kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৩ আষাঢ় ১৪২৭। ৭ জুলাই ২০২০। ১৫ জিলকদ  ১৪৪১

করোনায় 'অর্থনৈতিক যোদ্ধা' চট্টগ্রাম বন্দর কর্মীরা

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

৩১ মে, ২০২০ ১১:৫৩ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



করোনায় 'অর্থনৈতিক যোদ্ধা' চট্টগ্রাম বন্দর কর্মীরা

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মানুষগুলোর জীবন বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছেন চিকিৎসকরা; সংক্রমণ ঠেকাতে কাজ করছে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা। আর দেশের মানুষগুলোর জীবিকা বাঁচাতে কাজ করছে চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মীরা। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানি পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে শুরু থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছেন বন্দর কর্মীরা। এই আমদানি পণ্যের মধ্যে যেমন ভোগ্যপণ্য আছে; তেমনি আছে জীবন বাঁচানোর ওষুধ তৈরির কাঁচামাল; আছে করোনা প্রতিরোধে সম্মুখসমরে কর্মরত কর্মীদের জরুরি চিকিৎসাসামগ্রীও। 

উল্লেখ্য, দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে দেশের মোট আমদানির ৮২ শতাংশ আসে; আর রপ্তানি পণ্যের ৯১ শতাংশই যায় এই বন্দর দিয়ে। সুতরাং আমদানি-রপ্তানির এই গতিতে সামান্য নেতিবাচক প্রভাব পড়লে তা পুরো দেশের অর্থনীতির ওপরই বড় প্রভাব পড়ে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, করোনা সংক্রমন ঠেকাতে গত ২৬ মার্চ সাধারণ ছুটির পর চট্টগ্রাম বন্দরের কাজ এক ঘণ্টার জন্যও বন্ধ থাকেনি; দিনরাত ২৪ ঘণ্টা সচল থাকায় রমজানের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দেশে ভোগ্যপণ্যে সরবরাহ সংকটের সৃষ্টি হয়নি। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কাঁচামাল ছাড় দেয়ায় ওষুধ তৈরির জন্য কারখানাকে বসে থাকতে হয়নি। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে কাঁচামাল সরবরাহ ঠিক ছিল বলেই সঠিক সময়ে দেশেই ভেন্টিলেটর তৈরি করা সম্ভব হয়েছে; মাস্ক, গ্লাভস, পিপিইসহ সুরক্ষাসামগ্রী দেশের কারখানায় উৎপাদন হয়েছে। 

এই অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সচল রাখতে গিয়ে বন্দরে অনেক কর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন; এর মধ্যে মারা গেছেন দুজন কর্মী। ঝুঁকি আছে জেনেও সাহস নিয়ে বিদেশি নাবিকদের সাথে মিলে পণ্যবাহী জাহাজ চালিয়ে এনেছেন বন্দর পাইলটরা। সকাল থেকে সাহরি পর্যন্ত জেটিতে দাঁড়িয়ে থেকে পণ্য ওঠানামা তদারকি করেছেন কর্মীরা; গেইট দিয়ে প্রবেশে মাস্ক, গ্লাভস পরাসহ সুরক্ষা নিশ্চিত করে ভেতরে প্রবেশ করতে দিয়েছেন নিরাপত্তাকর্মীরা। কাজ করতে গিয়ে হতাশ হলে কর্মকর্তারা গিয়ে কর্মীদের উদ্ধুদ্ধ করেছেন। এত বড় ঝুঁকি নিয়ে দেশের আমদানি-রপ্তানি সচল রাখলে অথচ দিন-রাত নিরবচ্ছিন্নভাবে জড়িত বন্দরের এই কর্মীদের কাজের স্বীকৃতি মেলেনি সরকারিভাবে কিংবা গণমাধ্যমের প্রচারণায়ও।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, কোনো প্রণোদনা পাবেন এমন আশা নিয়ে বন্দর কর্মীরা করোনা ঝুঁকি মাথায় নিয়ে কাজ করেননি। চট্টগ্রাম বন্দর কর্মীদের প্রধান লক্ষ্য ছিল বন্দরকে ২৪ ঘণ্টা পুরোদমে সচল রাখা; কোনো ক্রমেই যেন পণ্য সরবরাহ বন্ধ না হয়। বিশাল চ্যালেঞ্জ এবং মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বন্দর কর্মী এবং বন্দর ব্যবহারকারীদের সম্মিলিত চেষ্টায় এই কাজটি করতে পেরেছি, এখনও করছি। এর নেপথ্যে ছিল কর্মীদের দেশপ্রেম। দিন-রাত নিরবচ্ছিন্ন কাজের সুফল এর মধ্যে দেশের মানুষ পেয়েছেন। এই কাজের স্বীকৃতি তাদের মনোবলকে আরো বাড়িয়ে দেবে।

তিনি বলেন, করোনা সংক্রমন ঠেকাতে ২৬ মার্চ সরকারি ছুটিতে সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান ছুটি ঘোষণা করলেও বন্দরে কোনো ছুটি ছিল না। প্রথমদিকে আমদানি-রপ্তানিসংক্রান্ত সরকারি অফিস, শিল্পকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বন্দরে আটকা পড়েছিল বিপুল পণ্য। এর মধ্যে রমজানের ভোগ্যপণ্য, জরুরি ওষুধ পণ্য বাছাই করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ছাড় দেওয়াও ছিল অন্যতম প্রধান কাজ। সেটি সর্বোচ্চ ভালোভাবে করার চেষ্টা করেছি। জাহাজজট লেগেছিল; স্থান খালি করতে দ্রুত পণ্যছাড় দিতে আমরা বিনা মাশুলের সুযোগ দিয়েছি। বন্দর এক মুহূর্ত যাতে বন্ধ না হয় সে জন্য অনেকগুলো পদক্ষেপ নিয়েছি।  এর প্রধান লক্ষ্য অর্থনীতির চাকা যাতে সচল থাকে। 

জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের আমদানি-রপ্তানি পণ্য ওঠানামা সচল রাখতে তিনটি বিভাগ সবচে' গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে প্রধান হচ্ছে বন্দরের পরিবহন বিভাগ। এই বিভাগে প্রায় ১২ শ কর্মী সরকারি সাধারণ ছুটির মধ্যেও বন্দর সচল রাখতে কাজের শিফট ভাগ করে নিয়েছে। জাহাজ আসার পর পণ্য ওঠানামার কাজ করে থাকে একজন টার্মিনাল অপারেটর ও ১২ জন বার্থ অপারেটর। বন্দরের পরিবহন বিভাগের নেতৃত্বে তারা কাজটি করে থাকে। 

শুরুর দিকে পরিবহন বিভাগসহ অনেক বিভাগের কর্মীদের কাজে যোগ দিতে অনীহা দেখা দেয়; আতঙ্কিত ছিলেন অনেকেই। কিন্তু পরিবহন বিভাগের পরিচালক এনামুল করিম, টার্মিনাল ম্যানেজার কুদরত ই খোদা মিল্লাতসহ বেশ ক'জন শীর্ষ কর্মকর্তা নিজেরা জেটিতে-শেডে দাঁড়িয়ে থেকে কর্মীদের কাজে গতি আনতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এমন সময় গেছে জেটিতে দাঁড়িয়েই তারা ইফতার করেছেন; রাতে কাজ শেষে বাসায় গিয়ে সাহরি খেয়েছেন। আবার সকালেই যোগ দিয়েছেন বন্দরে।

পরিবহন বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, পরিবারের সদস্যদের ঝুঁকি কমাতে কাজ শেষে বাসায় গেলেও থেকেছি পৃথক কক্ষে। খাওয়া-দাওয়া করেছি পৃথকভাবে। পরিবারের সদস্যদের চোখে দেখেছি, শব্দ শুনেছি কিন্তু আদর করতে পারিনি। প্রথমদিকে তারা আতঙ্কিত থাকলেও এখন মেনে নিচ্ছেন।

বন্দরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ হচ্ছে মেরিন বিভাগ; এই বিভাগের কর্মীরা বহির্নোঙরে আসা বিদেশি জাহাজে উঠে সরাসরি বিদেশি নাবিকদের সংষ্পর্শে যান। আবার সেই বিদেশি নাবিকদের নিয়ে পণ্যবাহী জাহাজটি বহির্নোঙর থেকে কর্ণফুলী নদী দিয়ে চালিয়ে আবার জেটিতে আনেন বন্দর পাইলটরা। একইভাবে আবার পণ্য ছাড় শেষে জাহাজটি চালিয়ে নিয়ে যান এই পাইলটরা। ঝুঁকি আছে জেনেও তারা প্রতিদিন এ কাজ করছেন। 

বন্দরের ডেপুটি কনজারভেটর ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলম বলেন, একটি বিদেশি জাহাজে কমপক্ষে ২৫ জন বিদেশি ক্যাপ্টেন-ক্রু থাকে। আমাদের পাইলটরা প্রতিদিনই তাদের সংষ্পর্শে যাচ্ছেন; দুটি জাহাজ পাইলটিং করতে গিয়ে জাহাজেই থাকছেন চার ঘণ্টা। এরপরও কেউ দমে যায়নি। ঝুঁকি জেনেও কাজ করছি দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে; দেশাত্মবোধ থেকে।  

জাহাজ থেকে পণ্য নামানোর পর সেটি বন্দর থেকে দ্রুত ছাড় দেওয়া নির্ভর করে বন্দর গেইটে থাকা নিরাপত্তারক্ষীদের। এ ছাড়া বন্দরের সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ পথে কর্মীদের করোনা সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং একইসাথে চোরাচালান ঠেকাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়েছে বন্দর নিরাপত্তা বিভাগের। বন্দরের যন্ত্রপাতি সচল রাখতে যান্ত্রিক বিভাগও সমানভাবে কাজ করেছেন। 

চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলমও মনে করেন, সরকারি ছুটির মধ্যে করোনার মৃত্যুঝুঁকি মাথায় নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের আমদানি-রপ্তানি সচল করতে যারা কাজ করেছেন তারা অবশ্যই সাহসী যোদ্ধা। তাদের নিরবচ্ছিন্ন ভূমিকার কারণে রমজানের মধ্যেও পণ্য সরবরাহে বড় কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি। প্রথমদিকে একটু সমস্যা ছিল কিন্তু সেটা বন্দরের নয়; আমদানি-রপ্তানি সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের। করোনা ঠেকাতে দেশের চিকিৎসক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসনও  সেনাবাহিনীর মতো বন্দর কর্মীরাও ফ্রন্টলাইনে কাজ করেছেন। চিকিৎসকরা মানুষের জীবন বাঁচানোর যুদ্ধে ছিলেন; আর বন্দর কর্মীরা হচ্ছেন অর্থনৈতিক চাকা সচলের যোদ্ধা। প্রণোদনার পাশাপাশি সরকারিভাবেও তাদের কাজের স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। 

বন্দর পরিবহন বিভাগ বলছে, করোনা সংক্রমন ঠেকাতে দেশব্যাপী ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটির পর থেকে ২০ মে পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ৩ লাখ ১৯ হাজার একক কন্টেইনার ওঠানামা করেছে। ১ কোটি ৩৮ লাখ টন পণ্য ওঠানামা হয়েছে; শুধু পেঁয়াজ ছাড় দেওয়া হয়েছে ৮৭ হাজার টন। আদা ওঠানামা হয়েছে ৮ হাজার টন, রসুন ছাড় করা হয়েছে ৬৬৫০ টন। রমজান উপলক্ষে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, ডাল, খেজুর ছাড় করা হয়েছে ৮৬ হাজার টন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা