে গেলেও নিখিলকে শামীম হাসান ধরে মারপিট করতে থাকে এবং হাঁটু দিয়ে পিঠে মেরুদণ্ডে আঘাত করে। এতে নিখিলের মেরুদণ্ড তিন খণ্ড হয়ে যায়। আহত অবস্থায় স্বজনেরা তাকে প্রথমে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে পাঠান। সেখানেই তিনি মারা যান। এ ঘটনায় গতকাল শুক্রবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা