kalerkantho

বুধবার । ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৭  মে ২০২০। ৩ শাওয়াল ১৪৪১

করোনাযোদ্ধা নারী চিকিৎসক

মাতৃত্বের বন্ধনে 'ছেদ' তবুও সেবার ব্রত

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া   

২৩ মে, ২০২০ ১০:০১ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মাতৃত্বের বন্ধনে 'ছেদ' তবুও সেবার ব্রত

মায়ের ওড়না বুঝিয়ে দেবে বলে হাতে নিয়ে বসে আছে জোয়ার। সেই অপেক্ষা কাটে এক মাস পর। খুশি হয় ১৩ মাস বয়সী জোয়ার। তবে জোয়ারের মায়ের চোখে আনন্দাশ্রু। প্রায় এক মাস পর সন্তানকে ছুঁয়ে দেখার সেই অনুভূতি থেকেই আনন্দের এ কান্না।

জোয়ারের মা সৈয়দা নেয়ামত ই ফেরদৌসী করোনাযোদ্ধা চিকিৎসক। করোনা আক্রান্ত রোগীদের আইসোলেশন ওয়ার্ডে দায়িত্বে ছিলেন ১০ দিন। এরপর আবার ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিন। সৈয়দা নেয়ামতের ঘরে রয়েছে পাঁচ বছর বয়সী চন্দ্র নামে আরেক সন্তান। 

জানালেন, বৃহস্পতিবার থেকে আবার করোনা রোগীদের সেবায় তিনি নিয়োজিত হয়েছেন। আবারও একই কারণে সন্তানদের থেকে প্রায় এক মাস দূরে থাকতে হবে। মাতৃত্বের বন্ধনে 'ছেদ' পড়লেও সেবার ব্রত নিয়ে তিনি এগিয়ে যেতে চান বলে জানালেন।

সৈয়দা নেয়ামতের মতো আরো বেশ কয়েকজন নারী করোনাযোদ্ধা রয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। করোনা আক্রান্ত রোগীদেরকে তাঁরা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদেরই কয়েকজনের সঙ্গে কথা হলে, মাতৃত্বের বন্ধনের সেই ছেদের কথা জানান তাঁরা। অনেকের কণ্ঠই তখন ভার হয়ে আসে। তবে সেবা দিতে এতটুকু পিছপা হবেন না বলেই দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

অনেক প্রতিবন্ধকতা, সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নারী চিকিৎসকদের সেবার প্রশংসা করেছেন সিভিল সার্জন ডা. মো. একরাম উল্লাহ। বৃহস্পতিবার বিকেলে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে নিয়োগে নারী চিকিৎসকদের প্রাধান্যই বেশি। করোনা আক্রান্তদের সেবায় ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে তুলনামূলকভাবে বেশি নারী চিকিৎসক রয়েছেন। নতুন আরো ৯ জন চিকিৎসক এসেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। আমরা চেষ্টা করছি যারা খুব সহজে কাজ করতে পারবেন বিশেষ করে যাদের ছোট্ট বাচ্চা নেই কিংবা গর্ভবতী নন তাঁদেরকে আইসোলেশনে সেবার দায়িত্ব দেওয়ার।

কথা হয় চিকিৎসক জিনান রেজার সঙ্গে। তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতির শুরু থেকেই প্রস্তুতি শুরু করি। ৯ বছর বয়সী মেয়েটাকে একটু দূরে দূরে রাখার চেষ্টা করি। স্বামীও চিকিৎসক হওয়ায় বাবা-মা (নানা-নানি) ভরসা। কিন্তু তাঁদের অসুস্থতাও ভাবাচ্ছিল। তারপরও যেতে হয়ে দায়িত্বের খাতিরে।

জিনান রেজা বক্ষব্যাধি হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে ১০ দিন দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বলেন, মেয়েটা বলত বাবা সেবা দিলেও যেন আমি সঙ্গে থাকি। মেয়েকে ঘরে রেখে আসতে খুব কষ্ট হয়েছে। আইসোলেশন ওয়ার্ডে ১০ দিনের ডিউটি শেষে বাসায় ফিরে আরো কষ্ট বাড়ে। নিয়ম মেনে কোয়ারেন্টিন করায় মেয়েকে ছুঁয়ে দেখতে পারিনি। ওকে বলতাম বারান্দার সামনে যেন চলে আসে। কাছ থেকেও মেয়েটাকে ছুঁতে না পারা যে কত কষ্টের তা বলে বুঝানো যাবে না। তবে সব সময় ভাবতাম আমার আত্মীয় যদি অসুস্থ হয় তাহলে আমি কি করব।

চিকিৎসক তাসফিয়া আহমেদের একমাত্র সন্তান তাজুয়ার আকরামের বয়স ১৫ মাস। করোনা রোগীদের সেবা কাজে নিজে নাম দেখে প্রথমে অবাক হয়েছিলেন। সন্তানকে ঘরে রেখে কিভাবে যাবেন সেটা ভেবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী তাসফিয়া এখন গর্ব করে এ প্রতিবেদককে বলেন, এটাই প্রথম যে প্রায় এক মাসের মতো সময় আমার কোলের সন্তানকে দূরে রাখতে হয়েছে। দীর্ঘসময় পর যেদিন তাকে কোলে নিয়েছি সেটার অনুভূতি বলে বুঝানো যাবে না। তবে আমার শ্বশুর বাড়ির মানুষের সাপোর্টটা ওই সময়ে ছিল অনেক বড়।

১২ বছরের মাহিরা ও সাত বছরের রাইফার মা মোহিনী বেগম বলেন, কঠিন একটা সময় পার করেছি। ছোট দুই সন্তানই কান্নাকাটি করেছে। সন্তানদের এতদিন দূরে রাখার মতো ঘটনা জীবনে এটাই ছিল প্রথম। স্বামীও চিকিৎসক হওয়া সন্তানদের সময় দিতে পারেননি। তবে আবারও যদি এমন দায়িত্ব পড়ে তাতেও আমি পিছপা হব না।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা