kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৩ আষাঢ় ১৪২৭। ৭ জুলাই ২০২০। ১৫ জিলকদ  ১৪৪১

পদ্মা সেতুতে আর শোনা যাবে না হ্যামারের শব্দ

মো. মাসুদ খান, মুন্সীগঞ্জ   

২ জুন, ২০২০ ০৯:৪৪ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পদ্মা সেতুতে আর শোনা যাবে না হ্যামারের শব্দ

আজ থেকে পদ্মা সেতুর হ্যামারের আছড়ে পড়া আওয়াজ আর শুনতে পাবেনা মুন্সীগঞ্জ ও শরিয়তপুরবাসী। সেতুর কাজ শেষে ২টি হ্যামার ইতিমধ্যে চলে গেছে জার্মানিতে। সর্বশেষ হ্যামারটি সোমবার রাতে কাজ শেষ করে আজ থেকে জার্মানিতে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। যদিও সেতুর পাইল ড্রাইভিংয়ের কাজ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। এতদিন এ হ্যামারটি পদ্মার ওপর বিদ্যুৎ টাওয়ার নির্মাণের জন্য পাইল ড্রইিভিং করছিল।

পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের মূল সেতুতে নদীর মধ্যে ৪০টি পিয়ারে মোট ২৬২টি পাইল বসানো হয়েছে। সেতুর সুপার স্ট্রাকচার কম্পোজিট (স্টিল এবং কংক্রিট) হওয়ায় যমুনা সেতুর মতো এর ওপর দিয়ে বিদুৎ লাইন নির্মাণ সম্ভব হয়নি। যমুনা সেতুর আপস্ট্রিম (উজান) সাইড দিয়ে ১৩২ কেভিএ বিদ্যুৎ লাইন দিয়ে উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলার সহিত জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড সংযুক্ত করা হয়েছে।

পদ্মা সেতু প্রকল্পও একটি বহুমুখী প্রকল্প হওয়ায় এ সেতুতে রেল, গ্যাস এবং অপটিক্যাল ফাইবার লাইনের পাশাপাশি দক্ষিণ বঙ্গের ১৯টি জেলার সাথে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড এর ব্যবস্থা করা হয়। তবে এটি যমুনার মত নয়, সেতুর ২ কিলোমিটার ভাটি দিয়ে বিদ্যুৎ লাইনের জন্য মূল সেতু প্রকল্পের অধীনে নদীর ভেতর ৭টি টাওয়ার নির্মাণ করা হচ্ছে। ৭টি টাওয়ার মোট ৩৬টি পাইল রয়েছে এবং টাওয়ারগুলো ৮৩০ মিটার স্প্যান বিশিষ্ট। টাওয়ারগুলোর ফাউন্ডেশন (বেস) পর্যন্ত করে ৪০০ কেভিএ বিদ্যুৎ লাইন পরিচালনার জন্য পিজিসিবি কে হস্তান্তর করা হবে। ফলে রামপাল পাওয়ার প্ল্যান্ট এর বিদ্যুৎ খুব সহজেই ঢাকাসহ সারা দেশে সঞ্চালন করা সম্ভব হবে। ৭টি টাওয়ার নির্মাণে প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয় হবে, যা পদ্মা সেতুর চুক্তির অধীনেই রয়েছে।

মূল সেতু ও বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণের জন্য মোট ২৯৮টি পাইল বসানোর (ড্রাইভ) প্রয়োজন হয়। সেতুর পাইলগুলো ১২৮ মিটার (সর্ব্বোচ্চ) এবং বিদ্যুৎ লাইনের পাইলগুলো ১০৯ মিটার। প্রতিটি পাইলের ব্যাস (ডায়া) ৩ মিটার ও স্টীল ওয়াল থিকনেস ৬২-৮০ মিলি মিটার।

পাইলগুলো ড্রাইভ খুব সহজ ব্যাপার নয়। পৃথিবীর একটি মাত্র রাষ্ট্রই এ বিশাল পাইলগুলো ড্রাইভ করতে পারে। তাদের কাজই শুধু পাইলগুলো ড্রাইভ করা। ড্রাইভিং হ্যামার বা কন্ট্রোল ইউনিট এরা বিক্রয় করে না। এমনকি এগুলো কেউ কিনে পরিচালনা করার সাহসও পায় না। পাইলগুলো ড্রাইভ করার জন্য ১৪ জন জার্মান নাগরিক প্রায় সাড়ে চার বছর ধরে পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকায় রয়েছে।

এই বিশাল হ্যামার তৈরির দক্ষতা রাখে একমাত্র জার্মানি। এই হ্যামারগুলো তৈরি হয় জার্মানির বিখ্যাত শহর মিউনিখে। জার্মান ব্রান্ড এ হ্যামারগুলোর নাম সবহপশ (মেংক)।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের ২৯৮টি পাইল ড্রাইভ করার জন্য মোট ৩টি হ্যামার আনা হয় জার্মানি থেকে। যাদের ক্ষমতা ছিল ১৯০০ শল, ২৪০০ শল, ৩৫০০ শল। কম্পানিটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩৭০০ শল হ্যামার তৈরি করেছে। তবে সেটি এখন সচল নাই। তিনটি হ্যামার এর দুটি হ্যামারই মূল সেতুর কাজ শেষ হওয়ার পর জার্মানি ফিরে গেছে। বাকি ২৪০০ শল হ্যামারটি বিদ্যুৎ লাইন পাইল ড্রাইভিং এর কাজ করেছে গতকাল রাতে।

সোমবার ১ জুন সেতুর বিদ্যুৎ লাইনের শেষ পাইলটি ড্রাইভ হয়। গতকাল পর্যন্ত মাওয়া সার্ভিস এরিয়াতে বসে তার গর্জন শুনতে পায় সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান আব্দুল কাদের। শিমুলিয়া ফেরিঘাটে থেকেও এর শব্দ শোনা যায়। মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মাওয়া ও শরিয়তপুরের জাজিরা উপজেলার সেতুর আশপাশের লোকজন এ হ্যামারের আওয়াজ আজ থেকে আর শুনতে পাবে না।  ইতোমধ্যে হ্যামারটির কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সও শেষ পর্যায়ে। প্রকল্প হতে খুব শিগগিরই ছাড়পত্র পেলে হ্যামার এবং এর পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত ১৪ জন জার্মান স্কিলড অপারেটর ও প্রকৌশলী জার্মানির উদ্দেশে রওনা দেবেন। আর সেই সাথে হারিয়ে গেল গেল পদ্মা সেতুর আশপাশের লোকজনের অতিপরিচিত হ্যামারের আছড়ে পড়ার সেই আওয়াজ। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা