kalerkantho

রবিবার। ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৭ জুন ২০২০। ১৪ শাওয়াল ১৪৪১

এক গ্রাম্য দ্বন্দ্বের বলি তিন পরিবার!

শতবর্ষী মায়ের অপেক্ষা, 'ও অনাদি, তুই কবে আসপি'

এলাকায় থমথমে পরিবেশ

কপিল ঘোষ, চিতলমারী-কচুয়া (বাগেরহাট)    

৯ এপ্রিল, ২০২০ ১৩:৪৯ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



শতবর্ষী মায়ের অপেক্ষা, 'ও অনাদি, তুই কবে আসপি'

ঘরে কারো ঢোকার শব্দ পেলেই সতেজ হয়ে ওঠেন প্রায় শতবর্ষী চম্পা বড়ালের ম্রীয়মান কণ্ঠ। অধীর হয়ে প্রশ্ন  করেন, 'কিডা? অনাদি আইছিস?' আগন্তুকের 'না' সূচক জবাব শুনে তাঁর শরীর কাঁপতে থাকে।

কাঁন্নাজড়িত কণ্ঠে চম্পা বড়াল বলতে থাকেন, 'ও অনাদি, তুই কবে আসপি? আমারে না কইয়ে তুই কনে গেলি? কারা তোরে নিয়ে গেল রাত্তির বেলা?... তুই ছাড়া তো আমার আর কেউ নেই, ..তুই কবে আসপি?' 

অনাদি বড়ালের মায়ের এই কান্না দেখে সতীর্থ হন তাঁর বিদ্যালয় ও কলেজপড়ুয়া ছেলে-মেয়ে ও স্ত্রী। এই বয়োবৃদ্ধ নারীকে সান্ত্বনা দেন তারা।

টিনের ছাউনি দেওয়া ঘরের দরজার চৌকাঠ ঘেঁষে নড়েচড়ে বসেন মা চম্পা (৯৪)। এভাবে সন্তানের অপেক্ষায় প্রতিদিন থাকেন মৃত্যুপথযাত্রী এক মা। ছেলে অনাদি বড়ালকে পুলিশে ধরে নিয়ে যাওয়ার খবর শুনে তিনি স্ট্রোক করেছিলেন বলে জানান অনাদির স্ত্রী পুতুল বড়াল।

গ্রামে প্রভাব বিস্তারের দ্বন্দ্ব ও ষড়যন্ত্রের বলি হওয়ার এমন দৃশ্য কেবল অনাদীর পরিবারের নয়। এ ঘটনায় বিপর্যয় নেমে এসেছে মোট তিনটি পরিবারে। লোকনিন্দায় মামলার বাদী ও আসামিদের সন্তানদের লেখাপড়াও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। আসামিদের মুক্ত করার জন্য দ্বারে দ্বারে ছুটছেন তাঁদের স্ত্রী-সন্তানরা। এ নিয়ে নানা কুৎসাও রটছে, বাড়ছে প্রতিহিংসা।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, প্রতিপক্ষের একটি সাজানো মামলায় ইউনিয়ন ভূমি অফিসের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী অনাদি বড়াল ও সমাজপতি অর্জুন বাড়ৈ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে হাজতে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির এমন হাজতবাস আর প্রতিপক্ষ প্রভাবশালী হওয়ায় কোনো কূল-কিনারা পাচ্ছেন না ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা। উপরন্তু প্রতিপক্ষের হুমকি-ধমকি অব্যাহত রয়েছে। গ্রামটির পরিবেশ এখনো থমথমে।

আলোচিত ঘটনায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের গোড়ানালুয়া গ্রামে। 

বিষয়টি নিয়ে গত ৭ থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে নানা তথ্য। অভিযোগ উঠেছে, গ্রামের দুই পক্ষের বিরোধের জের ধরে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে 'ধর্ষণচেষ্টা' মামলাটি হয়েছে। পেছনে কলকাঠি নাড়েন ওই গ্রামের দুই প্রভাবশালী ব্যক্তি। প্রভাব দেখাতে তারা সমাজের অনেকের সঙ্গে অশালীন আচরণ করেন। এর প্রতিবাদ করতেন বিধায় অনাদি বড়াল ও অর্জুন বাড়ই বিপাকে পড়েছেন বলে অনেকে জানান।

অনুসন্ধানকালে ধর্ষণ প্রচেষ্টা মামলার বাদী ও ভিকটিম ওই বিধবা নারী বলেন, 'আমার স্বামী শিক্ষক ছিলেন। আমি নিজে ভারত থেকে বিয়ে পাশ করেছি। ২০১৯ সালের ১৮ আগস্ট স্বামীর মৃত্যু হয়। এরপর থেকে প্রাইভেট পড়িয়ে ছেলে ও মেয়েকে লেখাপড়া শেখাচ্ছি। দরিদ্র হলেও সম্মান খোয়াইনি। এই মামলার ঘটনা কিছু সত্য, কিছু মিথ্যা। মিথ্যা-সত্য মিলিয়েই তো মামলা হয়। ভুল বোঝাবুঝি তো হতেই পারে। তার সমাধানও তো আছে! এটাকে কেন্দ্র করে ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া ব্যাঘাত ঘটছে।'

শিবপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য দীনেশ বিশ্বাস (৮ এপ্রিল রাত ৯টা ২১ মিনিটে) মোবাইলে বলেন, 'দুল চুরির কথা শুনেছি। কিন্তু এই মামলার ঘটনার (ধর্ষণচেষ্টা) কথা দুপক্ষের কেউই আমাকে বলেনি।'

বাগেরহাটের চিতলমারী-কচুয়া সার্কেল পুলিশ সুপার মো. ওবায়দুর রহমান এ প্রসঙ্গে কালের কণ্ঠকে বলেন, 'গতকাল বুধবার (৮ এপ্রিল) উপজেলার গোড়ানালুয়া গ্রামের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। মামলার তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত কিছু বলা যাচ্ছে না।' তবে তদন্তে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছেন তিনি।

চিতলমারী থানার এসআই প্রসেনজিত সরকার বলেন, এক বিধবা নারীকে (৪৫) ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা হয়েছে। এতে গোড়ানালুয়া গ্রামের অভিলাশ বাড়ইয়ের ছেলে অর্জুন বাড়ই (৫০) ও কুঞ্জু বড়ালের ছেলে অনাদি বড়াল (৫১) আটক হন। গত ৩ মার্চ তাদেরকে বাগেরহাটের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করা হয়।

এসআই প্রসেনজিত আরো বলেন, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টার দিকে ওই নারীর বাড়ির বারান্দায় বসে ওই দুজন ধর্ষণ চেষ্টা করেন। এর প্রায় দুই সপ্তাহ পর থানায় অভিযোগ করেন বাদী। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে হওয়া মামলাটির তদন্ত চলছে বলে তিনি জানান তিনি।

ঘটনার নেপথ্যে 
গোড়ানালুয়া গ্রামের বাঁশিবাজ মজুমদারের ছেলে ঠাকুরদাস মজুমদার জানান, তাঁদের এলাকার হিন্দু সমাজ পরিচালিত হয় 'খান'র মাধ্যমে। কয়েকটি গ্রাম নিয়ে একটি 'খান'। বংশ পরম্পরায় এই খানপ্রধান নির্বাচনের প্রথা রয়েছে। বিয়ে, শ্রাদ্ধসহ সব ধর্মীয়-সামাজিক অনুষ্ঠান এই 'খানপ্রধান'-এর সিদ্ধান্তে পরিচালিত হয়। কোন খানপ্রধানের বিরুদ্ধে যদি ধর্ষণের মতো অসামাজিক কাজের অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে তিনি ওই পদ হারাবেন।

বড়বাক, নাতনের চর, চরলাটিমা, নালুয়া ও গোড়ানালুয়া গ্রামের সমন্বয়ে যে 'খান' রয়েছে, তার প্রধান অর্জুন বাড়ৈ। তাঁকে ওই পদ থেকে সরানোর জন্য দীর্ঘদিন ধরে নানা ষড়যন্ত্র চলছিল।

এদিকে, গোড়ানালুয়া গ্রামের পল্লীচিকিৎসক হারান চন্দ্র সরকার তাঁর মায়ের শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে ৩৩টি খান'র সভ্যদের নিমন্ত্রণ করতে চান। হারান জানান, শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানের জন্য ওই নারী নির্যাতন মামলা দায়েরের প্রায় ১৫ দিন আগে তাঁর বাড়িতে গ্রামের কর্তাদের সভা বসে। প্রথা অনুযায়ী, ওই সভায় খানপ্রধান অর্জুন বাড়ৈয়ের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার কথা। কিন্তু সভায় অর্জুন বাড়ৈ ও তাঁর বন্ধু অনাদি বড়াল অনুপস্থিত থাকেন।

অনাদি বড়ালে স্ত্রী পুতুল বড়াল জানান, ওই সভার দিন তাঁদের বাড়িতে তাঁর স্বামীকে ডাকতে আসেন ভজন মজুমদার, মৃনাল হালদার, পঙ্কজ মজুমদারসহ কয়েকেজন। কিন্তু ওই সভায় অ্যাড. উৎসব বৈরাগী উপস্থিত আছেন  জেনে তাঁর স্বামী যাননি। কারণ, উৎসব বৈরাগী কথার মাঝে অন্যদের ছোট করে অশালীন ভাষায় কথা বলেন। এটা তাঁর স্বামী অনাদি বড়াল কিংবা অর্জুন বাড়ৈ মানতে পারেন না। আবার ধনাঢ্য হওয়ায় তাঁকে বেশি কিছু বলতেও পারেন না। ওই সভায় না যাওয়ায় ওঁরা ক্ষিপ্ত হন। এতে প্রায় এক বছর আগে মারা যাওয়া হারানের মায়ের শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

পুতুল বড়াল আরো জানান, এর সপ্তাহ খানেক আগে তাঁর বড় মেয়ে রিনার কানের দুল হারায়। এটা নিয়ে গ্রামের মৃত  গোসাই লাল মজুমদারের স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া হয়। সুযোগটি কাজে লাগায় প্রতিপক্ষ। তাঁরা কানের দুল হারানোর সমাধানের কথা বলে ওই বিধবা নারীকে দিয়ে অর্জুন ও অনাদির নামে মামলা করিয়ে দেন। এতে একদিকে, অর্জুনের 'খানপ্রধান' পদ হারাবে, অপরদিকে অনাদিও শায়েস্তা হবেন। এটাকে বলে 'এক ঢিলে দুই পাখি মারা!'

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, হীন চক্রান্তে সমাজপতির পদমর্যাদা রদবদল করার উদাহরণ এই গ্রামে এর আগেও ঘটেছে। ঠাকুরদাস মজুমদার সমাজপতি ছিলেন। প্রায় সাত বছর আগে একটি ধর্ষণ মামলা দিয়ে তাঁকেও একইভাবে ওই পদ হতে বাদ দেওয়া হয়। এখানেও একই কৌশলে অর্জুন বাড়ৈয়ের জায়গায় তাপসকে এবং চারটি খান'র বর্তমান সভাপতি সাধুদাস মজুমদারের স্থলাভিসিক্ত করার চেষ্টা চলছে গোপাল মজুমদারকে। এমন হীন চক্রান্তে এক একটি পরিবারকে বিপদে ফেলা বন্ধ হওয়া উচিত।

এদিকে, অনাদি বড়ালের স্ত্রী পুতুল বড়াল তাঁর দুই সন্তানকে নিয়ে চিতলমারী উপজেলা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন। তিনি ষড়যন্ত্রমূলক মামলা এবং অনাদি ও অর্জুনকে আটকের প্রতিবাদ জানিয়ে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

অনুসন্ধানকালে গত মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) দুপুরে আইনজীবী  উৎসব বৈরাগীর বাড়িতে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর মোবাইল নম্বরও বন্ধ পাওয়া যায়। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা