kalerkantho

শনিবার । ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৬ জুন ২০২০। ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

১০ টাকার চাল বিতরণে অনিয়ম, অভিযুক্ত চেয়ারম্যান বললেন 'যড়যন্ত্র'

পার্থ সারথী দাস, ঠাকুরগাঁও থেকে   

৩০ মার্চ, ২০২০ ১১:০২ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



১০ টাকার চাল বিতরণে অনিয়ম, অভিযুক্ত চেয়ারম্যান বললেন 'যড়যন্ত্র'

ঠাকুরগাঁওয়ে উৎকোচের বিনিময়ে খাদ্য বিভাগের আওতায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে সদর উপজেলা জগন্নাথপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আলাউদ্দীন আলালের বিরুদ্ধে। রবিবার দুপুরে ইউনিয়ন পরিষদে ওই কর্মসূচির চাল বিতরণের সময় কার্ডধারী বঞ্চিত হতদরিদ্ররা চাল আনতে গেলে তাদের চাল দেওয়া না হলে বিক্ষুব্ধ বঞ্চিতজনতা একত্রিত হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের অফিসরুমসহ প্রতিটি কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেয়। এর পূর্বে গত শনিবারও বিক্ষোভ করেন কার্ডধারী বঞ্চিতরা।

কার্ডধারী বঞ্চিত হতদরিদ্রদের অভিযোগ, চেয়ারম্যান ওই ইউনিয়নের পূর্বের কার্ডধারি প্রকৃত হতদরিদ্রদের বাদ দিয়ে স্বচ্ছল ব্যক্তিদের কাছ থেকে জনপ্রতি দেড় থেকে দুই হাজার টাকা নিয়ে তাদের নতুন করে কার্ড দিয়েছে। চেয়ারম্যানের এই অনিয়ম দুর্নীতির তদন্ত ও সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন তারা।

সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলাউদ্দীন আলাল হতদরিদ্রদের বাদ দিয়ে তাদ নিজের পছন্দের স্বচ্ছল ব্যক্তি ও দলীয় কর্মীদের নাম তালিকাভুক্ত করেন। যাদের পাকা বাড়ি, জায়গা জমি রয়েছে, মিল চাতালে ব্যবসা করছেন এমন ব্যক্তিকেও হতদরিদ্র দেখিয়ে ফেয়ার প্রাইসের কার্ড বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নতুন করে তালিকাভুক্ত কার্ডধারীদের কাছ থেকে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা নিয়েছেন চেয়ারম্যান আলাউদ্দীন আলাল। এতে তালিকা থেকে বাদ পরেন প্রকৃত হতদরিদ্ররা। 

জগন্নাথপুর ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ডের কার্ড বঞ্চিত হতদরিদ্র লুৎফর রহমান জানান, তিনি একজন ফেরিওয়ালা, ডাব বিক্রির টাকা দিয়ে খুব কষ্ট করে তার সংসার চলে। নতুন তালিকায় নাম ওঠানোর জন্য চেয়ারম্যান তার কাছ থেকে দুই হাজার টাকা চেয়েছিলেন। কিন্তু দরিদ্র হওয়ার কারণে তার পক্ষে টাকা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তাই নতুন তালিকায় তার নাম ওঠেনি। 

একই ইউনিয়নের আলমপুর গ্রামের রমেশ চন্দ্র বর্মন জানান, তার শুধু বসতভিটা ছাড়া আর কিছুই নেই। নতুন তালিকা থেকে তার নাম কেটে দেওয়া হয়েছে। নতুন তালিকায় যাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তাদের বেশির ভাগই স্বচ্ছল ব্যাক্তি। নাম বাদ দেওয়ার বিষয়ে চেয়ারম্যানের কাছে জানতে চাইলে চেয়ারম্যান তার কথা না শুনে তাকে তাড়িয়ে দেয়। একই এলাকার খর্গ বর্মণ বলেন, শহরে অফিসারকে টাকা দিতে হবে এমন কথা বলে তার কাছ থেকে দেড় হাজার টাকা নেয় চেয়ারম্যানের লোক। পরে তালিকায় নাম না থাকার কারণে সেই টাকার মধ্যে এক হাজার টাকা ফেরত দিয়েছে। 

সিংগিয়া গ্রামের কার্ড বঞ্চিত জয়ন্ত ঘোষ জানান, কার্ড নিয়ে চাল নিতে আসার পর চেয়ারম্যান জানায় আমাদের কার্ড বাতিল করা হয়েছে। তিনি বলেন, এ কার্ডটি যখন করে দেয় তখন স্থানীয় মহিলা মেম্বার মালেকা বেগম তার কাছ থেকে চেয়ারম্যানকে দেওয়ার নাম করে ৫ শ টাকা উৎকোচ নেয়।

কার্ড বঞ্চিত ঘনশ্যাম, মনোয়ারা বেগম, রিনি বালা, মরিয়ম বেগম, ফাতেমা বেগম, তহুরা খাতুন একই অভিযোগ করে বলেন, আমরা গরিব ও অসহায় মানুষ। ১০ কেজি করে চাল নিয়ে আমাদের সংসার চলত। কিন্তু এভাবে কার্ড বাতিলের কারণে আমরা খুবই সমস্যায় ভুগব। এ সময় প্রতিবন্ধী সাইদুল ইসলাম কার্ড বাতিলের কথা শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন। 

ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য (ওয়ার্ড কাউন্সিলর) জামাল উদ্দীন বলেন, চেয়ারম্যান ওপরের কর্মকর্তাদের কিছু খরচ দিতে হবে এমন কথা বলে নতুন তালিকায় কার্ডধারীদের প্রত্যেকের কাছ থেকে দেড় থেকে দুই হাজার করে টাকা নিয়েছে। এ বিষয়ে চেয়ারম্যানের সাথে একাধিকবার জানতে চাইলে তিনি কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে বাধ্য নয় বলে জানান। 

আরেক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য (ওয়ার্ড কাউন্সিলর) বাবুল জানান, চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এক বড় নেতার কাছের লোক। তাই চেয়ারম্যান নিয়ম-নীতি না মেনে গোপনে প্রায় সাত শ কার্ড বাতিল করে নিজের ক্ষমতা দেখিয়েছেন। তারা নতুন ব্যক্তিদের কাছে থেকে উৎকোচের বিনিময়ে কার্ড প্রদান করেছেন।  

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ইউনিয়ন পরিষদের আরো কয়েকজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর এসব অনিয়মের কথা স্বীকার করেছেন। তারা জানান, অনেক স্বচ্ছল ব্যক্তিরাও কার্ড নিয়ে এসে চাল নিয়ে গেছেন। কে ধনী আর কে গরিব তা যাচাই না করেই চেয়ারম্যান এমন অনিয়ম করেছেন। চেয়ারম্যানের এসব দুর্নীতির কারণে এলাকায় তাদের সুনাম নষ্ট হচ্ছে।

জগন্নাথপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন আলাল এ ব্যাপারে বলেন, কেউ যদি তার নাম করে টাকা নিয়ে থাকে তবে সেটা তার দেখার বিষয় নয়। নিয়ম মেনেই কিছু মানুষের নাম বাতিল করা হয়েছে। তার ইমেজকে ক্ষুণ্ন করতে কতিপয় লোকজন এই বদনাম ছড়াচ্ছেন। 

ফেয়ার প্রাইসের চাল বিতরণে ডিলার বা সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান বা অন্যকেউ কোনো রকম অনিয়ম করলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যাবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে কোনো রকম ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানান  সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি আরো বলেন, টাকার বিনিময়ে কার্ড দেওয়া হয়েছে এমন অভিযোগ কেউ করেননি। তবে বিষয়টি তিনি লোকমুখে শুনেছেন। এ বিষয়ে অবশ্যই তদন্তসাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ওই ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে বাতিলের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করেছেন। সেখানে নিয়ম-নীতি মানা হয়নি। রেজ্যুলেশনেও ভুল পাওয়া গেছে। এ কারণে পূর্বের তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদেরকেই যেন চাল প্রদান করা হয় সে ব্যাপারে তিনি চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজির চাল বিতরণের উদ্দেশ্য সফল হোক এবং সঠিক অর্থেই সুবিধাবঞ্চিত হতদরিদ্ররা এই সুবিধা ভোগ করুক এটাই আশা করছেন এই অঞ্চলের সাধারণ জনগণ। সেই সঙ্গে খুব দ্রুত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ তদন্ত করে যথাযত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে সকারের এমন মহৎ উদ্যোগ স্বচ্ছতা ফিরে পাবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা