kalerkantho

বুধবার । ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৩ জুন ২০২০। ১০ শাওয়াল ১৪৪১

চট্টগ্রাম বন্দরে আটকা ৭৫ হাজার টন ফলভর্তি কন্টেইনার

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

১ এপ্রিল, ২০২০ ১৭:২০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চট্টগ্রাম বন্দরে আটকা ৭৫ হাজার টন ফলভর্তি কন্টেইনার

ফাইল ছবি

চট্টগ্রাম বন্দরের ভিতর ইয়ার্ডে একসাথে ৭৫ হাজার টন আমদানিকৃত আপেল, কমলা, মাল্টা ও আঙ্গুর এবং আদা, রসুন, পেঁয়াজ আটকা পড়েছে। মার্চের শুরুতে দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর ও চীন থেকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কন্টেইনারে এসব পণ্য বন্দরে পৌঁছেছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে গত ২৬ মার্চ থেকে সরকারের সাধারণ ছুটির ফাঁদে পড়ে এসব পণ্য বন্দর থেকে সরবরাহ নিতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। 

জমে থাকা পণ্যভর্তি ওই কন্টেইনার সরবরাহ নেওয়ার কারণ হচ্ছে দুটি। একটি হচ্ছে ছুটির সময় ব্যাংক, কাস্টমস, কোয়ারেন্টিন ও আনবিক শক্তি কমিশনের দপ্তর সঠিকভাবে চালু না থাকা; অন্যটি হচ্ছে, বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় আমদানিকারক নিজ থেকে পণ্য সরবরাহ নিতে আগ্রহী না হওয়া।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরে ওই ধরনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কন্টেইনার রাখতে হয় বিশেষ ইয়ার্ডে। প্রত্যেকটি কন্টেইনার রাখার জন্য প্রয়োজন পৃথক বিদ্যুৎ সংযোগ। চট্টগ্রাম বন্দরের কাছে এই ধরনের সংযোগ আছে ১৬৮০টি; এরমধ্যে আবার অন্তত দেড় শ নষ্ট আছে। এই অবস্থায় বন্দরের ইয়ার্ডে আজ বুধবার পর্যন্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কন্টেইনার জমে আছে ২৯০০ একক। ফলে ১৫৩০ একক বিদ্যুৎ সংযোগ সুবিধা দিয়ে ২৯০০ একক কন্টেইনার কিভাবে রাখা হচ্ছে তা এখন বড় প্রশ্ন। 

একাধিক সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও শিপিং এজেন্ট কর্মকর্তা বলছেন, বন্দর কর্তৃপক্ষ ভ্রাম্যমাণ কিছু প্লাগ ইন দিয়ে বাড়তি কন্টেইনারে রেশনিং করে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে। কন্টেইনার সংখ্যা বেড়ে গেলেই অনেক আগে থেকেই অলিখিতভাবে এই কাজটি করে থাকে বন্দর কর্তৃপক্ষ।  

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর সচিব ওমর ফারুক কালের কণ্ঠকে বলেন, আমরা কঠিন অবস্থার মধ্যে আছি এবং অনেক কষ্টে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছি। বন্দরে ৪৯ হাজার একক কন্টেইনার রাখার ধারণক্ষমতার মধ্যে আজকে ৪৫ হাজার এক কন্টেইনার ছুঁই ছুঁই করছে। এর সাথে যোগ হয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কন্টেইনার। আমরা দিন-রাত খোলা রাখছি চট্টগ্রাম বন্দর কিন্তু অন্য স্টেকহোল্ডাররা যদি সঠিকভাবে বন্দরের সাথে তাল মিলিয়ে কাজ না করেন তাহলে তো বিপত্তি ঘটবেই।

শিপিং এজেন্টরা বলছেন, বন্দর জেটিতে ভিড়া জাহাজ ওইএল ডেল্টা, এক্সপ্রেস কাবরু, দেলোয়ারি ট্রেডার্সসহ অনেক জাহাজে অন্তত দুই শ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কন্টেইনার আছে। ইয়ার্ডে বিদ্যুৎ সংযোগ বা প্লাগ ইন না থাকায় এসব কন্টেইনার জাহাজ থেকে সঠিক সময়ে নামিয়ে ইয়ার্ডে রাখা যাচ্ছে না। এতে জেটিতে জাহাজ এসেও কন্টেইনার নামাতে না পারায় জেটিতে জাহাজের অপেক্ষমান সময় বেড়ে যাচ্ছে।

জানতে চাইলে বিদেশি শিপিং লাইনের দেশীয় এজেন্ট জিবিএক্স বাংলাদেশের হেড অব অপারেশন মুনতাসির রুবাইয়াত কালের কণ্ঠকে বলেন, বন্দর জেটিতে ভিড়া আমার ওইএল ডেল্টা জাহাজে ৫২টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কন্টেইনার আছে; গতকাল মঙ্গলবার কোনো কন্টেইনার নামেনি, আজ বুধবার দুপুর একটা পর্যন্ত মাত্র আটটি কন্টেইনার নেমেছে। বাকি আছে ৪৪টি কন্টেইনার। ওই কন্টোনিার ডেলিভারি না নেওয়া এবং ইয়ার্ডে বিদ্যুৎ সংযোগ পয়েন্ট খালি না থাকায় জাহাজ থেকে কন্টেইনার নামানো যাচ্ছে না। 

মুনতাসির রুবাইয়াত বলেন, একটি জাহাজে সাধারনত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কন্টেইনার জাহাজের ওপরের দিকে থাকে। বাকি কন্টেইনার থাকে নীচে। এখন ওপরের দিকের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কন্টেইনার নামাতে না পারায় আমদানি পণ্যবাহী বাকি কন্টেইনারও জাহাজ থেকে নামছে না। এরকম চলতে থাকলে ওই জাহাজ বন্দর ছাড়তে হয়তো একদিন পিছিয়ে যাবে। এজন্য আমাদের মাশুল গুনতে হবে।

জানা গেছে, বন্ধের মধ্যেও বাজারে এখন আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙ্গুরের মতো ফলের চাহিদা রয়েছে। এসব কন্টেইনার বন্দর থেকে তারা দ্রুত ছাড় নিতে চাইছেন কিন্তু সাধারণ ছুটির সময় সরকারি অফিস আদেশের বিভ্রান্তির কারণে সরকারি দপ্তরগুলো সঠিকভাবে কার্যক্রম করছে না। এতে ভোগান্তিতে পড়ছেন ফল আমদানিকারকরা।

জানতে চাইলে ফল আমদানিকারক জি এস ট্রেডিংয়ের মালিক নাজিম উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার দুই ঘণ্টা ব্যাংক খোলা রাখলেও সেই সময়ে ব্যাংকগুলোতে বৈদেশিক বাণিজ্যিক কাজ করা যাচ্ছে না। ছুটির আগে এসব পণ্যের এলসি খুললেও এখন বাকি কাজ করতে পারছি না। ফলে মিশর ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফল আসলেও বন্দর থেকে পণ্য ছাড় নিতে পারছি না। ফলে বাজারে চাহিদা থাকলেও আমি পণ্য এনেও বাজারে সরবরাহ দিতে পারছি না, এটা ভোগান্তি।’

ব্যাংক ছাড়াও কিছু সরকারি দপ্তরের ভোগান্তির কথা বললেন ফল আমদানি চালান খালাসের সাথে জড়িত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট সোনারগাঁও অ্যাসোসিয়েটস এর মালিক বোরহান উদ্দিন সিকদার। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ফল আমদানি খালাসে সরকারি উদ্ভিদ সংগনিরোধ শাখা থেকে কোয়ারেন্টিন সনদ, আনবিক শক্তি কমিশন শাখা থেকে রেডিয়েশন সনদ এবং কাস্টমস থেকে ফরমালিনমুক্ত সনদ নিতে হয়। কিন্তু কোয়ারেন্টিন সনদ পেতে দুদিন ধরে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। আর আনবিক শক্তি কমিশনের কর্মচারীরা বন্দরে এসে পণ্যের নমুনা সংগ্রহ এবং রিপোর্ট প্রদান করতেন। এখন কন্টেইনার খুলে পণ্যের নমুনা নিয়ে অফিসে গিয়ে জমা দিতে হচ্ছে আবার পরীক্ষার রিপোর্ট নিজে গিয়ে আনতে হচ্ছে। 

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সংশ্লিষ্ট শাখা পণ্য শুল্কায়নে গত দুদিন নামমাত্র কাজ করেছে। তবে আজ কর্মকর্তা বাড়িয়ে দেওয়ায় বেশ ভালো কাজ করতে পেরেছি। প্রথম থেকেই যদি নির্দেশনা স্পষ্টভাবে দিতো তাহলে কাজে সমন্বয় ও প্রস্তুতি থাকতো। ভোগান্তি কমতো। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা