kalerkantho

বুধবার । ৩১ আষাঢ় ১৪২৭। ১৫ জুলাই ২০২০। ২৩ জিলকদ ১৪৪১

স্বাক্ষর জাল করে হতদরিদ্রের চাল খাচ্ছেন ৩ মেম্বার!

বানারীপাড়া (বরিশাল) প্রতিনিধি   

৩ জুন, ২০২০ ১৭:০১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



স্বাক্ষর জাল করে হতদরিদ্রের চাল খাচ্ছেন ৩ মেম্বার!

বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার ইলুহার ইউনিয়ন পরিষদের ৩ জন ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে হতদরিদ্র ১৪ জনের স্বাক্ষর জাল করে ৪ বছর ধরে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। বঞ্চিত ওই ১৪ ভুক্তভোগীদের অভিযোগ শুধু চাল নয়, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির তালিকায় নাম ও কার্ড থাকার পরেও নগদ সহায়তা থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন তারা। বঞ্চিতরা ওই তিন ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তি দাবি করে তাদের বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ আব্দুল্লাহ সাদীদের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। এ ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বরিশাল সমন্বিত জেলা কার্যালয়েও লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। 

জানা যায়, উপজেলার ইলুহার ইউনিয়নের ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইলুহার গ্রামের দিনমজুর (কার্ড নং ৫৭) মো. মনিরুল, দিনমজুর (কার্ড নং ৬১) সাহাদাত হোসেন, দিনমজুর (কার্ড নং ৫৩) মো. মজিবর। ওই ওয়ার্ডের সদস্য আবুল কালামের বিরুদ্ধে এদের চাল আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মলুহার গ্রামের দিনমজুর (কার্ড নং ৮১২) আব্দুল মজিদ, দিনমজুর (কার্ড নম্বর ৮৫২) মো. সুলতান, কৃষক (কার্ড নং ৮১৭) জাকির হোসেন, দিনমজুর (কার্ড নং ৮৬৩) আব্দুছ ছালামের অভিযোগ তাদের ইউপি সদস্য ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস সালাম তাদের চাল মেরে খাচ্ছেন। এ ছাড়াও গত ৪ বছর ধরে কৃষক (কার্ড নং ৮৬৭) মেজবা উদ্দিন, দিনমজুর (কার্ড নং ৮৭২) মো. মাসুম, দিনমজুর (কার্ড নং ৮৬৬) মো. ফজলু, মেকার জহিরুলের কার্ডের চাল আত্মসাৎ করেছেন ওই মেম্বার ও আওয়ামী লীগ নেতা।

এদিকে ৯ নস্বর ওয়ার্ডের মলুহার গ্রামের দিনমজুর (কার্ড নং ১০৬৭) আনোয়ার হোসেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী (কার্ড নং ১১১৩) মো. তারিক, দিনমজুর (কার্ড নং ১০৪৪) ইসরাত জাহানের চাল আত্মসাতের অভিযোগ ইউপি সদস্য ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম মন্টুর বিরুদ্ধ।

ভুক্তোভোগীরা লিখিত অভিযোগে বলেন, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজি চাল দেওয়ার কথা
বলে ওই তিন ইউপি সদস্য ২০১৬ সালে তাদের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি নেন। তবে ২০২০ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত এক মুঠো চালও পাননি তারা। কার্ডটিও তারা চোখে দেখেননি। করোনা পরিস্থিতির কারণে সরকার দরিদ্রদের নগদ সহায়তা দেবে এমন খবর জানতে পেরে ঈদ-উল-ফিতরের আগে তারা ইউনিয়ন পরিষদে যোগাযোগ করেন। তখন জানতে পারেন তাদের নামে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির কার্ড নম্বর রয়েছে। সেই কার্ডের বিপরীতে নিয়মিত চালও তোলা হয়েছে। অথচ তারা কিছুই জানেন না। 

ভুক্তোভোগীরা লিখিত অভিযোগে আরও বলেন, ওয়ার্ডের ডিলারমো. ইয়াছিনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানান, ইউপি সদস্য আবুল কালাম অভিযোগকারীদের মধ্যে ওই ওয়ার্ডের ৩ জনসহ ১২ জনের চাল উঠিয়ে নিয়েছেন। এ ছাড়া কার্ডগুলো ইউপি সদস্য আবুল কালামের কাছে আছে। বিষয়টি জানাজানি হলে ইউপি সদস্য আবুল কালাম অভিযোগকারীদের মধ্যে ওই ওয়ার্ডের ৩ জনের কার্ড ফেরত দেন। কার্ডগুলোতে দেখা যায় ২০১৬ সাল থেকে মোট ১৭ বার স্বাক্ষর জাল
করে প্রতি কার্ডের মাধ্যমে ৩০ কেজি করে ৫১০ কেজি চাল উত্তোলন করা হয়েছে।

একইভাবে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুস সালাম ৮ জনের ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সিরাজুল ইসলাম মন্টু ৩ জনের চাল আত্মসাৎ করেছেন। ওই তিন ওয়ার্ডে ১৪ জন দরিদ্রের ৫১০ কেজি করে ৭ হাজার ১৪০ কেজি চাল তিন ইউপি সদস্য আত্মসাৎ করেছেন। সরকারি হিসেবে ১০ টাকা কেজি দরে যার মূল্য ৭ লাখ এক হাজার ৪০০টাকা। তবে ওই চালের বাজার মূল্য এর তিন গুনেরও বেশী। 

গত সোমবার উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) কাছে তাদের বঞ্চনার কথা তুলে ধরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এ ছাড়া লিখিত অভিযোগের অনুলিপি বরিশাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ডাকযোগে পৃথকভাবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বরিশাল সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। 

অনিয়মের বিষয়ে ওই ইউনিয়নের  জনতা বাজারের ডিলার মো. ইয়াছিন বলেন, ঢালাওভাবে চাল না দেওয়ার অভিযোগ সঠিক না। যে কার্ড নিয়ে এসেছে তাকে চাল দেওয়া হয়েছে। যাদের কার্ড হারিয়েছে তাদের চালও কেউ না কেউ এসে তুলে নিয়ে গেছেন। একবার ১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. শহীদ ও স্থানীয় রব আমীন ১২ জনের কার্ডের চাল তুলে নিয়ে গেছেন।

অভিযুক্ত ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবুল কালাম বলেন, তার ওয়ার্ডের ৩টি কার্ড ডিলার ইয়াছিন হারিয়ে ফেলেছিল। এ কারণে তাদের চাল উত্তোলনে সমস্যা দেখা দেয়। এরপরও তাদের চাল দেওয়া হয়েছে।

৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস সালাম বলেন, যারা এখন বলছেন চাল পাননি তাদের বিগত সময়ে কার্ডের মাধ্যমে চাল নিতে বলা হয়েছে। কিন্তু তারা চাল তোলেননি। তাদের গাফিলতির কারণেই তারা চাল পাননি।

বানরীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ আব্দুল্লাহ সাদীদ জানান, লিখিত অভিযোগ হাতে পেয়েছি। এ ব্যপারে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা