kalerkantho

শনিবার । ২৭ আষাঢ় ১৪২৭। ১১ জুলাই ২০২০। ১৯ জিলকদ ১৪৪১

পাইকগাছার দেলুটি ইউনিয়ন

জলে ভাসা ঈদ: 'মাটির ঘরগুলো এখুনি ঝুপঝুপ কইরে ভাঙতিছে'

পানির তলায় ১২ গ্রাম, বাঁধের ভাঙন ঠেকাতে গ্রামবাসীর মরণপণ চেষ্টা

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

২৫ মে, ২০২০ ১৫:৪৩ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জলে ভাসা ঈদ: 'মাটির ঘরগুলো এখুনি ঝুপঝুপ কইরে ভাঙতিছে'

শিবসা নদীর একটি শাখা চলে গেছে চালনা বাজারের দিকে। স্থানীয়রা একে মাদুরপাটা নদী বলে। ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের দাপটে এর কালিনগর গ্রামের বাওয়ালি বাড়ির সামনে নদীবাঁধটি ভেঙেছে চার জায়গায়। এলাকার প্রায় সকল মানুষ জড়ো হয়ে হাতে হাত রেখে মাটি কেটে বাঁধ আটকানোর চেষ্টা করে চলেছেন। ভাটির সময় কাজ করেন, কিন্তু জোয়ারে তা ভেঙে যায়। এভাবে তিনবার ভেঙেছে। গতকাল রবিবার ভোরে চতুর্থবারের মতো আবারও বাঁধ বাঁধার চেষ্টা চলেছে। নদীর শ্রোতকে বশে নিয়ে টিকে থাকার লড়াই। কাজ দেখাশোনা করছেন রাজ্জাক মোল্লা। তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানকার ১২টি গ্রাম পানির তলায়। ভিটের উপুর দুই-তিন ফুট পানি। এই বাঁধ আটকানো না গিলি আমরা আরও ডুবে যাবো। মাটির ঘরগুলো এখুনি ঝুপঝুপ কইরে ভাঙতিছে। আমাদের আর বাঁচার উপায় থাকবে না।’ 

এলাকাটি খুলনার পাইকগাছা উপজেলার দেলুটি ইউনিয়নের মধ্যে; ২২ নং পোল্ডার বলে পরিচিত। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নদীবাঁধ, স্লুইসগেটের সমন্বয়ে ডাচ (নেদারল্যান্ড) অনুকরণে যে পানি ব্যবস্থাপনা, তাকে ডাচ ভাষায় পোল্ডার বলে। সেই ১৯৬০ এর দশকে খুলনা উপকূলীয় এলাকায় অনেকগুলো পোল্ডার তৈরি করা হয়, যা সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত করা। এটি তার একটি, নম্বর ২২। আগে এর চারিদিকে নদী দিয়ে ঘেরা ছিল। ছোট্ট দ্বীপ। নোয়াই, দারুনমল্লিক, হরিণখোলা, দুর্গাপুর, বিগরদানা, ফুলবাড়ি, তেলিখালি, গোপিপাগলা, সায়দখালি, কালিগনগর, সেলারবার ও হাটবাড়ি নামের ১২টি গ্রাম। এখন অবশ্য এলাকাটির উত্তর অংশের নদী শুকিয়ে যাওয়ায় সরাসরি রাস্তা হয়েছে; এর ফলে খুলনা শহর হতে গল্লামারী, বটিয়াঘাটা হয়ে সোজা ফুলবাড়ি বাজারে পৌঁছানো যায়। সেখান থেকে হাতের বাঁয়ের রাস্তায় কিলোমিটারখানেক হাঁটলে কালিনগরের এই ভাঙা জায়গা। যেখানে এলাকার শত শত মানুষ মাটি কেটে বাঁধ আটকানোর কাজ করছেন।



ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের তোড়ে ২০ মে রাতে কালিনগরের চার জায়গায় বাঁধ ভেঙে যায়। এতে পানি ঢুকে এই বারো গ্রাম তলিয়ে যায়। বাঁধ অপেক্ষা গ্রামগুলো নীচু হওয়ায় কোথাও কোথাও বাড়ি-ঘরের উঠোনে ছয়-সাত ফুট, আর বাড়ির মেঝের ওপরেও দু-তিন ফুট করে পানি জমেছে। অনেক জায়গায় গ্রামের রাস্তাও তলিয়েছে। চলছে অমাবশ্যার গোণ। এমনিতেই গোণের সময় নদীতে জোয়ারের চাপ থাকে। আর আম্ফানের কারণে নদী এখনও ফুঁসছে। জোয়ার হলেই বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে তাই হু হু করে পানি প্রবেশ করে গ্রামগুলোয় আরও পানি জমছে। ইতোমধ্যে শতাধিক পরিবার নিজেদের বাড়ি-ঘর ছেড়ে বাঁধের ভালো অংশে ঠাঁই নিয়েছে। মাটির ঘরগুলো ঝুপ ঝুপ করে বসে পড়ছে। সমূহ বিপদ বুঝে গত ২২ মে (শুক্রবার) থেকে এলাকার মানুষেরা নিজেরাই বাঁধ আটকানোর কাজ শুরু করেন। কিন্তু ভাটা হলেই বাঁধ আটকানোর কাজ করেন। জোয়ারে কাজ করতে পারেন না। চার জায়গা ভাঙনের তিনটি জায়গা মোটামুটি আটকাতে পারলেও বড়  শ’খানেক হাত ভাঙা অংশটি মোটেই আটকানো যাচ্ছিল না। শনিবার সন্ধ্যার জোয়ারে মানুষের চেষ্টাটি তৃতীয়বারের মতো ব্যর্থ হয়। ভেঙে যায় আটকানো জায়গার বাঁধটি। এ কারণে রবিবার ভোরে ভাটার সময় মানুষ উঠেপড়ে লেগেছেন, বাঁধের ভাঙন তারা ঠেকিয়েই ছাড়বেন। 

দারুনমল্লিক গ্রামের বাসিন্দা, স্থানীয় একটি প্রাইমারি স্কুলের প্রধানশিক্ষক সৌরভ রায় কালের কণ্ঠকে বলেন, বাঁধ না আটকাতে পারলে আমরা একেবারেই ডুবে মরবো। এখুনি ১২ গ্রামের প্রায় সব জায়গা ডুবে গেছে। কোথাও কোথাও চার থেকে ছয় ফুট পানি জমেছে। অধিকাংশ মাটির কাঁচা ঘর। ইতোমধ্যেই তা ঝুপ ঝুপ করে বসে যাচ্ছে। পানি যতো আটকে থাকবে, তত ঘরবাড়ির ক্ষতি হবে। মানুষের রান্না করে খাওয়ার জায়গাও নেই। ইতিমধ্যে শ’খানেক পরিবার বাড়ি-ঘর ছেড়ে রাস্তায় ত্রিপল টানিয়ে ঠাঁই নিয়েছে।

জানা গেল, পাউবো’র একজন কর্মকর্তা গতকাল শনিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন। তার পক্ষ থেকে কয়েকশ’ বস্তা  দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, গ্রামবাসী বাঁধ আটকাতে পারলে অর্থ পাওয়া সাপেক্ষে এই কাজের জন্যে অর্থ পরিশোধ করা হবে। দেলুটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও একবার এসেছিলেন। তিনিও এলাকাবাসীকে কাজ করে বাঁধ আটকানোর কথা বলেছেন। তাঁর বাড়ি নদীর অপর পাড়ে। ২০ নং পোল্ডারের মধ্যে। সেখানেও বাঁধ ভেঙেছে। তার বাড়িও পানির তলায়।  

চেয়ারম্যান রিপন কুমার মন্ডল কালের কণ্ঠকে বলেন, আমার ইউনিয়নের অবস্থা খুব খারাপ। নদী-বাঁধ ভাঙনে এলাকা প্লাবিত হয়েছে। আমার বাড়ির নীচতলা পানির তলায়, ওপরের তলায় বসবাস করছি। মাটির ঘরগুলো ভেঙে পড়ছে। মানুষের খাওয়ার খুব কষ্ট হচ্ছে। রান্নাঘরগুলো নষ্ট হয়ে গিয়েছে। মানুষ বাঁচার তাগিদে, নিজেদের স্বার্থেই ভাঙা বাঁধ মেরামত করছে। তা না হলে বাঁধের ভাঙন বড় হবে, আর মানুষের দুর্গতিও বাড়বে।
   
এ বিষয়ে খুলনা-৬ আসনের (পাইকগাছা-কয়রা) সংসদ সদস্য আক্তারুজ্জামান বাবু কালের কণ্ঠকে বলেন, কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলার অনেক জায়গায় বাঁধে ফাটল ও ভাঙন দেখা দিয়েছে। মানুষ নিজেরাই এই ভাঙন ঠেকানোর কাজ করছে। পানিসম্পদ সচিব কথা দিয়েছেন, অল্প সময়ের মধ্যেই নদী-বাঁধের সুরক্ষা কাজ শুরু হবে। সরকারের পক্ষ থেকে স্থায়ীভাবে বাঁধ দেওয়ার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা