kalerkantho

শুক্রবার । ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৫ জুন ২০২০। ১২ শাওয়াল ১৪৪১

করোনায় কপাল পুড়েছে সাতকানিয়ার কৃষকদের

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, সাতকানিয়া   

২৯ মার্চ, ২০২০ ২১:৫৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



করোনায় কপাল পুড়েছে সাতকানিয়ার কৃষকদের

করোনার কবলে পড়ে কপাল পুড়েছে সাতকানিয়ার কৃষকদের। লাভের আশায় উৎপাদিত সবজি এখন পানির দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে দোকান পাট ও গণপরিবহন বন্ধ থাকায় স্থানীয় সবজি বাজারগুলোতে পাইকাররা আসতে না পারায় মূলত সবজির দাম কমে গেছে। কয়েকদিনের ব্যবধানে সবজির দাম অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে লোকসান গুণতে হচ্ছে কৃষকদের।

তবে কোনো কোনো কৃষক জানিয়েছেন, পাইকাররা সিন্ডিকেট করে স্থানীয় বাজারে সবজির দাম কমিয়ে দিয়েছে। আর পাইকাররা জানিয়েছেন, পরিবহন সমস্যা ছাড়াও করোনা আতংকে লোকজন এখন ঘরবন্দি। ফলে হাট-বাজারগুলোতে সবজির চাহিদা কম। 

সাতকানিয়ার শিশুতল, আমতল, বাজালিয়া, ফকিরখীল ও খোদার হাটসহ পাইকারী সবজি বাজারগুলোতে সরেজমিন পরিদর্শনকালে দেখা যায়, কৃষকরা বাজারে প্রচুর পরিমানে টমেটো, বেগুন, শিম, বরবটি, বাঁধাকপি, ঢেডঁস, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, চিচিঙ্গা, ঝিঙে, তিতা করলা ও শসা নিয়ে এসেছেন। কিন্তু বাজারে পাইকারী ক্রেতা খুবই কম। ফলে কেউ কেউ কম দামে সবজি বিক্রি করে দিচ্ছেন। আবার অনেকে ক্রেতার জন্য অপেক্ষা করছেন। পুরো দিন অপেক্ষা করে অনেকে সবজি বিক্রি করতে না পেরে পরের দিনের জন্য রেখে দিচ্ছেন।

সবজি ক্রেতা-বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সাতকানিয়া ও চন্দনাইশের সবজির পাইকারি বাজারগুলো থেকে প্রতিদিন চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শত শত ট্রাক সবজি যেতো। কিন্তু এখন পাইকাররা আগের মতো আসছে না। ফলে সবজির দাম কমে গেছে। গত সপ্তাহে যে দামে সবজি বিক্রি হয়েছে এখন তার অর্ধেক দামেও বিক্রি করা যাচ্ছে না।

রবিবার সবজির পাইকারি বাজারগুলোতে প্রতি কেজি টমেটো ৩ থেকে ৪ টাকা, বেগুন ২ থেকে ৩ টাকা, বরবটি ১৫ টাকা, তিতা করলা ১৫ থেকে ২০ টাকা, শসা ১৫ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ১০ থেকে ১২ টাকা, চিচিঙ্গা ১৮ থেকে ২০ টাকা, শিম ৮ থেকে ১০ টাকা দামে বিক্রি করা হচ্ছে। বাজারে সবজির মূল্য না পেয়ে কৃষকরা খুবই হতাশা প্রকাশ করেছেন। 

ছদাহা এলাকার কৃষক মো. হারুন জানান, আমি ৭ কানি জমিতে টমেটো চাষ করেছি। এখন প্রতিদিন দেড় থেকে ২ টন টমেটো ছিড়তে হয়। শুরুর দিকে বেশ ভাল দাম পেয়েছি। কিন্তু দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে দোকান পাট ও গণপরিবহন বন্ধ থাকার সিদ্ধান্ত হওয়ার পর থেকে বাজারে পাইকার কম আসছে। ফলে মূল্য পড়ে গেছে। গত সপ্তাহে যে টমেটো ১২ থেকে ১৫ টাকা দামে বিক্রি করেছি সেগুলো এখন ৩ থেকে ৪ টাকা দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

তিনি জানান, জমি তৈরি, চারা রোপন, সারা, কীটনাশক প্রয়োগ ও খেত থেকে টমেটো ছিড়ে বাজারে পৌঁছা পর্যন্ত প্রতি কেজি টমেটোর পেছনে ৬ থেকে ৭ টাকা খরচ পড়ে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদেরকে লোকসান গুণতে হবে। বাজারে সবজির দাম বৃদ্ধি না পেলে কৃষকদেরকে পথে বসতে হবে। 

নলুয়ার কৃষক আলী আহমদ জানান, আমি টমেটো, বরবটি ও ঢেড়ঁসসহ ৪ কানি জমিতে সবজি চাষ করেছি। আমর পুরো পরিবার কৃষির উপর নির্ভরশীল। গত কয়েকদিনে বাজারে সবজির দাম যেভাবে পড়ে গেছে তাতে লাভ তো দূরের কথা, মনে হয় পুঁজিও উঠাতে পারবো না। এখন বাজারে যে দামে সবজি বিক্রি হচ্ছে তাতে খেত থেকে ছিড়ে গাড়ি ভাড়া দিয়ে বাজারে নেয়ার খরচও উঠবে না।

তিনি জানান, গতকাল শনিবার বাজারে টমেটো ও বরবটি বিক্রি করতে গিয়েছিলাম। প্রতি কেজি ১৫ টাকা দামে বরবটি বিক্রি করতে পারলেও টমেটো বিক্রি করতে পারেনি। বিক্রি করতে না পারা টমেটো এলাকায় লোকজনের মধ্যে বিতরণ করেছেন। বাজারে দাম বৃদ্ধি না পেলে খেত থেকে টমেটো আর বেগুন এখন আর ছিড়বে না।

তিনি জানান, বিক্রি করতে না পেরে অনেকে বাজারে সবজি রেখে চলে যাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ পরের দিনের জন্য অপেক্ষা করছেন। 

কাঞ্চনা এলাকার কৃষক মো. ইলিয়াছ জানান, তিনি ২ কানি জমিতে তিতা করলা চাষ করেছেন। গত সপ্তাহে পাইকারি হিসেবে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা করলা বিক্রি করেছেন। ওই সময় পাইকাররা এলাকায় এসে নিয়ে গেছেন। কিন্তু গতকাল শনিবার ১৫ টাকা দামে বিক্রি করতে হয়েছে। তিনি জানান, বাজারে সবজির দাম বৃদ্ধি না পেলে খেতে পচে গেলেও ছিড়ে বাজারে নিবে না। 

সাতকানিয়ার শিশুতল বাজারে আসা পাইকারি সবজি বিক্রেতা নাছির উদ্দিন জানান, পরিবহন সংকট ছাড়াও বড় সমস্যা হলো বাজারে এখন ক্রেতা নাই। করোনা আতংকে মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। পাইকাররা শহরে এনে সবজি বিক্রি করতে পারছে না। এভাবে চলতে থাকলে দাম আরো কমে যাবে। তবে দাম কমে যাওয়ায় কৃষকরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানান। 

সাতকানিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় জানান, সাতকানিয়ায় ১ হাজার ৪ শত হেক্টর জমিতে সবজি চাষ করা হয়েছে। এরমধ্যে প্রায় ৩ শত হেক্টর জমিতে টমেটো চাষ করা হয়েছে।  এ ছাড়া বেগুন, চিচিঙ্গা, ঝিঙে, তিতা করলা, বরবটি, ঢেড়স, লাউ ও মিষ্টি কুমড়া রয়েছে।

সাতকানিয়ার পাইকারী বাজারগুলোতে এখন প্রচুর সবজি। কিন্তু ক্রেতার অভাবে কৃষকরা এসব সবজি বিক্রি করতে পারছেনা। তিনি জানান, সাতকানিয়ায় পাইকারি বাজারগুলোতে এখন প্রতিদিন  প্রায় ৩ শত টন টমেটো উঠছে। কিন্তু বাজারে সেই হারে পাইকার নাই। ফলে প্রতি কেজি টমেটো মাত্র ৩ থেকে ৪ টাকা দামে বিক্রি করছেন। বাজারে মূল্য না পাওয়ায় অনেক কৃষক খেত থেকে টমেটো ছিড়ছে না। অন্যান্য সবজিরও একই অবস্থা। কিন্তু বিরাজমান পরিস্থিতিতে আসলে কিছু করারও নাই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা