kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৩ আষাঢ় ১৪২৭। ৭ জুলাই ২০২০। ১৫ জিলকদ  ১৪৪১

‘এ লড়াইয়ে মরতে পারব, হারতে পারব না’

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া   

২৯ মে, ২০২০ ১৮:২৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘এ লড়াইয়ে মরতে পারব, হারতে পারব না’

‘মৃত্যু অমোঘ, আমরা কেউ থাকব না। কিন্তু হাসপাতালের বেড না পেয়ে, রাস্তায় মারা যাওয়াটা বন্ধ করতে হবে। অক্সিজেনের অভাবে মৃত্যু থামাতে হবে। রোগীর বেডের পাশে কেউ একজন এসে বলবেন, ‘আমরা আছি, আপনার কিচ্ছু হবে না, আমরা আপনাকে হেল্প করব’, এইটা দরকার।’

এমন আকুতি জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন ফাতেহ মো. ভূঁইয়া ওরফে তারেক। সেই তারেকই কিন্তু করোনা আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগীদের পাশে। তিনি চিকিৎসক। চিকিৎসা দিচ্ছেন করোনা আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগীদের। কর্মরত আছেন চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউতে। মানবিক সেই স্ট্যাটাস দেওয়া চিকিৎসক তারেক স্বেচ্ছায় এখানে এসেছেন চিকিৎসা সেবা দিতে।

ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, ‘আমি জানি কভিডপরবর্তী মুক্ত দুনিয়াও কভিডপূর্ববর্তী দুনিয়ার মতোই নিষ্ঠুর, স্বার্থপর আর কুৎসিত থাকবে। কি আর করা, তাও তো বাঁচতে হবে। আমার ৫ বছরের মেয়ে আর ২ বছরের ছেলেটার বড় হওয়া দেখতে হবে। বাড়িতে লাগানো গাছগুলোতে ফুল ফোটা দেখতে হবে। মায়ের হাতের তেহারী খাওয়ার জন্য, লেবু গাছের পাতার গন্ধ নেওয়ার জন্য, বৌ-এর সঙ্গে কুপার্স-এর মাহালাবিয়া খাওয়ার জন্য লড়াই করতে করছি। এই লড়াইয়ে মরতে পারব, কিন্তু হারতে পারব না।’

তারেক ভূঁইয়া সর্বশেষ কর্মরত ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। আইসিইউতে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তারেক চাচ্ছিলেন করোনাকালে কিছু একটা করতে। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে কর্মরত কনসালটেন্ট রাজবীর বিশ্বাস আহবান জানান সেখানকার আইসিইউতে কাজ করতে। সেই আহবানে সাড়া দিয়ে তিনি চলতি মাসের শুরুতে ওই হাসপাতালে যোগ দেন। গত ১৬ থেকে ২৬ মে পর্যন্ত সেখানকার আইসিইউতে দায়িত্ব পালন করেন। 

চিকিৎসক তারেকের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায়। স্ত্রীর পাশাপাশি পাঁচ ও দুই বছরের সন্তানসহ থাকেন চট্টগ্রামে। স্ত্রীও চিকিৎসক, চট্টগ্রাম মেডিক্যালে কর্মরত। গ্রামের বাড়িতে আছেন মাসহ স্বজনরা। সব কিছু পেছনে ফেলে তিনি স্বেচ্ছায় করোনার মুমূর্ষু রোগীদের সেবায় ব্যস্ত।

এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি লিখেন, ‘ঈদ উদযাপনের বয়স এখন আর নাই, তবে বৌ বাচ্চা, মা, ভাইদের ছাড়া এই দিনটা কাটানো বেশ পেইনফুল। দিনটা কভিড আইসিইউতে কাটালাম। দিনশেষে সেলফি নিচ্ছি। দাড়ি মোচ কাটার পর যে কিম্ভুত চেহারা হইসিলো ওইটা কিছুটা জাতে উঠসে। আজকে থেকে কোয়ারেন্টিন।’

শুক্রবার সকালে মোবাইল ফোনে কথা হলে চিকিৎসক তারেক এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘করোনা রোগীদের আইসিইউতে কাজ করা নিজের জন্য খুবই ঝুঁকির। কিন্তু সেবার চিন্তা থেকেই এখানে কাজ করেছি। ২০১৩ সালে আইসিউতে কাজ করার প্রশিক্ষণ নেই। এরপর ঢাকা মেডিক্যালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে আইসিউতে কাজ করেছি।’

তিনি বলেন, ‘আইসোলেশনে থাকা রোগীদের মধ্যে যাদের অবস্থা খারাপ হয় তাঁদেরকে আনা হয় আইসিইউতে। সেখানে ভেন্টিলেশনসহ নানা আধুনিক ব্যবস্থা আছে। তবে রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে চিকিৎসক, নার্স এমনকি পরিচ্ছন্নতা কর্মীদেরও ঝুঁকি বেশি এখানে। সবচেয়ে বড় কথা হলো ২৪ ঘণ্টাই রোগীর পাশে থাকতে হয়। কার কি অবস্থা সেটা দেখতে হয়। প্রয়োজনে বিভিন্ন পরীক্ষা করতে হয়।’

সেবা সম্পর্কে ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি লিখেন, ‘আমার আইসিইউর রোগীদের কথা মনে পড়ছে। বেশ কয়েকজন পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, তার চেয়ে বেশি সংখ্যক সুস্থ হয়ে গেছেন। আমরা যদি পারতাম সবাইকে সুস্থ করতে, তাহলে বাস্তবতা ভিন্ন থাকত।’

‘একজন নামকরা ব্যক্তি ভর্তি ছিলেন আমাদের আইসিইউতে। আমি দিনের শিফট শেষ করে বের হওয়ার সময় উনাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এখন কেমন লাগছে?’। উনি হেসে বললেন, ‘আগের দিনের চেয়ে ভালো’। অক্সিজেন স্যাটও দেখলাম ভালো। আমি অন্য সবার মতো উনাকেও বললাম, ‘আপনি চিন্তা করবেন না, আপনি ভালো হয়ে যাচ্ছেন ধীরে ধীরে’। উনার জন্য হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা আসছে ঢাকা থেকে, ওটা সেট করে দিতে রাত ১১টায় আমাকে আবার আসতে হবে। আমি বাইরে গিয়ে সব অর্ডার ঠিক ঠাক করে, রুমে খাইতে আর কাপড়গুলো ধুইতে গেলাম। এর মধ্যেই খবর আসল উনার কন্ডিশান খারাপ হয়ে যাচ্ছে। দৌড়ে গেলাম, আবার ডনিং করে ঢুকলাম, কিন্তু বাঁচানো গেল না। প্রচণ্ড হতাশ লাগল। এই কভিড কি জিনিস!! অদৃশ্য দানব? মন্সটার?? ডেভিল??’

তারেক বলেন, ‘বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে আইসিইউতে থাকা করোনা রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে। ৭৫ ও ৬৫ বছরের দুজন স্বাভাবিক চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে গেছেন। আবার যাদের অবস্থা ভালো ছিল তাদেরকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।’

এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য মতে, ওই হাসপাতালে মোট আইসিইউ ব্যাড আছে ১০টি। গত ২৬ মার্চ থেকে এখানে ৪৪ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে ৩৩ জন পুরুষ ও ১১ জন নারী। সেখান থেকে ১৮ জনকে আইসোলেশনে পাঠানো হয়। পরামর্শ দিয়ে ছাড়া হয় দুজনকে। ওই আইসিইউ ইউনিটে চিকিৎসা নেওয়া ১১ জন পুরুষ ও তিনজন নারী মারা গেছেন।

কথা হয় চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের কনসালটেন্ট রাজবীর বিশ্বাসের সঙ্গে। এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘চিকিৎসক তারেককে আমি আগে থেকেই চিনতাম। আমি জানতাম যে আইসিইউতে থাকার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। সে কারণে তাঁকে এখানে আসার আহবান জানাই। সে রাজি হলে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এখানে নিয়ে আসা হয়। বিষয়টি আমাদের জন্য খুবই উৎসাহব্যঞ্জক।’   

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা