kalerkantho

বুধবার । ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৩ জুন ২০২০। ১০ শাওয়াল ১৪৪১

করোনা মোকাবেলায় অনুসরণীয় বরগুনার ডিসি মোস্তাইন বিল্লাহ

সোহেল হাফিজ, বরগুনা   

২ এপ্রিল, ২০২০ ২১:০৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



করোনা মোকাবেলায় অনুসরণীয় বরগুনার ডিসি মোস্তাইন বিল্লাহ

ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের ধকল যেতে না যেতেই আসে খাগদোন ভাড়ানী খাল উদ্ধারের কাজ। স্থানীয় প্রভাবশালীদের উচ্চ আদালতে মামলার হুমকি উপেক্ষা করেও দিনের পর দিন চলে উচ্ছেদ অভিযান। বরগুনার জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহর নেতৃত্বে জেলা প্রশাসনের তরুণ কর্মকর্তাদের সফল প্রচেষ্টায় উদ্ধার হয় অর্ধশত বছরের বেদখল হওয়া বরগুনার খাগদন ভাড়ানী খাল।

এরপর ইলিশের জেলা বরগুনাকে ব্র্যান্ডিং করতে হাতে নেওয়া হয় দেশের সর্ববৃহৎ ইলিশ উৎসবের আয়োজন। এক মাসের মাথায় উদযাপিত হয় উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ জোছনা উৎসব। এরই মধ্যে শুরু হয় মুজিব শতবার্ষিকী। সকল সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমন্বয়ে আয়োজন করা হয় সর্বোচ্চ সংখ্যক সামাজিক, সাংস্কতিক ও ক্রিড়াঙ্গনের বর্ণাঢ্য আয়োজন। বরগুনার তিনশতাধিক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চালু করা হয় নন্দিনী হাইজিন কর্নার। অক্লান্ত পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে জেলা প্রশাসনের একদল তরুণ কর্মকর্তার সমন্বয়ে স্থানীয় সামাজিক নেতৃবৃন্দকে সাথে নিয়ে চলে জেলা প্রশাসনের এসব কর্মযজ্ঞ। দক্ষ জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহর নেতৃত্বে মন্ত্রমুগ্ধের মতো কাজ করে চলেন বরগুনা জেলা প্রশাসনের একদল তরুণ কর্মকর্তা।

এরই মধ্যে বিশ্ব জুড়ে গেড়ে বসে ভয়াল করোনার প্রাদুর্ভাব। আতঙ্কিত হয়ে পড়ে সারা পৃথিবী। করোনার প্রাদুর্ভাব ঠ্যাকাতে মরিয়া সারা বিশ্ব। একটু দেরিতে হলেও করোনা থাবা বসায় বাংলাদেশে। সেই থেকে এ অবধি বরগুনার জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ ও তাঁর প্রশাসনিক দল এক দিনের জন্যেও বসে থাকেননি। নেননি কোনো বিশ্রামও। দিন-রাত এক করে চলছে তাদের করোনা মোকাবেলার যুদ্ধ। 

তপ্ত দাবদাহে কখনও ভর দুপুরে, কখনওবা গভীর রাতে ডিসি পুলের গাড়ি করে জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ ছুটে চলেন কর্মহীন দরিদ্র পরিবারের কাছে। প্রধান মন্ত্রীর নির্দেশ- ‘একটি বেলাও যেন কোনো কর্মহীন পরিবার না খেয়ে থাকে না’।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবীত বরগুনা জেলা প্রশাসনের তরুণ কর্মকর্তাবৃন্দ। নেতৃত্বে রয়েছেন জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ। দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা মোবাইল ফোনে খোঁজ রাখছেন জেলার ছয়টি উপজেলার ইউএনও, এসিল্যান্ডসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দের কাছে। কোথাও কোনো সমস্যা রয়েছে কিনা। কড়া নজরদারিতে রাখছেন, দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দকৃত পণ্য বিতরণে যথাযথ দূরত্ব বজায় রাখা হচ্ছে কিনা। 

শহরে কিংবা গ্রামে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে নিয়মিত চলছে মোবাইল কোর্ট। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে জেলার বিশাল দুটি নদী পায়রা ও বিষখালীর প্রায় আটটি রুটের খেয়া পারাপার। শকুনের চেয়েও তীক্ষ্ণ চোখ রাখতে হচ্ছে বাজারদরের দিকে। ফাঁক পেলেই চাল-ডালসহ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে ফেলছে কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী। নজর রাখতে হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে, কেউ অহেতুক গুজব ছড়াচ্ছে কিনা। নজর রাখছেন হাসপাতাল পরিস্থিতির উপরেও। সাধারণ রোগীরা চিকিৎসা পাচ্ছে কিনা। 

অন্যদিকে, থেকে থেকেই শঙ্কা এসে হৃদকম্পন বাড়িয়ে তুলছে কোনো করোনা রোগী শনাক্ত হলো কিনা। স্থানীয় কমিউনিটি রেডিও, ডিশ চ্যানেলে প্রচার করতে হচ্ছে করোনা মোকাবেলায় করণীয় বিষয়। করোনা মোকাবেলায় করণীয় বিষয়ে বিতরণ করা হয়েছে হাজার হাজার লিফলেট। এই তো দু’দিন আগে করোনা উপস্বর্গ নিয়ে একজন তরুণ চিকিৎসক বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি হলো। কোনোরকম বিলম্ব ছাড়াই তার নমুনা নিয়ে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে একটি অ্যাম্বুলেন্সযোগে সাথে সাথে তা পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন আইইডিসিআরে। একদিন পরেই তার ফলাফল পাওয়া গেল নেগেটিভ। এতসব ঝক্কি ঝামেলা মাথায় নিয়ে কখনও কখনও জেলা প্রশাসক নিজেই হাত লাগাচ্ছেন বস্তা টানার কাজে। সরাসরি ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছেন কর্মহীন দরিদ্র পরিবারের মাঝে। বিতরণ করছেন মাস্ক, হ্যান্ড সেনিটাইজার। 

বরগুনার জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, অন্য যেকোনো দুর্যোগের তুলনায় এবারের দুর্যোগের বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মৌসুমী বেকারের তালিকা তৈরি। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ কাজটি করতে হচ্ছে। কারণ যতই বিলম্ব ততই নারী ও শিশুসহ সেসব পরিবারের ভোগান্তি। খেয়ে না খেয়ে তাদের রাত্রি যাপন। এজন্য দ্রুত গতিতে আমরা তৈরি করে ফেলেছি করোনা কালের কর্মহীন বেকারদের তালিকা। 

জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ আরো বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে সবচেয়ে বেশি অসহায় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ এবং বেদে পরিবারগুলো। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ এবং বেদে সম্প্রদায়ের শতাধিক পরিবারের মাঝে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। প্রতিটি পরিবারের জন্য প্রথম ধাপে ১০ কেজি চাল, পাঁচ কেজি আলু, এক কেজি ডাল, আধালিটার সয়াবিন তেল, মাস্ক এবং হ্যান্ড সেনিটাইজার বিতরণ করা হয়। তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যেই সেসব পরিবারের জন্য স্থায়ী আবাসন নির্মানের লক্ষ্যে চলছে স্থান নির্বাচনের কাজ। 

বরগুনা জেলা এনজিও উন্নয়ন ফেরামের সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মোতালেব মৃধা বলেন, দেশের এই সংকটকালে বরগুনা জেলা প্রশাসনের যে উদ্যোগ তা সত্যিই একটি অনন্য উদাহরণ। দিন রাত এক করে ২৪টি ঘণ্টাই তারা কাজে লাগাচ্ছেন করোনা মোকাবেলায়। তাছাড়া জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহর নানাবিধ সৃজনশীলতা ইতোমধ্যেই বরগুনাবাসীর দৃষ্টি কেড়েছে।’

বরগুনার জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ আরো জানান, ‘করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় এ পর্যন্ত ১৮ হাজার ৯ শত জেলে পরিবারকে ৪০ কেজি করে চাল এবং ৫৪ হাজার দরিদ্র পরিবারকে ভিজিডি চাল বিতরণ করা হয়েছে এবং হচ্ছে। এ ছাড়া জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নিয়মিত তালিকার বাইরে কর্মহীন শ্রমজীবী অসহায় পরিবারের তালিকা তৈরি করে তাদের মাঝে এ পর্যন্ত ৬৫০০ পরিবারে চাল, ডাল, আলু, তেল এবং সাবানসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য সরবরাহ করা হয়েছে।’ দেশের এই ক্রান্তিকালে কর্মহীন দরিদ্র পরিবারের সহযোগিতায় নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী স্বচ্ছল ব্যক্তিবর্গকে এগিয়ে আসার জন্য অনুরোধ জানান তিনি। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা